কৃষকের স্বাস্থ্য সমস্যা
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ২০:৪৬
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি ৩০ লক্ষ লোক কৃষিপণ্য উত্পাদনে নিয়োজিত। পৃথিবীর মোট শ্রমিক যতজন রয়েছেন এর প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে মাত্র ৯% কৃষিজীবী রয়েছেন শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোতে। এদের প্রায় ৬০% শতাংশ রয়েছেন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ রয়েছেন দারিদ্রসীমার নিচে। দারিদ্র বেশি
পল্লী অঞ্চলে। ছোট চাষী, বর্গাচাষী এধরণের কৃষকের দারিদ্র সীমাহীন।
আর্থ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত নানা উপাদান জোর প্রভাব ফেলে কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন-যাত্রার
মানের উপর। যে পরিবেশে গ্রামের কৃষক কাজ করেন এবং বসবাস করেন, তাদের জীবন যাত্রার মান, তাদের পুষ্টিমান সবই স্বাস্থ্য
সুবিধা ও স্বাস্থ্য সেবার মত
সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া কৃষি কাজে রয়েছে শিশু শ্রমিকেরা। আইএলও-এর অনুমান অনুযায়ী ৫-১৪ বছরের মধ্যে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন শিশু শ্রমিক কাজ
করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এর অর্ধেক কাজ করে পুরো দিন। পল্লী অঞ্চলে নারী শিশুদের প্রাধান্য বেশি শ্রমিক হিসেবে। দীর্ঘ সময় কাজ করেও এরা শ্রমের মূল্য পায় সামান্য। ত্রুটিপূর্ণ কর্ম পরিবেশ, বিরূপ প্রভাব ফেলে শিশু স্বাস্থ্য, বাড়-বাড়ন ও
পুষ্টির উপর। শরীর হয় আহত, কাটা-ছেড়া ক্ষত, চোখে আঘাত লাগা, সংক্রমণ, চর্মের রোগ, জ্বর ও মাথাধরা হয় জীবনের সঙ্গী।
কৃষিজীবীরা কতটুকু পায় স্বাস্থ্য সেবা
উন্নত ও উন্নয়নশীর সব দেশেই স্বাস্থ্যসেবার মান নগর থেকে পল্লী অঞ্চলে নিচুতে। পল্লী থেকে শহরে জনস্থানান্তরের জন্য বড় শহর ও নগরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য সম্প্রদের বিতরণের
ক্ষেত্রে ঘটেছে বৈষম্য। পল্লী অঞ্চল হয়েছে বঞ্চিত। ছোট পল্লী
স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্য কর্মী ও চিকিত্সক ধরে রাখতেও সক্ষম হয়না।
শহর, নগর থেকে পল্লীর অঞ্চল যতদূরে থাকে, স্বাস্থ্য সেবা হয়ে
পড়ে তত দুর্বল।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক সময়ই থাকে কৃষিজীবীরা ও কৃষকেরা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে রাস্তাঘাট ও যানবাহনের অবস্থা যেখানে অনেক সময় থাকেনা, থাকলেও খুব দুর্বল। খাদ্য সরবরাহ যথেষ্ট নয়। সাধারণ রোগ ও পেশাগত রোগের সেসব অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব বেশি। অনেক সময় মহামারী ও স্থানিক নারী কৃষকের দুর্বল স্বাস্থ্য ও দু:খের উপর বড় বোঝা হয়ে আসে। দুর্বল পয়:নিষ্কাশন, পরজীবী কোনও
জীবানু সংক্রমণ, ত্রুটিপূর্ণ বাসস্থান, অপুষ্টি ও জীবানু ঘটিত রোগ
স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আরও
শোচনীয় করে তোলে।
কৃষি কাজ ঝুঁকিপূর্ণ বটে। ঘটে রকম দুর্ঘটনা। আইএলও-এর অনুমান অনযায়ী প্রতি বছর কৃষিজীবীর
