নদীর কাছে আমাদের ঋণ
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ২১:৪২
পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম প্রধান নদীমেখলা এ দেশে গড়ে উঠেছে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা। সুদূর অতীত থেকে নদীভিত্তিক কৃষি সভ্যতার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যসহ শিল্পও গড়ে উঠেছে। অল্প কথায় বলতে গেলে, এ দেশের জীবনের সঙ্গে নিগূঢ়ভাবে জড়িয়ে আছে নদী। নদীর কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। এটা শুধু প্রাকৃতিক প্রবহমান জলধারাই নয়; দেশের সম্পদও বটে। জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ সম্পদের রক্ষাকর্তা কিন্তু আমরাই। দুঃখজনক হলেও সত্য—সেই সম্পদ রক্ষা করা তো দূরে থাক বরং নিজেরাই বিনষ্ট করছি, পাশাপাশি বিপন্ন করে তুলছি পরিবেশ। নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্ব সঙ্কট জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে সৃষ্টি করছি। এর পরিণাম যে এক সময় ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করবে তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়া বা টিকে থাকার সঙ্গে আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ুরও গভীর সম্পর্ক জড়িত। একইসঙ্গে জড়িত কৃষি ও মত্স্যজীবী জীবন। নদী বিপন্ন হলে স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অবস্থাও স্থিতিশীল থাকবে এমনটা আশা করা যায় না। অতএব যত দ্রুত সাবধান হওয়া যায়, ততই সবার জন্য মঙ্গল।
পানিসম্পদ রক্ষা বা নদী ব্যবস্থাপনা নামে একটি কর্তৃপক্ষের অস্তিত্বের কথা শোনা যায়। তাদের কার্যক্রম জোরালো হলে নদ-নদীর অবস্থা এমনটা হতো না। এ বাস্তবতা তাদের নখদর্পণে নেই এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। রাজধানীর চারপাশসহ দেশের সব নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ড্রেজিং ও নদী শাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে বলে আমরা আশাবাদী। নদী শাসন ও নগরায়নকে এক সূত্রে বাঁধতে চাচ্ছে সরকার। এ ব্যাপারে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বড় বড় নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ভরাট করে সেখানে নৌবন্দর, নগর, শিল্প ও বাণিজ্য এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। স্মর্তব্য, বাংলাদেশের বেশ কিছু নদী অস্বাভাবিক রকম প্রশস্ত। সে তুলনায় নদীর গভীরতা কম। এ কারণে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মতো বিশাল নদীতেও নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। এসব নদীর কোথাও কোথাও প্রশস্ততা ২০-২২ কিলোমিটার হলেও গভীরতা ৮-৯ ফুট। শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ কম হওয়া সত্ত্বেও নাব্যতা না থাকায় নৌ পরিবহনের আওতা ক্রমান্বয়ে কমছে। এ সমস্যার সমাধানে বড় নদীগুলোর তীর ভরাট করে নগরায়ন ও শিল্পায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি নদীগুলোর গভীরতা বৃদ্ধির কথা ভাবা হচ্ছে। নদীর প্রশস্ততা কমিয়ে নদীর গভীরতা বাড়ালে নাব্যতা ধরে রাখা যেমন সম্ভব হবে, তেমন শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়াও সহজলভ্য হবে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। নদীর পাড় টেকসইভাবে বাঁধানো এবং নদীকে দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হলে এ মহাপরিকল্পনা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নদী শাসন সম্ভব হলে বন্যা ও নদী ভাঙনের হাত থেকে অনেকাংশে যেমন রক্ষা পাওয়া যাবে তেমন নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। মহাপরিকল্পনাকে সামনে রেখে যমুনা নদীর তীরবর্তী ১৮ কিলোমিটার এলাকাকে পাইলিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ওই এলাকার নদীর প্রশস্ততা তিন-চার কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ রেখে নদী গড়ে ৬০ ফুট গভীর করা হবে। নদী থেকে ওঠানো পলি দিয়ে ভরা হবে দুই পাড়। সেখানে আবাসন প্রকল্প, শিল্পবাণিজ্য কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইকোপার্কসহ নগরায়ন করা হবে। এই প্রকল্প সফল হলে পদ্মা ও মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষেও নগরায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমার মতে, তাত্ত্বিক বিবেচনায় সরকারের মহাপরিকল্পনাটি বেশ উত্সাহ উদ্দীপক হলেও এটির ভালো-মন্দ যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুনো সম্ভব হলে নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আবাসন এবং শিল্পায়নের জন্যেও বিশাল জায়গার সংস্থান হবে।
ঢাকা