আমাদের ব্যাংক খাতে আরো কঠিন সময় আসতে পারে

দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) সঙ্গে সম্প্রতি আমার আলাপ হয়। তারা প্রায় সবাই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিবর্ণ চিত্র তুলে ধরেন। কোনো কোনো সিইও তো সরাসরি বলেই ফেলেন যে দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে যেভাবে চলছে তার পরিণতি ভালো হবে না বরং সামনে অত্যন্ত খারাপ দিনই যেনো আসছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কীভাবে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে খারাপ বা দুঃসময়ের করালগ্রাস থেকে ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে সেটি তাদের কেউই বলতে পারলেন না। ২০১৩ সালে সার্বিকভাবে দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনে কিছুটা ভাটার লক্ষণ দেখা গেছে। কিছু ব্যাংক অবশ্য মোটামুটি ভালো মুনাফা করেছে। কোনো কোনো ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত ভালো মুনাফা করে আসা ব্যাংকও রয়েছে। আবার কোনো কোনো ব্যাংক কৌশলে মুনাফা স্ফীত করে দেখালেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ ব্যাংক খাতে জালিয়াতি-কেলেংকারির কারণে ঋণ বিতরণে কড়াকড়ি আরোপ,আমদানি ব্যবসায় হ্রাস, বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারে মন্দার কারণে মুনাফায় প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হয়। আমি যাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তাদের একজন হলেন দেশের একটি বড় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বেশ ডাকসাইটে সিইও। তিনি তার ব্যাংকের চট্টগ্রাম পোর্টফলিও সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। বরং তিনি যেনো এ নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। আবার তৃতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের সিইও জানালেন, চট্টগ্রামের কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রাহককে দেয়া ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখার পরে তাদের নিট মুনাফা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে এবং এটি হবে তাদের জন্য ‘লাল সংকেত’। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট নির্দেশনামূলক সার্কুলারের কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত রেখেছে। মজার ব্যাপার হলো, যে সব ব্যাংকের চেয়ারম্যানগণ দেশ ও দশের কাছে বেশ পরিচিত তাদের ব্যাংকগুলোও সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। দেশের দুটি পুঁজিবাজারে তাদের ব্যাংকের শেয়ারের দামও তলানির দিকেই পড়ে আছে। তাদের শেয়ার কিনতে বিনিয়োগকারীরা অনীহ। এক সময়ে আমাদের জ্যেষ্ঠ ঋণ কর্মকর্তা ছিলেন, বর্তমানে একটি ব্যাংকের সিইও এমন একজন জানতে চাইলেন, ‘এখন আমাদের কী করতে হবে?’ জবাবে আমি বললাম, ‘আমাদের বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য এটা হলো ‘ক্রান্তিকাল’ বা ‘কঠিন সময়’। বহু দেশের ব্যাংক খাতই এ ধরনের পরিস্থিতি দেখেছে। তখন তাদের ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ অব্যবহূত সম্পদ ও অকার্যকর ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, শেয়ারের দাম পড়ে গেছে এবং মুনাফা কমেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রেখেই কাজ করতে হয়। এর মধ্যে প্রথম ও প্রধান কাজটি হলো, কোনো সুখ্যাতিসম্পন্ন অ্যাকাউন্টিং ফার্ম বা অভিজ্ঞ হিসাববিদকে দিয়ে ব্যাংকের পোর্টফোলিও (আমানত, বিনিয়োগ, শেয়ার, বন্ড, নগদ অর্থসহ সার্বিক আর্থিক সম্পদ) বিশেষভাবে ঋণ পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করে নেয়া। সেই সঙ্গে ব্যাংকের দেয়া ঋণের বিপরীতে নেয়া জামানতের অবস্থা এবং নিরাপত্তাও পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। এক্ষেত্রে সব ঋণের না হলেও ৫০ লাখ ডলার বা ৪০ কোটি টাকা বা এর চেয়ে বড় অংকের ঋণের জামানত যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা উচিত। বিশেষ করে চুক্তিপত্র ও মুচলেকা বা গ্যারান্টিসহ প্রয়োজনীয় দলিলপত্র পর্যালোচনা ও তদারকি কার্যক্রমে জোর দিতে হবে। কারণ ব্যাংকের পর্ষদ বা ঋণ কমিটি অল্পকিছু শর্তের ভিত্তিতে অনেক ঋণ অনুমোদন করে থাকে। ঋণ-গ্রাহকেরাও সব সময় খুব তাড়াহুড়া করে ঋণ পেতে চান এবং ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মকর্তা বা ঋণ প্রশাসনও সব সময়ই গ্রাহকদের দ্রুত লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খুলে দেয়া এবং ঋণ বিতরণ করার চাপে থাকেন। ফলে অধিকাংশ সময়ই ঋণ মঞ্জুরের সব শর্ত পালন নিশ্চিত হয় না। অর্থাত্ ফাঁক-ফোকর থেকে যায়। অনেক গ্রাহক তো এমন সুযোগের অপেক্ষায়ই থাকেন। বেশিরভাগ ব্যাংকেই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি চালু আছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বিকাশমান ব্যাংক খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রতিফলন তো আমরা কালেভদ্রেই কেবল দেখতে পাই। বিস্ময়কর হলো, নানা জালিয়াতি-কেলেংকারির পরও আমাদের ব্যাংকগুলো তেমন আর্থিক বিশ্লেষণ, প্রস্তাব মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা না করেই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করে থাকে। কিন্তু এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না। সময় এসেছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার। এবারে ব্যাংকগুলোকে সঠিকভাবে ঋণ-প্রস্তাব মূল্যায়ন, জামানত ও নিরাপত্তা মানের উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত শর্তাবলী মেনে তবেই ঋণ বিতরণ করতে হবে। কারণ দেশের ব্যাংক খাতে অধিকতর অবনমন রোধ, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও জনগণের আমানতের নিশ্চয়তায় এর কোনো বিকল্প নেই। এবারে আমি একজন ব্যাংকার হিসেবে ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু পরামর্শ রাখতে চাই। এক্ষেত্রে প্রথমেই আমি বলব যে সবচেয়ে সত্, দক্ষ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদেরই ব্যাংকের ঋণ প্রশাসন বা বিভাগ, পোর্টফোলিও পর্যালোচনা বা মূল্যায়ন, ঋণ পুনর্গঠন ও আদায় এসব দায়িত্ব দেয়া উচিত। