জনমনে উদ্বেগ উত্কণ্ঠা

সারাদেশে অপহরণ ও গুম নিয়ে চরম আতংক বিরাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বেশিরভাগ অপহরণ আর গুমের ঘটনা ঘটেছে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ লাশ হয়ে আসছে স্বজনদের কাছে। এ নিয়ে দেশব্যাপী জনমনে আতংক বিরাজ করছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা বের হয়ে আসছে। ঐসব ঘটনার সঙ্গে র্যাব-পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত ছিল না। ব্যক্তিগত শত্রুতা, লেনদেন নিয়ে বিরোধ, জমি নিয়ে বিরোধ, পরকীয়াসহ বিভিন্ন ঘটনা ঐসব অপহরণের নেপথ্যে ছিল, এমন তথ্য বের হয়ে আসছে। অনেক অপহরণের নেপথ্যে এলাকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা জড়িত। এসব অপহূত আর ফিরে আসে না। অনেকের লাশ তার এলাকায় কিংবা বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়া হয়। এসব লাশ উদ্ধার হচ্ছে। সর্বশেষ অপহরণ হয়েছে গতকাল রবিবার নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা স্টেডিয়ামের কাছে। ২ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাসহ দেশবাসী এসব অপহরণ ও গুম থেকে প্রতিকার চান। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানান তারা। আর যদি কেউ অপরাধী হয়ে থাকেন কিংবা মামলার আসামি হন, তাহলে তাকে র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে গেলে কোন মহল বিরোধিতা করছে না। এ গ্রেফতার যেন নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় এবং স্বজনরা যেন জানতে পারেন। তার পিতা, ভাই ও সন্তান, স্বামী র্যাব-পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার হেফাজতে রয়েছে। স্বাধীন দেশে যেন এটুকু জানার অধিকার স্বজনরা পান। তা নিশ্চিত করার দাবি জানান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের কাছে। পাশাপাশি এসব অপহরণের পেছনে সন্ত্রাসী গ্রুপও জড়িত। তারা র্যাব-পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে। টাকা না পেয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা পূর্বশত্রুতা, লেনদেন, জমি নিয়ে বিরোধ, পরকীয়া প্রেমের ঘটনার জের ধরে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ভাড়া করে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ ও গুম করার ঘটনা ঘটে থাকে। এমন অনেক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। র্যাব-পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ছিনতাই ও ডাকাতি হচ্ছে। এসব ঘটনা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতকারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ করছে। অতীতে হয়েছে। এ নিয়ে আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম চলছে বলে তিনি জানান। র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, প্রতি মাসে গড়ে ৫টি অপহরণের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়ে থাকে। জড়িত পেশাদার অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। গতকাল মাইলস্টোন কলেজের ছাত্র রাজীবকে র্যাব উদ্ধার ও অপহরণকারীদের গ্রেফতার করে। ৮ এপ্রিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সামনে থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তার পিতার কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। জায়গা-জমি বিক্রি করে ২৫ লাখ টাকা দেয় অপহরণকারীদের। তারা রাজীবকে না ছেড়ে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলে তত্ক্ষণাত্ র্যাব টাঙ্গাইল থেকে অপহরণকারীকে গ্রেফতার এবং তাদের হেফাজত থেকে রাজীবকে উদ্ধার করে। সামপ্রতিককালে গুলিস্তান বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ী ও বিএনপির নেতা রফিককে র্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়। পরে ঝিনাইদহ শৈলকুপা থেকে রফিকের মৃতদেহ উদ্ধার এবং অপহরণকারীদের গ্রেফতার করা হয়। লেনদেন ও পরকীয়ার কারণে রফিককে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করা হয়। একটি মহল ষড়যন্ত্র করে কোন অপহরণ করে র্যাবকে দায়ী করার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তারা র্যাবের কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য প্রভু রাষ্ট্রকে খুশী করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে ঢালাওভাবে র্যাবকে দায়ী করে আসছে। কর্নেল জিয়া বলেন, অতীতে এ দেশে অপহরণ ও গুমের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিরোধে বিশেষ অপারেশনসহ নানা ধরনের অভিযান হয়েছে। এখনও অপহরণ হচ্ছে। পূর্বের তুলনায় অনেক কম। এ নিয়ে আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। র্যাব ঐ সব চক্রকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। গত শনিবার গভীর রাতে কলাবাগান এলাকায় তাবলীগ জামায়াতের নেতা ওসামা ইসলাম রাস্তার পাশে প্রাইভেটকার রেখে ওষুধ আনতে একটি দোকানে যান। প্রাইভেট কারে তার স্ত্রী ও এক শিশু সন্তান ছিল। এ অবস্থায় কয়েক অস্ত্রধারী ওসামা ইসলামের স্ত্রী ও সন্তানকেসহ প্রাইভেটকার নিয়ে পালিয়ে যায়। রাতেই তোপখানা রোডে তার স্ত্রী ও সন্তানকে নামিয়ে দিয়ে প্রাইভেটকার নিয়ে যায় অস্ত্রধারী যুবকরা। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাইভেটকার উদ্ধার হয়নি। এছাড়া সমপ্রতি ৮ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের সন্ধান আজও পায়নি স্বজনরা। তাদের দাবি এ ৮ জনকে অপহরণ করে গুম করা হয়েছে। তারা হচ্ছে তেজগাঁও থানা ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম সুমন (৩৪), তার খালাতো ভাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল করিম তানভীর (৩০), তেজগাঁও শাহীনবাগের কাওসার আহমেদ (২৪), পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম রাসেল (২৪), পূর্ব নাখালপাড়ার আব্দুল কাদের ভুঁইয়া মাসুম (২৪), মুগদাপাড়ার আসাদুজ্জামান (২৭), উত্তর বাড্ডার আল আমীন (২৬) ও শাহীনবাগের এএম আদনান চৌধুরী (২৮)। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী ২০১৩ সালে ৬৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ৬৩ জনের মধ্যে ৬ জন ছাড়া পেলেও বাকি ৫৭ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছে। র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সারাদেশে গড়ে ৫ জন অপহরণ ও ১০টি গুমের ঘটনা ঘটছে। এ সব অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দলীয় কোন্দল, জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, লেনদেন ও পরকীয়ার ঘটনা জড়িত। র্যাব, পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বহিনীর পরিচয়ে পেশাদার সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে যায় বলে ঐ সব সংস্থা সূত্রে বলা হয়। অনেককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অনেককে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। তারা নিখোঁজই থাকে। অনেকে লাশ হয়ে আসছে। পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, অতীতে অপহরণ হয়েছে। সব সময় হচ্ছে। এসব অপহরণের ঘটনা গুরুত্ব সহকারে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা মনিটর করছে। উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেফতার করে আসছে। পুলিশ যদি ঐ সব কোন অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকে তা হলে প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ অপহরণ নিয়ে আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই বলে আইজি জানান।