সিলেটে বিপজ্জনক পাথর কোয়ারি

সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলংসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে মাটির গভীর থেকে বা পাহাড় কেটে নদীর তীর ধসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে পাথর আহরণের ফলে গত কয়েক দশকে এলাকায় সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকট ত্বরান্বিত করছে পাথর উত্তোলনে ব্যবহূত অবৈধ ‘বোমা মেশিন’। এই মেশিন দিয়ে নদীর গহীন থেকেও পাথর তোলা যায়। সিলেট ‘আসাম ফল্টে’র অন্তর্ভুক্ত ও ভূ-কম্পনপ্রবণ এলাকা। সিলেটে যে ভাবে মাটির নিচ থেকে পাথর উত্তোলন হচ্ছে তাতে নদীর তলদেশ সহ ভূ-প্রকৃতির গঠন ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সিলেট অঞ্চলে যে কোন সময় প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে এর ভয়াবহতা তীব্র হবে-এমনি আশঙ্কা এলাকাবাসীর। সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, জাফলং, লালাখাল পর্যটন এলাকা। এ ছাড়া এলাকাগুলো প্রাকৃতিক সম্পদেও ভরপুর। কিন্তু এসব এলাকার সম্পদ ও সম্ভাবনাকে পিছে ফেলে এখন চোখে পড়ে ভয়াবহ চিত্র। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে-মধ্যে যখন অভিযান চালায় তখন পাথরখেকোরা কিছু দিন চুপচাপ থাকে। সিলেটের ভোলাগঞ্জ দেশের সর্ববৃহত্ পাথর কোয়ারি। এর আশপাশ এলাকায় বর্তমান দৃশ্যপট রূপকথার গল্পকেও যেন হার মানায়। মাঠির ৬০-৭০ ফুট নিচের পাথর তোলার জন্য বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার নর-নারী নামে প্রতিদিন। মাটির নিচে ব্যবহার হচ্ছে কয়েক ধাপে সিঁড়ি। দেড় যুগ আগেও কোম্পানীগঞ্জে বহমান নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, নয়ন জুড়ানো ফসলি জমি ছিল। ছিল কমলালেবুর মনোহর বাগান। বন্যপ্রাণীরা ঘুরতো মনের আনন্দে। ধলাই-পিয়ান পাহাড়ী নদীর স্ফটিক-স্বচ্ছ পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বিচরণ ছিল। এখন সেখানে প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। নদীতো নয় যেন খণ্ড খণ্ড জলাশয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় এক শ্রেণীর পাথরখেকোদের হিংস থাবায় এলাকাটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। নদীর তলদেশ, বাড়ির আঙ্গিনা, ফসলের জমিতে কি যে কায়দায় ছোট-বড় পাথর তোলা হচ্ছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করার জো নেই। সিলেটের উজানে বন-বৃক্ষ উজাড় হয়ে পাহাড়গুলো উদাম হচ্ছে। আর বর্ষায় এসব পাহাড় ধুয়ে ভাটির জনপদ বালিতে ভরে যাচ্ছে। এর পরিণাম কি হবে তা অনেকের ধারণা থাকলেও প্রতিকারের কোন উদ্যোগ নেই। পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার ২০১০ সালের এক রীট আবেদনে হাইকোর্ট ‘বোমা মেশিন’ বন্ধের নির্দেশ দেয়। অভিনব এই ‘বোমা মেশিনে’ পাইপ লাগিয়ে পাম্পের সাহায্যে পাথর তোলা হয়ে থাকে যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর পরও সিলেটে থেমে থাকেনি ‘বোমা মেশিনে’র ব্যবহার। বোমা মেশিন আসার পর থেকে পাথর শ্রমিকরা মাঠির ৭০ ফুট নিচে গিয়েও পাথর তুলছে। এতে অনেক লোক ক্ষয়ের ঘটনা ঘটে প্রতিবছর। নিরীহ শ্রমিকরা এভাবে মাঠি চাপা পড়ার ঘটনাকে তাদের ভাগ্য বলেই ধরে নেয়।