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদও যদি মনে করে যে আটকে যাওয়া টাকা আদায়ের জন্য ঋণ পুনর্গঠন করায় কিছু ছাড় দেয়া যেতে পারে, তখন সেই কাজটি খুব দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করে এশিয়ায় চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের ব্যাংকগুলো বেশ চমত্কার ফল পেয়েছে এবং ‘নন কোর বা ছোট-খাটো রিলেশনশিপ’ বা হিসাবের ঝামেলা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বার্কলেস ও সিটিগ্রুপের মতো বিশ্বের বৃহত্ ব্যাংকগুলোও ‘ভালো ব্যাংক, মন্দ ব্যাংক’—এই কৌশল হাতে নিয়ে সফলতার সঙ্গে আয়হীন ও নগণ্য আয়ের সম্পর্কে ছেদ ঘটিয়েছে। তাদের এই সাফল্য দেখে বিশ্বব্যাংকের কোনো কোনো পরামর্শক বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতেও একই ধরনের কার্যক্রম চর্চার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বিশেষ করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় এই চর্চায় জোর দিতে বলেছেন। তবে আমাদের এখানে বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও স্থানীয় ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট গঠন করে ঋণ পুনর্গঠন, ‘নিরাপত্তা ও জামানত’ পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে শ্রেণিবিন্যাসিত বা অকার্যকর ঋণ আদায়ে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশে অধিকাংশ ব্যাংকই চেয়ারম্যান অথবা পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশে পরিচালিত হয়। অল্পকিছু ব্যাংক শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত দেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। কিন্তু ব্যাংকগুলো অবশ্যই দলগত ব্যবস্থাপনায় বা প্রক্রিয়াগত নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে তবেই পরিচালনা করা উচিত। যারা ব্যাংক পরিচালনা করছেন তারা নিজেদের এমন কিছু প্রশ্ন করতে পারেন, ‘আমাদের কী সঠিক গাইডলাইন বা দিকনির্দেশনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, নিরীক্ষা নীতিমালা, কমপ্লায়েন্স নীতিমালা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা কিংবা ‘হুইসেল ব্লোয়িং পলিসি’ আছে বা থাকলেও কী সেগুলো মেনে চলি? আমাদের কী উপযুক্ত জনবল আছে? আমাদের মানবসম্পদ কী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত বা চমক দেখাতে সক্ষম? বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো প্রধানত এলসি বা ঋণপত্রজনিত আমদানি ব্যবসা ও ঋণ বিতরণের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া তারা সাধারণত আমাতকারীদের চেয়ে বড় বড় ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহিতাদের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমি মনে করি, ব্যাংকিং সেবাকে সার্বজনীন ও অধিকতর লাভজনক করে তুলতে ব্যাংকগুলো আরও কয়েকটি খাতে মনোনিবেশ করতে পারে। খাতগুলো হচ্ছে—তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাত্মক ব্যবহার, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট বা নগদ ব্যবস্থাপনা, ট্রানজেকশন ব্যাংকিং বা লেনদেন ব্যাংকিং, হোলসেল ব্যাংকিং ও করপোরেট ব্যাংকিং, রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগ চালু ও রিটেইল প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট এবং আমানতের অর্থ দক্ষ ও কার্যকর বিনিয়োগ। এসব কাজ সুচারুভাবে করতে পারলে একদিকে ব্যাংকগুলোর সেবার পরিধি ও মুনাফা অর্জনের প্রবণতা, অ্যাসেট পোর্টফোলিও বা সম্পদের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তাদের তহবিল ব্যয় কমবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো খারাপ বা দুঃসময় আসলে সেটাকে মোকাবিলা করতে বা এড়াতে সক্ষম হবে। ব্যাংকগুলোকে বিদ্যমান ঋণের পুনর্গঠন ও আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি সত্, সঠিক ও সম্ভাবনাময় নতুন গ্রাহক খুঁজে বের করতে হবে। আবার স্কুল ব্যাংকিং ও শুধুমাত্র ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নামে যেখানে-সেখানে শাখা খোলার মতো কিছু জনপ্রিয় ইস্যুতে গা ভাসিয়ে দেয়ার আগেও পূর্বাপর বাছ-বিচার করে দেখা উচিত। আমি কিন্তু পুরোপুরি এগুলোর বিপক্ষে নই। বরং ব্যাংকের অপরাপর কার্যক্রম ও আর্থিক সম্ভাবনা বিচার-বিশ্লেষণ করে তবেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এ জন্য ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তা না হলে কখনো দুঃসময় দেখা দিলে কূল-কিনারা পাওয়া কঠিন হবে, যেটা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দার সময়ে। তখন ইউরোপ-আমেরিকার অনেক বাঘা বাঘা ব্যাংক কীভাবে করুণ পরিণতি দেখেছিল সেটা থেকেও তো আমরা শিক্ষা নিতে পারি। লেখক :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। আইসিসি বাংলাদেশের ব্যাংকিং কৌশল ও অনুশীলন বিষয়ক কমিটির প্রধান