২৫০ মিলিয়ন সংখ্যক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন। কৃষিকাজে মেশিন ও কীটনাশক ও অন্যান্য এপ্রোকেমিকাল ব্যবহারের কারণে বেড়ে যায় ঝুঁকি। ট্রাক্টর ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র অনেক
সময় আঘাত হানে তাদের শরীরে। নারী শ্রমিক ও শিশুদের মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। কীটনাশক ও এগ্রোকেমিক্যালের মুখোমুখি হলে পেশাগত ঝুঁকি বাড়ে, বিষক্রিয়া এমনকি মৃত্যু, ক্যান্সার ও
জননতন্দ্রের অসুখও ঘটে।
কৃষিকাজে নারীদের ও
নারী শিশুদের অবদান
কৃষিকাজ ছাড়াও অন্যান্য বেতন ও মজুরির ভিত্তিতে শ্রমের কাজে নারীরা বিপুল হারে নিয়োজিত থেকে অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন। আজকাল অর্ধেকের বেশি মহিলা খাদ্য উত্পাদন ও বিক্রয় বিপননের সঙ্গে জড়িত। বিশ্বের কৃষি কর্মজীবিদের অর্ধেক হলেন মহিলা। আফ্রিকায় ৪৭%, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যাবারিয়ান অঞ্চলে ১৭% এবং এলিয়ায় ৪৪%। অথচ কৃষি উত্পাদনের নারীদের ম্রমকে অবমূল্যায়ন করা হয় এবং এ ক্ষেত্রে প্রকট জেন্ডার বৈষম্য। উন্নয়নশীল দেশে কৃষিকাজে তাদের অংশগ্রহণে শ্রমের মূল্য দেয়াই হয়না বলা চলে। উত্পাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকা ছাড়াও তাদের করতে হয় ঘর গেরস্থালির কাজ, ধোয়া-মোছা, রান্না, বাচ্চাদের প্রতিপালন, বয়স্ক ও রুগ্নলোকদের পরিচর্যা, পানি ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করা। পরিবারের সংস্থানের জন্য করতে হয় আয় করার কাজও। তবে এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। নারীদের ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক দায়িত্বে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। পল্লীগ্রামের অন্যান্য শ্রমিকদের মত কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের ও গৃহবধুদের আঘাত লাগা এবং বিবিধ রোগ হয়, স্বাস্থ্য পরিচর্যায় অনেকটা আওতায় সেগুলো আসেনা। দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হলে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে গর্ভবতী নারীর উপর। বৃদ্ধাদের উপর। গর্ভপাত, অকাল প্রসব হতে পারে পরিনতিতে। শস্যচাষ ও আহরণের সময় কাজের প্রচন্ড চাপও পড়ে। প্রচলিত মেয়েদের কৃষির কাজ যেমন-শস্য রোপন, শস্য আহরণ, প্রস্তুত করা এটি বেশ শ্রমসাধ্য, মেশিন এতে সহায়ক হয়না নারীদের ক্ষেত্রে। ভারবহন, বোঝা নিয়ে চলা গ্রামের মেয়েদের বড় কঠিন একটি কাজ। পানি সংগ্রহ করা, জ্বালানি কাঠ আনা, লন্ডির কাজ, মাথা ও পিঠে বোঝা বয়ে চলা অনেক দূর-এসব কাজ মেয়েদের। এথেকে পেশীও হাড়ের ব্যথা, ক্রনিক ব্যাক পেইন ও গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটে। সার্বিকভাবে রয়েছে কীটনাশক দূষণ, বায়ুদূষণ। এসব কারণে শ্বাসযন্ত্রের ব্যাধি, ও ক্যান্সার। এজন্য পেশাগত স্বাস্থ্যের উপর নজর দেয়া এবং একে সার্কিক স্বাস্থ্য সেবাতে গুরুত্বসহকারে অন্তভূক্ত করা জরুরী।
অধ্যাপক ডা: শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক
ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা