রবীন্দ্রনাথ :শৈশবের পাঠশালায়

রবীন্দ্রনাথ একজন মস্তবড় মানুষ ছিলেন। অনেক নাম-ডাক তাঁর। পৃথিবীর অনেক মানুষ তাঁকে চেনে। নোবেল পুরস্কার অত্যন্ত নামী-দামি একটা পুরস্কার। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন। অনেক লিখেছেন তিনি, বিস্তর সময় দিয়েছেন লেখালেখির জন্য। গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ-ভ্রমণকাহিনি থেকে শুরু করে সাহিত্যের এমন কোনো বিষয় নেই যেটা তিনি লেখেন নি। গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন, নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন, ছবি এঁকেছেন, সৃষ্টির সম্ভারে পরিপূর্ণ রবীন্দ্রনাথের জীবন। রবীন্দ্রগবেষকগণ বলে থাকেন, একজন ভালো পাঠকের জন্যও এক জীবনে রবীন্দ্রনাথ পড়ে শেষ করা সম্ভব নয়। তাহলে ধরে নেয়া যায়, আশি বছরের জীবনে রবীন্দ্রনাথ সময় নষ্ট করেছেন কম। তখন তো টাইপ মেশিন-কম্পিউটার এসব ছিলো না, লিখতে হতো নিজ হাতে। সুন্দর হাতের লেখা ছিলো রবীন্দ্রনাথের, অভিজাত বাংলা অক্ষরে তিনি লিখতেন। এই যে তার ঢাউস-ঢাউস উপন্যাস, গল্প, এগুলো কতোদিনে লিখেছেন? এসব গবেষণার বিষয়। বলা যায়, তিনি নিবিষ্ট ছিলেন, আন্তরিক ছিলেন। একদণ্ড সময় তিনি নষ্ট করেন নি। এমন একজন বড়মাপের মানুষের শৈশবকালটা কেমন ছিলো? স্কুলে যেতেন কীভাবে? পড়াশুনায় কেমন মেধাবী ছিলেন? সে সময়ে পণ্ডিতমশাইরা বেত দিয়ে ছাত্রদের মারতেন পড়াশুনা না পারলে। রবীন্দ্রনাথ কী ভাবতেন এসব দেখে? সাড়ে তিন বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ভর্তি হয়েছিলেন ‘ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমি’র (রবীন্দ্রনাথ এই স্কুলকে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি বলেছেন) শিশুশ্রেণিতে। এর আগে বাড়িতে পড়াশোনা করেছেন, তৈরি হয়েছেন স্কুলে যাবার জন্য। এই ট্রেনিং একাডেমির শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তেমন কিছু লেখেন নি, স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো হয়তো। তবে সেখানে পড়া না পারলে ছাত্রদের বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তার দু’হাত দু’দিকে প্রসারিত করে তার ওপর ক্লাশের ছাত্রদের অনেকগুলো সেস্নট চাপিয়ে দেয়া হতো, এটা তাঁর মনে ছিলো। শুধু এই শাস্তিই নয়, তাদের কিলচড়ও দেয়া হতো। বিষয়টি ঐ ছোট্ট রবীন্দ্রনাথকেও ভাবিয়েছিলো সে সময়। ফলে, তিনি বাড়িতে ফিরে নিজে নিজে শিক্ষকদের অভিনয় করে ছাত্রদের শাস্তি দিতেন। বাড়ির বারান্দার এক কোণে একটি ক্লাশ খুলেছিলেন তিনি। বারান্দার চারপাশে রেলিং ছিলো, কাঠের পায়ার ওপর দাঁড় করানো রেলিং। সেই কাঠের পায়াগুলো ছিলো তার ছাত্র। হাতে লাঠি নিয়ে জলচৌকিতে বসে তিনি মাস্টারি করতেন। কোনো কোনো পায়াকে মারতেন, যেহেতু তারা খারাপ ছাত্র ছিলো। লাঠির আঘাতে রেলিংটা বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু শিশু রবীন্দ্রনাথের ক্ষোভ মেটে নি। কীভাবে বেশি বেশি শাস্তি দেয়া যায় তা নিয়ে তিনি গভীর ভাবতেন। এ পর্যায়টুকু আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে পাই, যদিও এটি পূর্ণবয়স্ক রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি। তিনি তাঁর এই স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘শিক্ষাদান ব্যাপারের মধ্যে যে সমস্ত অবিচার, অধৈর্য, ক্রোধ, পক্ষপাতপরতা ছিল, অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয়ের চেয়ে সেটা অতি সহজেই আয়ত্ত করিয়া লইয়াছিলাম। ...... আমার সঙ্গে আর সংকীর্ণচিত্ত শিক্ষকের মনস্তত্ত্বের লেশমাত্র প্রভেদ ছিল না।’ এ কারণেই তাঁর শিশুমনে শিক্ষকদের সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিলো, তা-ই তাঁকে বিদ্যালয়বিমুখ করে তুলেছিলো( এমন মন্তব্য করেছেন বিখ্যাত রবীন্দ্রগবেষক প্রশান্তকুমার পাল। আসলেই আমরা শিশুদের সামনে যা করি তা-ই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তার মনের ওপর ছায়াপাত করে। রবীন্দ্রনাথ এই স্কুলে বেশিদিন পড়েন নি। সাড়ে চার বছর বয়সে তিনি স্কুল পরিবর্তন করে ভর্তি হয়েছিলেন গভর্ণমেন্ক্ষ পাঠশালায় (যেটিকে অনেকে নর্মাল স্কুল নামে অভিহিত করে থাকেন)। এটি যে রবীন্দ্রনাথের কারণে ঘটেছিলো তা নয়, গবেষকদের মতে, হয়তো ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমির শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে অভিভাবকদের মনেও বিরূপ প্রভাব পড়েছিলো, অথবা হতে পারে জোড়াসাঁকো থেকে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমির দূরত্ব ছিলো বেশি। গভর্ণমেন্ক্ষ পাঠশালা ছিলো ঘরের পাশেই, যদিও তথ্য মতে, রবীন্দ্রনাথ ও ভাই-ভাগিনেয়দের আনা-নেয়া করার জন্য ‘ইস্কুল গাড়ী’র ব্যবস্থা ছিলো ঠাকুর পরিবারে। রবীন্দ্রনাথ এই গভর্ণমেন্ক্ষ পাঠশালায় খুব সম্ভব শিশুশ্রেণীতেই ভর্তি হয়েছিলেন, পড়তেন বর্ণশিক্ষা, ধারাপাত ও লিপিশিক্ষা। সম্ভবতঃ এই তিনটি বিষয় শিশুশ্রেণীর পাঠ্যসূচি ছিলো। এই পাঠশালায় তাকে মাসিক বেতন দিতে হতো বারো আনা (আজকের যুগে যাকে আমরা পঁচাত্তর পয়সা হিসেব করি)। গভর্ণমেন্ক্ষ পাঠশালার স্মৃতি খুব বেশি মনে ছিলো না রবীন্দ্রনাথের, যখন তিনি তার ‘জীবনস্মৃতি’ লিখতে শুরু করেন। তবে তিনি যেটুকু মনে করতে পেরেছেন, সে সম্পর্কে বলেছেন যে, ক্লাশ শুরু হবার পূর্বে সকলে সমবেত হয়ে (তখন তো ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ছিলো না) একটি ইংরেজি কবিতা গাইতেন সুর করে। বোস্টন-নিবাসিনী কবি এলিজা লি কোবাট ফোলেন-এর কবিতা ছিলো ওটি। রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি ‘কলোকী পুলোকী সিংগিল মেলালিং মেলালিং মেলালিং’ উচ্চারণে গাইতেন বটে, কিন্তু ঐ সাড়ে চার বছর বয়সে তার অর্থ উদ্ধার করা শিশু রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব ছিলো না, শিক্ষকরাও তা শেখানোর প্রয়োজন মনে করেন নি। ‘জীবনস্মৃতি’ লেখার সময় এই কবিতাটির কথা উদ্ধার করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছে ‘কলোকী, পুলোকী’ শব্দ দু’টি ছিলো আসলে ‘ফলো মি, ফলো মি’ আর আর ‘সিংগিল’ ছিলো ‘সিঙ্গিং’। ইংরেজির সঙ্গে প্রথম পরিচয় রবীন্দ্রনাথের। গভর্ণমেন্ট পাঠশালা ছিলো শুধুমাত্র বাংলাভাষার মাধ্যমে পাঠদানের স্কুল। ছাত্রদের বাংলাভাষায় পারদর্শী করে তোলার জন্যই এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৮৩৯ সালে। এই স্কুলে রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছুকাল পড়াশুনা করেন। ভর্তির পাঁচ-ছয় মাস পর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে শিশুশ্রেণীর পরবর্তী উচ্চক্লাশে ওঠেন। এই স্কুলে পড়াশোনার সময় বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে তাঁকে পড়তে হয়েছে। এইসময় তাঁর গৃহশিক্ষক ছিলেন স্কুলেরই একজন শিক্ষক নীলকমল ঘোষাল। মাসিক দশ টাকা বেতনে নিযুক্ত এই গৃহশিক্ষক রবীন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ এবং সত্যপ্রসাদকে পড়াতেন। অন্য দু’জন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বছর দু’য়েকের বড়ো। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে এই গৃহশিক্ষক সম্পর্কে লিখেছেন(‘তাঁহার শরীর ক্ষীণ শুষ্ক ও কণ্ঠস্বর তীক্ষ ছিলো। তাঁহাকে মানবজন্মধারী একটি ছিপিছপে বেতের মতো বোধ হইত। সকাল ছটা হইতে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাভার তাঁহার উপর ছিল। ....নীলকমল মাস্টারের ঘড়ি-ধরা সময় ছিল নিরেট। এক মিনিটের তফাত হবার জো ছিল না। খট্খটে রোগা শরীর, কিন্তু স্বাস্থ্য তাঁর ছাত্রেরই মতো, একদিনের জন্যেও মাথা ধরার সুযোগ ঘটল না।’ এই যে স্কুল এবং গৃহশিক্ষকের কাছে বিদ্যাশিক্ষা গ্রহণ, আসলে এসব থেকে রবীন্দ্রনাথ কী শিক্ষালাভ করেছিলেন তার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি। ঠাকুরবাড়ির বইপত্র খরিদের ক্যাশমেমো এবং খরচের হিসাব দেখে রবীন্দ্রগবেষকগণ একটি অনুমানভিত্তিক পাঠ্যকার্যক্রমের ধারণা দিতে পেরেছেন, যেখানে বলা হয়েছে দ্বিতীয়ভাগ বর্ণপরিচয় থেকে যুক্তাক্ষর শেখা, শ্রুতিলিখন, ধারাপাত, মানসাঙ্ক ইত্যাদির মধ্যেই তাঁর লেখাপড়া সীমাবদ্ধ ছিলো। ‘জীবনস্মৃতি’ লেখার সময় গভর্ণমেন্ক্ষ পাঠশালার যে সব চিত্র রবীন্দ্রনাথের মানসপটে ভেসে উঠেছিলো তার কোনোটাই সুখকর ছিলো না, একমাত্র বাংলায় সব ছেলের মধ্যে বেশি নম্বর পাবার বিষয়টি ছাড়া। কিন্তু সে নম্বরপ্রাপ্তি নিয়ে পক্ষপাতের কথা উঠলে স্বয়ং স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ক্ষ পরীক্ষকের পাশে বসে দ্বিতীয়বার রবীন্দ্রনাথের পরীক্ষা নেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য, দ্বিতীয়বার পরীক্ষাতেও রবীন্দ্রনাথ প্রথম হয়ে তাঁর কৃতিত্ব অটুট রেখেছিলেন। এই পাঠশালায় রবীন্দ্রনাথ কারো সাথে মিশতে পারতেন না, কেননা সহপাঠিদের ভাষা ছিলো অশস্নীল এবং অরুচিকর, অশুচি এবং অপমানজনক। ফলে, সহপাঠিরা যখন ক্লাশের ফাঁকে খেলাধূলা করতো, রবীন্দ্রনাথ তখন চাকরকে নিয়ে রাস্তার পাশের ভবনের জানালার পাশে বসে কাটিয়ে দিতেন। একজন শিক্ষক ক্লাশে কুিসত ভাষা ব্যবহার করতেন বলে রবীন্দ্রনাথ তার কোনো প্রশ্নের জবাব দিতেন না, বরঞ্চ তিনি তার ক্লাশে বসে চিন্তার সমুদ্রে ডুব দিতেন। তিনি নিজেই বলেছেন( ‘যখন পড়া চলিত তখন সেই অবকাশে পৃথিবীর অনেক দুরূহ সমস্যার মীমাংসাচেষ্টা করিতাম। অস্ত্রহীন হইয়াও শত্রম্নকে কী করিলে যুদ্ধে হারানো যাইতে পারে, সেটা আমার গভীর চিন্তার বিষয় ছিল।’ রবীন্দ্রনাথের সাত বছর বয়সের তথ্য বিশেস্নষণ করলে দেখা যায়, এ বছর তিনি গৃহশিক্ষক নীলকমল ঘোষালের কাছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘বোধোদয়’ পাঠ শুরু করেন। এই গ্রন্থটি পাঠের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের আশ্চর্য কল্পনাশক্তির বিস্তার লাভ ঘটেছিলো, এটি রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করেছেন। গৃহশিক্ষকের কাছে যখন জানলেন আকাশের নীল গোলকটি কোনো বাধা নয়, অনেক ওপরে ওঠা যায়, তখন ‘আরো সিঁড়ি, আরো সিঁড়ি’ বলে আকাশ ভেদ করে ওপরে ওঠার যে তীব্র আকাঙ্খা তার মনে জেগেছিলো, তা স্তিমিত হয়েছিলো তখন, রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘যখন বুঝা গেল সিঁড়ির সংখ্যা বাড়াইয়া লাভ নাই তখন স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম এবং মনে করিলাম, এটা এমন একটা আশ্চর্য খবর যে পৃথিবীতে যাঁহারা মাস্টারমশায় তাঁহারাই কেবল এটা জানেন, আর কেহ নয়।’ এ বছর তাঁর নতুন কেনা পাঠ্যপুস্তকের খবর পাওয়া যায় না, তবে পাঠশালার সিলেবাস দেখলে বোঝা যায়, তিনি ভূগোল-ইতিহাস-স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে বিদ্যাগ্রহণ করেছিলেন। বাড়ির ভৃত্যদের কাছে সন্ধ্যেবেলার নিয়মিত সভায় শুনেছিলেন রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি। এসব ছিলো তাদের পরিবারের ভৃত্যদের শিক্ষাদানের অংশ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘যেদিন কুশলবের কথা আসিল, বীরবালকেরা তাঁদের বাপখুড়াকে একেবারে মাটি করিয়া দিতে প্রবৃত্ত হইল, সেদিনকার সন্ধ্যাবেলাকার সেই অস্পষ্ট আলোকের সভা নিস্তব্ধ ঔত্সুক্যের নিবিড়তায় যে কিরূপ পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা এখনো মনে পড়ে।’ কৃত্তিবাসের রামায়ণের সঙ্গে এভাবেই রবীন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয় ঘটে। আট বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ গভর্ণমেন্ক্ষ পাঠশালায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছিলেন। গৃহশিক্ষক নীলকমল ঘোষাল ঠাকুরবাড়ির ছাত্রদের বাংলা ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার উপযোগী করে পড়াতেন। ফলে তাদের ইংরেজি শেখার সুযোগ ছিলো না। কিন্তু ইংরেজি না শিখলে ছেলেমেয়েদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হবে না অনুধাবন করে অভিভাবকরা বাড়িতেই তাদের ইংরেজি শিক্ষাদান করার ব্যবস্থা করেছিলেন। রাখালদাস দত্ত তাঁদের ইংরেজি পড়াতেন। খুব বেশিকাল এই শিক্ষক তাঁদের না পড়ালেও সম্ভবতঃ প্যারীচরণ সরকারের ‘ফার্স্টবুক অব রিডিং’ অবলম্বনে ইংরেজি বর্ণমালা এবং আরো কয়েকটি পাঠ রবীন্দ্রনাথ তার কাছে শিখেছিলেন। রাখালবাবু চলে গেলে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর দলের জন্য ইংরেজি গৃহশিক্ষক হিসেবে আসেন মেডিকেলের ছাত্র অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘অঘোর বাবু’ বলে তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে উলেস্নখ করেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর এই কঠিন পড়াশোনা রবীন্দ্রনাথের মনঃপুত ছিলো না। তিনি লিখেছেন ঃ ‘মাস্টারমশায় মিটমিটে আলোয় পড়াতেন প্যারী সরকারের ফার্স্ট বুক। প্রথমে উঠত হাই, তার পর আসত ঘুম, তার পর চোখ রগড়ানি।’ রবীন্দ্রগবেষক প্রশান্তকুমার পালের মতে(‘মাস্টারমশায়ের অন্য ছাত্রেরা সোনার টুকরো ছেলে, ঘুম পেলে তারা চোখে নস্যি ঘষে( এইসব কথা শোনা কিংবা সব ছেলের মধ্যে একলা মুখ্যু হয়ে থাকার বিশ্রী ভাবনাও তাঁকে জাগিয়ে রাখার পক্ষে যথেস্ট ছিল না। রাত্রি ন’টা বাজলে ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে ছুটি মিলত। এভাবেই ইংরেজি ভাষার জগতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রবেশ।’ রবীন্দ্রনাথের জীবনের উল্লেখযোগ্য এবং চমকপ্রদ একটি ঘটনা এই বছরই ঘটে। আর সেটি হলো তাঁর কবিতা রচনা। ফরমায়েসি লেখা। পদ্মফুলের উপর কবিতাটি লিখতে হয়েছিলো তাঁকে। তথ্যমতে, তাঁর চেয়ে বয়সে বেশ বড়ো ভাগিনেয় জ্যোতিপ্রকাশ তাঁকে দিয়ে এই কাজটি করিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘একদিন দুপুরে তাঁহার ঘরে ডাকিয়া লইয়া কেমন করিয়া চোদ্দ অক্ষর মিলাইয়া কবিতা লিখিতে হয় আমাকে বিশেষ করিয়া বুঝাইলেন এবং আমার হাতে একটা সেস্নট দিয়া বলিলেন পদ্মের উপর একটা কবিতা রচনা কর। তাহার পূর্ব্তে বারম্বার রামায়ণ মহাভারত পড়িয়া ও শুনিয়া পদ্যচ্ছন্দ আমার কানে অভ্যস্ত হইয়া আসিয়াছিল। গোটাকতক লাইন লিখিয়া ফেলিলাম। জ্যোতি খুব উত্সাহ দিলেন।’ সেই থেকে শুরু। সেই আট বছর বয়সের শিশুকবি বিশ্বকবি হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। স্কুল-পাঠশালায় শিক্ষাগ্রহণ তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় হলেও কবিতা ছিলো তাঁর ঈশ্বরপ্রদত্ত একটি খোলা বারান্দা, সাহিত্য-সংস্কৃতি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আট বছর বয়সে যিনি কবিতা লিখে সৃষ্টির জগতে পা দিয়েছিলেন, ছন্দের ঝংকার শুনে কবিতার ছন্দ আয়ত্ত করেছিলেন, কিছু সময়ের মধ্যে চোদ্দ অক্ষরের কবিতা রচনার কৌশল শিখে নিয়েছিলেন, তিন যে বড় হয়ে বিশ্বকবি হবেন, তা বলাই বাহুল্য। আট বছরের এমন শিশুকবিকে শ্রদ্ধা জানাতেই হয়।