শ্রম দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙ্গার দৃপ্ত শপথ
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ২১:০৮
শ্রমিক বিরোধী শ্রম আইন বাতিল, আট ঘন্টা কাজের দাবি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতসহ শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি জানিয়ে বৃহস্পতিবার মহান মে দিবস পালিত হয়েছে। এদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন, সমাবেশ ও মিছিল করেন শ্রমিকরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, মহান মে দিবস শ্রমিকদের জন্যে কোন আনন্দের দিন নয়। এই দিনে আমাদের যে শ্রমিক ভাই-বোনেরা আট ঘন্টা শ্রমের দাবিতে জীবন দিয়েছিল, সেই দাবি আজো পূরণ হয়নি। শ্রমিকরা এখনো শ্রম দাসত্বের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, এই দিন শ্রমিকদের ঐক্য ও সংগ্রামের দিন। এই দিবস পুঁজিবাদের মজুরি দাসত্বের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়। দেশে দেশে এখন শ্লোগান উঠেছে ‘পুঁজিবাদ নয়, সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদই মানুষের মুক্তির পথ। বক্তারা আরও বলেন, গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই। যার কারণে মালিকরা একদিকে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করছে, অন্যদিকে শ্রমিকরা সেই অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য মজুরি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। শ্রমিকরা জীবন বিপন্ন করে কাজ করতে গিয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফিরছে। কিন্তু তবুও মালিকরা শ্রমিকদের প্রতি আন্তরিক নন। এখন শ্রমিকদের কঠোর আন্দোলন ছাড়া দাবি আদায়ের কোন পথ নেই বলে জানান বক্তারা।
বক্তারা বলেন, রানা প্লাজা, স্পেকট্রাম ভবন, তাজরীন-হামীম-গরীব অ্যান্ড গরীবী কারখানার ভবন ধস আর আগুনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক। পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছে কয়েকগুণ বেশি শ্রমিক। এসব ঘটনা প্রমাণ করে কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ নেই।
এসময় বক্তারা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে কমপক্ষে ৪০ লাখ টাকা করে এক জীবনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান। বক্তারা অবিলম্বে রানা প্লাজা ও তাজরীন কারখানার দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিসহ কারখানায় শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষের আইনানুগ শাস্তির দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই শ্রমিকদের জন্য পুলিশ-সেনাবাহিনীর মত করে রেশন চালু করার দাবি জানান।
সমাবেশে গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক এর নেতৃবৃন্দ বলেছেন, গৃহশ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিবন্ধন ও পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ‘গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১০’ দ্রুত অনুমোদন করতে হবে। তাদের জন্য শোভন কাজ সংক্রান্ত ‘আইএলও কনভেনশন- ১৮৯’ দ্রুত অনুসমর্থন করতে হবে। এছাড়া গৃহশ্রমিক নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ এর বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ আইএলও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অঙ্গীকার করলেও তা বাস্তবায়ন না করে শ্রমিক-কর্মচারীদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। যা কোন ভাবে মেনে নেয়া যায় না।
তারা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার বাস্তবায়ন ও অবিলম্বে বেতন কমিশনের মাধ্যমে কর্মকর্তা-শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য দূর করে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানান।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে ‘মে-দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটি’। এছাড়া সমাবেশ ও মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সংহতি জানান সংস্কৃতির নয়া সেতু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, গণতান্ত্রিক যুবফোরাম, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, মঙ্গলধ্বনি, জাতীয় কৃষক ও ক্ষেত মজুর সমিতি, বাংলাদেশ লেখক শিবির, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, প্রগতির পরিব্রাজক দল (প্রপদ), নির্বাণ সংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকা মহানগর রিক্সা চালক মজদুর ইউনিয়ন, গার্মেন্টস মজদুর ইউনিয়ন, বহুমুখী শ্রমজীবী ও হকার সমিতি, ওয়ার্কশপ মিস্ত্রি ইউনিয়ন, ফ্যাসিবাদ ও সাম্যবাদ বিরোধী জাতীয় কমিটি এবং জাতি সত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ।