স্বকীয়তা হারাচ্ছে বলধা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন

বলধা গার্ডেনের পাশ ঘিরে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনের কারণে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাচ্ছে না এখানকার গাছপালা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে এদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চারপাশে বহুতল ভবনের কারণে এক সময় হারিয়ে যেতে পারে এখানকার বিরল প্রজাতির অনেক গাছপালা ইট-পাথরে ঘেরা ব্যস্ত রাজধানীবাসীর কাছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার দুই আদর্শ স্থান বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বলধা গার্ডেন। বিখ্যাত ও দুষ্প্রাপ্য সব গাছপালা উদ্যান দুটিকে অনন্য স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। সুযোগ পেলেই রাজধানীবাসী ছুটে যেতে চান এসব উদ্যানে। তবে নানা অব্যবস্থাপনায় স্বকীয়তা হারাচ্ছে রাজধানীর ফুসফুস সদৃশ এসব উদ্যান। সরেজমিনে দেখা গেছে, বলধা গার্ডেনের পাশ ঘিরে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনের কারণে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাচ্ছে না এখানকার গাছপালা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে এদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চারপাশে বহুতল ভবনের কারণে এক সময় হারিয়ে যেতে পারে এখানকার বিরল প্রজাতির অনেক গাছপালা। প্রকৃতি প্রেমীদের বক্তব্য, দুষ্প্রাপ্য এসব উদ্ভিদকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বলধায় রয়েছে বহুবর্ষজীবী শারদ মল্লিকা, আফ্রিকা অঞ্চলের অধিবাসী এ্যানোনেসি পরিবারের ঝোপ জাতীয় গাছ ক্যানাংগা, ডালপালা যুক্ত বহুবর্ষজীবী লতানো গাছ কনকসুধা, বিরুত্জাতীয় উদ্ভিদ প্যাপিরাজ, ডালপালাশূন্য গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ পনিটেইল পাম, ধুপগাছ, বার্মা শিমুল, হিং, উভারিয়া, রুপেলিয়া, মিরটেসিও ওলিয়ার মতো অনেক উদ্ভিদ। আর বিদেশ থেকে আনা আফ্রিকান টিউলিপ, নীল পারদ, ক্যান্ডলগাছ, রাজ অশোক, ব্রেড ফ্রুট, লবংগ, কর্পুর, অ্যাভোকাডো, টে-বেবুইয়াম, জ্যাকুইনিয়া, ক্যালিয়েন্ড্রা গাছগুলো শোভা বর্ধন করেছে বোটানিক্যাল গার্ডেনের। নিরাপত্তার অভাব ও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় দর্শনার্থী কমছে জীবন্ত এই উদ্ভিদ সংগ্রহশালায় । আর বড় পরিসরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিরাপত্তার অভাব রয়েছে এমন অভিযোগ খোদ দর্শনার্থীদের। বোটানিকাল গার্ডেন: বোটানিকাল গার্ডেন বা উদ্ভিদ উদ্যান বাংলাদেশে উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মিরপুরে ঢাকা চিড়িয়াখানার পাশে এর অবস্থান। ১৯৬২ সালে প্রায় ২০৮ একর (৮৪ হেক্টর) জায়গা জুড়ে উদ্যানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বলধা গার্ডেন প্রশাসনিক দিক দিয়ে এ উদ্যানেরই অংশ। প্রতিবছর প্রায় ১৫ লক্ষাধিক দর্শনার্থী বোটানিকাল গার্ডেনে বেড়াতে আসেন। ৫৭টি সেকশনে বিভক্ত এ উদ্যানে রয়েছে ৯৫০ প্রজাতির গাছপালা। এর মধ্যে ২৫৫ প্রজাতির ২৮ হাজার ২০০টি বৃক্ষ, ৩১০ প্রজাতির ৮,৪০০টি গুল্ম ও ৩৮৮ প্রজাতির ১০ হাজার ৪০০টি বিরুত্ জাতীয় গাছ আছে। আর ৬টি নেট হাউজে আছে বিরল প্রজাতির অর্কিড ও ক্যাকটাস। উদ্যানে ৩.৫ একর জায়গা নিয়ে তৈরি ২০০ প্রজাতির গোলাপ ফুল দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্ন এক পাওয়া। প্রধান ফটক দিয়ে উদ্যানের প্রবেশ পথে আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা প্রায়বিলুপ্ত প্রজাতির বাওবাব গাছ। প্রধান পথ ধরে একটু সামনে এগুলেই চোখে পড়বে অস্ট্রেলিয়ার সিলভার ওক, জাকারান্ডা ও ট্যাবে বুইয়া, জাপানের কর্পূর, মালয়েশিয়ার ওয়েল পাম, থাইল্যান্ডের রামবুটান। রাস্তার দু’পাশে রয়েছে দেবদারু ও অস্ট্রেলিয়া থেকে সংগ্রহ করা ১৬ প্রজাতির ইউক্যালিপটাস। নানা অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে এই গার্ডেন। এখানে দর্শনার্থীদের গাড়ি নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও তা কেউ মানছে না। প্রবেশ টিকেট ১০ টাকা হলেও ছুটির দিনগুলোতে ২০ টাকা আদায় করা হয়। উদ্যানের কোথাও কোথাও এতটা অপরিচ্ছন্ন যে সেখানে পা ফেলার জায়গা নেই। গেটের রূপনগর আবাসিক এলাকার প্রান্ত ও তুরাগ নদীর প্রান্ত থেকে টিকেট মূল্য প্রায়শই বেশি রাখা হয়। দর্শনার্থীদের এ বিষয়ে অভিযোগ করারও কোন জায়গা নেই। পদ্ম পুকুরের পাশের সাইনবোর্ডে লেখা আছে—‘পদ্মফুল এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেখা যাবে’। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই মে মাসেও পদ্মপুকুরে কোন পানি নেই। দর্শনার্থীদের বক্তব্য, এ অবস্থা থাকলে আগামী এক বছরেও পদ্মফুল দেখা যাবে না। গুলশাল থেকে স্বপরিবারে আসা আমিরুল ইসলাম জানান, পুরো উদ্যানের ভিতরে কোন নিরাপত্তা কর্মীর দেখা নেই। বখাটেদের আনাগোনা বেশি। যত্নের অভাবে কিছু কিছু গাছ মৃতপ্রায়। বহিরাগত হকাররা ভেতরে প্রবেশ করে চড়ামূল্যে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করছে। অভিযোগ রয়েছে, গার্ডেনের ভেতরে থাকা কর্মচারীদের যোগসাজশে নানা অনিয়ম হচ্ছে। ধানমন্ডি থেকে আসা মোহাইমেনুল ইসলাম বলেন, এখানে এসে ভালোই লাগছে। তবে সর্বত্র যেন অব্যবস্থাপনার ছাপ রয়েছে। মিরপুর থেকে আসা এম এ জলিল বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। বলধা গার্ডেন: বলধা গার্ডেনের অবস্থান পুরনো ঢাকার ওয়ারীতে। ১৯০৯ সালে তত্কালীন জমিদার এবং প্রকৃতি প্রেমিক নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এই বলধা এস্টেটস-এর প্রতিষ্ঠাতা। শুরু থেকে পৃথিবীর ৫০টির বেশি দেশ থেকে বিরল লতা ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদ, অর্কিড ও ক্যাকটাস সংগ্রহ করে এ বাগানে এনে রোপন করা হয়। জমিদারের ব্যক্তিগত চেষ্টা ও আদরযত্নে সমৃদ্ধ হয় গাছপালার এ বিশাল সংগ্রহশালা। বর্তমান শংখনদপুকুর এবং সূর্য ঘড়িটিসহ জমিদার এ জায়গাটি ক্রয় করে ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্লভ গাছপালা দিয়ে বাগানটি সাজিয়ে তোলেন। জমিদারের মৃত্যুর পর তদানীন্তন সরকারের হস্তক্ষেপে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। উক্ত ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে বাগানটি পরিচালিত হয়। ১৯৫১ সালে বলধা গার্ডেনটি কোর্টস অব ওয়ার্ডস এর আওতায় ন্যস্ত হয়। এই সময় বাগানটি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে ১৯৬২ সালে তা বনবিভাগের অধীনে ন্যস্ত হয়। এখানে ক্যামেলিয়া, স্বর্ণ অশোক, আফ্রিকান টিউলিপ, বিরল প্রকৃতির দেশি-বিদেশি ক্যাকটাস, অর্কিড, এনথোরিয়াম ভোজ্যপত্রসহ বিচিত্র রকম বকুল গাছ, আমাজান লিলি, রক্তজনা ইত্যাদি প্রায় আটশ প্রজাতির গাছ রয়েছে। তবে সাইকি ও সিবলি অংশে দেশি-বিদেশি প্রায় ১৮ হাজার উদ্ভিদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা আছে। বলধা গার্ডেনের সিবলি অংশের প্রধান আকর্ষণ শঙ্খখনদ পুকুর। পুকুরের দুপাশে সান বাঁধানো ঘাট। সিঁড়ির ধাপগুলো চওড়া। পুকুরের পাশেই বিখ্যাত হাউজ। ১৯২৬ সালে ঢাকা সফরকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাগিচাটি পরিদর্শনে আসেন। ক্যামেলিয়া ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এই হাউজে বসেই তিনি রচনা করেন ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি। বলধা গার্ডেনে একসময় সব বয়সি মানুষের ভীড় লেগে থাকত, ভোর হলেই শরীরচর্চার জন্য ছুটে আসত শিশু থেকে পৌঢ়রা। তবে নানা অব্যবস্থাপনায় পার্কটি তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে। প্রবেশমূল্য ১০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও আদায় করা হয় ২০ টাকা। সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকলেও সব দর্শনার্থীদের দুপুর একটার সময় বের করে দেয়া হয়। আবার নতুন করে ২০ টাকার টিকেট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। আর বেশ কিছু উদ্ভিদ যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। গার্ডেনের দক্ষিণপ্রান্তে অফিস এবং কর্মচারীদের বসবাসের স্থান। এর ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে মৃত প্রায় অনেক প্রজাতি। দর্শনার্থী ও স্থানীয়রা বলছেন, পার্ক কর্তৃপক্ষ ও ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশেই পার্কের ভেতর নানা অনিয়ম হয়। স্থানীয় রাজধানী ফার্মেসির কর্নধার সাইদ বলেন, ছোট বেলায় গার্ডেনে গিয়েছি। শুনেছি ভেতরের পরিবেশ ভাল নয়, এ কারণে নিজেই যাই না, পরিবারের সবাইকেও ওখানে যেতে বারণ করেছি। ফরেস্ট রেঞ্জার দেলোয়ার হোসেন অসুস্থ থাকায় ছুটিতে রয়েছেন। দায়িত্বে থাকায় ফরেস্টার শরীফুল ইসলাম জানান, যারা গেট ইজারা নিয়েছেন তারা স্থানীয়। তাদের বিরুদ্ধে আমি কী করতে পারি। তবে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, ১৯৯৭ সালে সরকারিভাবে ২ টাকা প্রবেশমূল্য করা হয়েছে। ২০০৩-৪ সালে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়া হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়ার জন্য নানা অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে। ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সমভুনাথ বণিক বলেন, ২৭ লাখ টাকা দিয়ে গেট নেয়া হয়েছে। অন্যান্য খরচসহ মোট ব্যয় হবে ৩৫ লাখ টাকা। জেদের বশবর্তী হয়ে গেট বেশি টাকা দিয়ে ইজারা নেয়া হয়েছে। দেলোয়ার হোসেনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ছুটিতে আছি। এখন কী হচ্ছে তা বলতে পারবো না। বলধা গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন একই পরিচালকের অধীনে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এ বি এম আবদুল বারেক বলেন, একটি প্রকল্পের অধীনে গার্ডেনের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে। তিনি জানান, কয়েকদিন ধরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাম্প নষ্ট রয়েছে। এ কারণে পদ্ম পুকুরে পানি দেয়া যাচ্ছে না। নিরাপত্তার বিষয় তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী চিড়িয়াখানায় নিরাপত্তার জন্য আনসার রয়েছে। এখানে আনসার নেই। তবে আনসার প্রয়োজন। প্রবেশের টিকেটের মূল্য বেশি নেয়ার বিষয় তিনি বলেন, প্রবেশ ফি বেশি নেয়ার সুযোগ নেই। গেটে আমাদের নিজস্ব জনবল থাকার কথা। কেন নেই বা ছিল না এ বিষয় আমি দেখব।