সেলুলয়েড রাজা

আপাতত ছকে বাঁধা নিয়মে জীবন বেঁধে নিয়েছেন চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা কিংবা পুত্রবধূরা যেভাবে চাইছেন সেভাবেই নিয়ম করে খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন—সর্বোপরি পরিবারের সদস্যদের সাথেই আড্ডায় মেতে উঠছেন। নায়করাজের ভাষায় পরিবারের সদস্যরাই এখন ডাক্তারের ভূমিকা পালন করছেন। নায়করাজ রাজ্জাক পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবারও যেন দর্শকের মাঝে ফিরে আসেন এই প্রত্যাশাতেই আপাতত নায়করাজের জীবনে এমনই নিয়মের আবির্ভাব। লিখেছেন নূপুর বন্দোপাধ্যায় সকাল ৯টা। গুলশানের লক্ষ্মীকুঞ্জে পৌঁছানো মাত্রই রাজ্জাক পরিবারের অতিপরিচিত মুখগুলো শুভেচ্ছা বিনিময় করেন একের পর এক। বারান্দায় বসে তখন জীবন্ত কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাকের অপেক্ষা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথা যখন শুরু হয় তখন মহান এই নায়কের দু’চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। কারণ যার গান তার গলায় তিনি ধারণ করেছিলেন, যার গান তার কণ্ঠে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সেই বশীর আহমেদের সাথে তার শেষ দেখাটা হয়নি। বিষয়টি মেনেই নিতে পারছেন না এখনও তিনি। ভীষণ কষ্ট নিয়ে নায়করাজ রাজ্জাক বলেন, ‘একটা সময় চলচ্চিত্রে আমার অভিনীত ছবিগুলোতে মাহমুদুন্নবী, বশীর আহমেদ সমানতালে গান গেয়েছেন। মাহমুদুন্নবী অনেক আগেই চলে গেছেন। শেষ পর্যন্ত বশীর আহমেদও চলে গেলেন। টিভিতে যখন সংবাদটা প্রথম জানতে পারলাম তখন ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল আমার। আমার ভীষণ ইচ্ছা ছিল তাকে শেষ দেখাটা দেখার। কিন্তু আমি নিজেই যেহেতু অসুস্থাবস্থা থেকে সুস্থাবস্থার দিকে এগোচ্ছি তাই বাসা থেকে বের হওয়া ডাক্তারের নিষেধ ছিল। বশীর ভাইয়ের স্ত্রী মীনা ভাবীকে বলছি, আমার এই অপারগতা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আজীবন বশীর ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা যেমন ছিল তেমনই থাকবে। আপনাদের পরিবারের সবাইকে আল্লাহ ধৈর্য শক্তি দিন।’ একজন বশীর আহমেদের গাওয়া নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত ‘ময়নামতি’ ছবির ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়, মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়’ গানটি রাজ্জাকের লিপে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। এরপর দু’জনের সমন্বয়ে বহু গানই সুপারহিট হয়েছে। কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক আপাতত পূর্ণাঙ্গ বিশ্রামে থাকলেও তার বড় ছেলে বাপ্পারাজের ছবি পরিচালনার বিষয়টি তিনি ঠিকই মাথায় রেখেছেন। কোথায়, কখন, কীভাবে, কী করতে হবে তা বিশদভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন নায়করাজ। নায়করাজের আশা পরিচালক হিসেবে নতুন এক দিগন্তের সূচনা ঘটাবেন বাপ্পারাজ। ‘কার্তুজ’ ছবিটি নিয়ে তাই রাজ্জাক পরিবারের অনেক স্বপ্ন। বহুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত নায়করাজ রাজ্জাক প্রতিনিয়তই স্বপ্ন দেখেন আমাদের চলচ্চিত্রের ব্যবসা আবারও চাঙ্গা হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এখন চলচ্চিত্রের হাল ধরতে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। প্রতিটি সুন্দর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা থাকে বিশাল। নতুন নতুন অনেক পরিচালক এখন এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করছেন। অনেকের মেধা দেখে আমি মুগ্ধ। তারা ভালো করার চেষ্টা করছে। আমি প্রচণ্ড আশাবাদী যে আমাদের চলচ্চিত্রের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবেই। আমরা পুরোনো ঐতিহ্য অবশ্যই ফিরে পাব।’ প্রয়াত বরেণ্য চলচ্চিত্র সাংবাদিক আহমাদ জামান চৌধুরীর দেওয়া ‘নায়করাজ’ খেতাব পাওয়া রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জের নাকতলা মহল্লায়। তার বাবা আকবর হোসেন আর মা নেসারুন্নেসা। তার বয়স যখন আট কিংবা নয় ঠিক সেই বয়সেই তিনি তার পিতা-মাতা দুজনকেই হারান। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় খুব ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন তিনি। সারা দিন দুষ্টুমী করে ঘুরে বেড়ানোই ছিল যেন তার প্রধান কাজ। আর ছিল ফুটবল খেলা। এলাকায় গোলকিপার হিসেবে তার বেশ সুনামও ছিল। একসময় ঢাকায় এসে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন তিনি। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি ৫০টিরও বেশি নাটকে অভিনয় করেন। তারই বন্ধু জহিরুল হক, খান জয়নুল, খসরু, নোমান, আলী ইমাম, আলতাফ হোসেনের পরিচালনায় নাটকে অভিনয় করেছেন। জহির রায়হান তার দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী তিনি নায়করাজকে ‘বেহুলা’ ছবিতে সুচন্দার বিপরীতে নায়ক হিসেবে কাস্ট করেন। ছবির কাজ শেষ হলো। মুক্তিও পেল। ব্যবসা সফল হলো সে ছবি। পিছনে ফিরে তাকাতে হলো না আর। এরপরের সময়গুলো নায়করাজ রাজ্জাকের জীবনের ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। যেমন করে নায়করাজ রাজ্জাক ঠাঁই করে নিয়েছেন এদেশের কোটি কোটি মানুষের হূদয়ে। ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়েই শেষ করছি—কিছুদিন আগে যখন নায়করাজ স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তখন সুনামগঞ্জের মধ্যনগর বাজারের ষাটোর্ধ্ব বয়সের একজন ভক্ত গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রচণ্ড কৌতূহল থেকে হাসপাতালে এসে নায়করাজের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। প্রবীণ এই ভক্ত নায়করাজ অভিনীত প্রতিটি ছবিই দেখেছেন। নায়করাজ শুধু এতটুকুই বললেন, ‘আপনার বয়সী মানুষ এখনও আমার ভক্ত, আমি ভেবে সত্যিই অবাক হচ্ছি, সেইসাথে আমি ভীষণ সম্মানিত বোধও করছি।’ একজন শিল্পী তার পেশাগত কাজ থেকে অর্থের চেয়ে তার ভক্ত দর্শকের ভালোবাসাকেই সবসময় বড় করে দেখেন, নায়করাজ রাজ্জাক আজীবন তাই দেখে এসেছেন। আর তাই মানুষের ভালোবাসার মাঝেই মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে থাকতে চান যুগের পর যুগ।