সুস্বাস্থ্যের জন্য কি খাবেন
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ২০:৪৭
পুষ্টিবিদ, পুষ্টি সেবা ও তথ্য কেন্দ্র,
নর্থ সার্কুলার রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৫
খাদ্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এই তিনটি শব্দ একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হলে একজন ব্যক্তির জন্য সুষম খাদ্য নির্বাচন, খাদ্যের সহজ প্রাপ্যতা ও পুষ্টিমূল্য বজায় রেখে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য উত্পাদন, খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির উপর পুষ্টির অবস্থা নির্ভর করে। খাদ্যের কয়েকটি উপাদান যেমন শর্করা, আমিষ, ভটামিন, খনিজ লবণ ও পানি শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণ গ্রহণ করাই হল সুষম খাবার। প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যের উপাদানকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: ম্যাক্রো নিউট্রেন্ট যা শরীরে বেশী প্রয়োজন যেমন শর্করা যা শরীরে শক্তি ও কার্যক্ষমতা যোগায়। চাল, গম, যব, আলু, মিষ্টি আলু, কচু, চিনি, মধু, গুড় ইত্যাদি হতে প্রচুর শক্তি পাওয়া যায়। প্রতি গ্রাম শর্করা হতে ৪ কিলো ক্যালরী শক্তি পাওয়া যায়। প্রোটিন যা দেহ গঠন ও ক্ষয় পুরণকারী খাদ্য। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন রকম ডাল, বরবটি, সিম, মটরশুটি ইত্যাদি দেহ গঠনে সহায়তা করে। প্রতি গ্রাম প্রোটিন হতে ৪ কিলো ক্যালরী শক্তি পাওয়া যায়। চর্বি বা ফ্যাট যা দেহে কর্মক্ষমতা বজায় রাখে এবং ত্বক সুন্দর ও মসৃন রাখে। সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, তিলের তেল, ঘি, মাখন চর্বিযুক্ত মাছ, মাংস, ডিমের কুসুম, কলিজা ইত্যাদি চর্বি জাতীয় খাদ্য। প্রতি গ্রাম তেল চর্বি হতে ৯ কিলো ক্যালরী শক্তি পাওয়া যায়। পানি যা শরীরকে পানি শূন্যতা হতে রক্ষা করে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গাস পানি পান করা দরকার। এছাড়া বিভিন্ন ফলের রস, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা দরকার। আঁশ যা দেহের কৌষ্টকাঠিন্য দূর করে, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, রক্তক্ষরণ, অন্ত্রনালীর সুস্থতা বজায় রাখে। খাদ্যের আঁশ উদ্ভিদজ্জাত খাদ্য হতে পাওয়া যায় যেমন- লাল আটা, যব, ভূট্টা, যবের ছাতু, সীম, সীমের বীচি, ডাল ও ডালজাত খাদ্য, চামড়াসহ ফল যেমন কালোজাম, আঙ্গুর, পেঁয়ারা, আপেল, নাশপতি ও সব ধরনের শাক সবজি। মাইক্রো নিউট্রেন্ট যা শরীরে কম প্রয়োজন কিন্তু খুবই দরকারী। খনিজ লবণ যেমন-ফসফরাস, লৌহ, আয়োডিন, জিংক যা দেহ গঠন, ক্ষয় পূরণ, পরিপোষণ, দেহের শরীরবৃত্তিয় কাজ করে। আয়োডিন গলগন্ড রোগ প্রতিরোধ করে। লৌহ ক্যালাসিয়াম রক্ত স্বল্পতা দূর করে, হাত ও দাঁতের গঠন মজবুত করে। জিংক মানসিক বৃদ্ধি ও হাড়ের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, সবুজ ও রঙ্গিন শাক-সবজি, শুকনা বড়ই, পাকা তেঁতুল, সামুদ্রিক মাছ, আয়োডিন যুক্ত লবণ ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ খনিজ লবণ পাওয়া যায়। ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, সি সব রকমের সবুজ ও রঙ্গিন শাক সবজি, ফল, টক জাতীয় ফল, ডিম, দুধ, কলিজা, ছোট মাছ, লেবুর চা ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য। ভিটামিন এ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ডি, রিকেট রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, বিভিন্ন ত্বকের রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন সি স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। শিশু মৃত্যুর কারণ হিসাবে পেটের অসুখ, হাম, নিউমনিয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক
বৃদ্ধি না ঘটার কারণে আত্মকেন্দ্রিকতা, অবসাদ, ব্যক্তিত্বহীনতা দেখা যায় এবং মেধা শক্তি বিকষিত হতে পারে না। ফলে এসব ছেলে মেয়ে অলস ও উদাসীন, পরনির্ভর নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠে। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর জন্য জম্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই যথেষ্ট এবং ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি আর্ির্থক সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিতে হবে। সাথে লক্ষ্য
রাখতে হবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবানুমুক্ত পরিবেশে খাদ্য
পরিবেশন করা। তাছাড়া সঠিক রান্নার পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সবই স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে প্রভাবিত করে। মারাত্মক পুষ্টিহীন শিশুদের শুধু ডাল, আলু, সবুজ শাক সবজি, তেল দিয়ে রান্না করা খিচুড়ী খাইয়ে অতি অল্প
সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যের উন্নতি
ঘটানো সম্ভব। শিশুর পুষ্টির সাথে বাড়ন্ত ও কৈশোর বয়সে ছেলে-মেয়েদের পুষ্টির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন চুড়ান্ত। তাই পুষ্টির চাহিদাও এ সময়ের পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। এ বয়সে মেয়েদের অপুষ্টি বেশী দেখা যায়। এ বয়সে কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য
প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ক্যালরীর চাহিদা পূরণ করতে হয়।
পরিমিত পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, নিরাপদ পানি, নিয়মিত শারীরিক শ্রম, বিশ্রাম, খেলাধূলা ইত্যাদি বিষয়ের উপর নজর
দিতে হবে। (চলবে)