কালবৈশাখীতে নিহত ৭
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ২৩:১৮
বৃহস্পতিবার দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বহু স্থানে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ও বজ পাতে ৭ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ১শ। ঘরবাড়ি, মাঠের ফসল, গাছপালা মৌসুমী ফল আম ও লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবে একজন নিখোঁজ। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি। খবর আমাদের আঞ্চলিক কার্যালয় এবং জেলা প্রতিনিধি ও উপজেলা সংবাদদাতাদের।
রাজশাহী অফিস : রাজশাহীতে মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখীর আঘাতে গাছ চাপায় বৃদ্ধ আবু তাহেরের (৭৫) মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যায়। আম ও লিচুসহ বিভিন্ন গাছপালা, জমির ফসল ও কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝরে গেছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের আম ও লিচুর গুটি। এছাড়া কলা গাছ, পেঁপে, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ তাত্ক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। ঝড়ের তাণ্ডবে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে একটানা ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে নগর জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। বৈশাখীর তাণ্ডবে জেলার গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাঘা, চারঘাট ও পবা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঝড়ের সময় আহত অর্ধশত ব্যক্তি চিকিত্সা নিয়েছেন।
ঝড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে ব্যাপক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্যারিস রোডের ওপর বড় বড় গাছ উপড়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসের প্রায় সকল সড়কে গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বিকাল পর্যন্ত সেগুলো সরানো হয়নি। ঝড়ের কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৯ ঘন্টা ধরে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুত্ না থাকায় বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট ওয়াইফাই সংযোগ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হল ও শিক্ষকদের কোয়ার্টারে পানির অভাবও দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল এবং শিক্ষকদের কোয়ার্টারে রান্নাবান্না বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্টরা চরম দুর্ভোগের কবলে পড়েছেন। রাবি বিদ্যুত্ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে ঝড়ের শুরুতে বিদ্যুত্ চলে যায়। প্রায় সকল সড়কে গাছ ও ডালপালা ভেঙ্গে বিদ্যুতের তারের ওপর পড়ায় বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া নগরীর বাইরে পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর ও বাগমারা উপজেলায় পান বরজে ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ঝড়ে বাঘার আড়ানি কেজি স্কুলের চাল উড়ে যাবার খবর পাওয়া গেছে।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) : গোদাগাড়ীতে কালবৈশাখী ঝড়ে ১ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ঝড় ও বৃষ্টিতে উপজেলার রামনগর, সুলতানগঞ্জ, সারাংপুর, কামারপাড়া, বাসুদেবপুর, বালিয়াঘাট্টা, কাকনহাট, মহিশালবাড়ী, রেলগেট, পিরিজপুর, বিদিরপুর, রাজাবাড়ী হাট ও স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ২ হাজার বাড়িঘর নষ্ট হয়ে গেছে। বোরো ধান ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষকরা জানান। ধান মাটিতে পড়ে যাওয়ায় ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজেলার সাগুয়ান ঘুন্টি গ্রামে দেয়ালের চাপায় জসিম (৫) নামের শিশু নিহত হয়েছে। পিতা আব্দুর রহিম জানান, ঝড় ও বৃষ্টির সময় তার মায়ের সাথে ২ ছেলে অবস্থান করার সময় ঝড়ের একপর্যায়ে দেয়াল ধসে জসিমের ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়। এদিকে উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামের আলমের ছেলে মাসুদ, কাজিমের ছেলে আনারুল ও মেডিক্যাল মোড় কুকড়াপাড়া গ্রামের আশরাফুলের ছেলে মাসুদ আহত হয়। আহতদের গোদাগাড়ী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে উপজেলার হুজরাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের চালের টিন উড়ে যাওয়ায় কম্পিউটারের সকল যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে গেছে। ঝড় ও বৃষ্টিতে গাছ-পালা ভেঙ্গে বিদ্যুতের খুঁটির ক্ষতি হওয়ায় দীর্ঘ ২৪ ঘন্টা বিদ্যুত্ বন্ধ থাকার পর শুক্রবার রাত ১০ টায় বিদ্যুত্ স্বাভাবিক হয়।
চারঘাট (রাজশাহী) : রাজশাহীর চারঘাটে কালবৈশাখী ঝড়ে একজন নিহত এবং অপর ৭ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড ঝড়ে বনকিশোর গ্রামের আসমা (৪২) নামে এক গৃহবধূ ঘরচাপা পড়ে নিহত হন। এছাড়া উত্পল, আমিরুল, আকাশ ও ছইমুল্লাসহ আহত ৭ জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা নেন। ঝড়ে কয়েকশ’ কাঁচা ঘরবাড়ি এবং গাছ-পালা ভেঙ্গে গেছে। আমসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এদিকে ঝড়ের কারণে বিদ্যুত্ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুত্ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আজ শনিবার বিকাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে স্থানীয় বিদ্যুত্ অফিস জানিয়েছে।
রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম) : বৃহস্পতিবার রাতে ঝড়ে উপড়ে গেছে রাজীবপুরের বর্ডারহাটের বাঁশের সেতু। ঝড়ে রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। ঝড়ের সময় বজ্রপাতে ২ জনের মৃত্যু অপর ২ জন মারাত্মক আহত হয়েছে। রাজীবপুর উপজেলার শিকারপুর চরের সবুরা বেগম (৫০) মারা যায়। এসময় তার স্বামী জামালউদ্দিন (৫৫) আহত রাজীবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাধীন রয়েছে। অপরদিকে ওই দিন সকালের দিকে বজ্রপাতে মারা গেছে রৌমারী উপজেলার বাগুয়ার চর গ্রামের আলমাছ হোসেনের পুত্র শামীম হোসেন (৯)। এসময় একই গ্রামের সোহরাব হোসেন এর পুত্র আশরাফুল ইসলাম আহত হয়ে রৌমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। এদিকে ঝড়ের তাণ্ডবে রাজীবপুরের বর্ডারহাটের যাতায়াতের জন্য জিঞ্জিরাম নদীর ওপর নির্মিত বাঁশের সেতু উপড়ে গেছে।
বাঘা (রাজশাহী) : বাঘায় ঝড়ে আম ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেকের ঘরের চালা উড়ে গেছে। এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আমের ক্ষতি হয়েছে ২ থেকে আড়াই কোটি টাকার। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর টানা প্রায় এক ঘন্টার ঝড়ে এ ক্ষতি হয়। অনেক জায়গায় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়েছে। পরদিন বিকাল পর্যন্ত বিদ্যুত্হীন ছিল এলাকা। পাকা ধান, আখ, ঢেঁরস, পেঁপে ও সজনে গাছের ডাল ভেঙ্গে ব্যাপক ক্ষতি হয়। বলিহার গ্রামের আমচাষী আব্দুল জলিল সরকার বলেন, তার প্রায় পাঁচটি বাগানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাঘায় প্রায় ২ কোটি টাকার আমের ক্ষতি হয়েছে। ধানেরও ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।
পুঠিয়া (রাজশাহী) : উপজেলার সর্বত্র বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গাছ-পালা ভেঙ্গে গেছে। ধান, ভুট্টা, পানের বরজ ও কলা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। কলাবাগান, ভুট্টাক্ষেত, গাছ-পালা ঝড়ের তাণ্ডবে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আম বেশিরভাগ ঝরে পড়েছে। পানের বরজের পার্শ্ব ও উপরের ছাউনি ঝড়ে উড়ে গেছে। উপজেলার বানেশ্বর কলেজের ছাত্রাবাসসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাল উড়ে গেছে।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) : বৃহস্পতিবার রাতে উল্লাপাড়ায় ঝড়ে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির ডিগ্রিরচর, পারসোনতলা, সলপ, হাটিকুমরুল, বারোইয়া, কয়ড়া, মোহনপুরসহ ৪০টি স্থানে বিদ্যুত্ লাইনের উপর গাছ উপড়ে পড়ে তার ছিঁড়ে যায়। সমিতির ১২টি ফিডার লাইনের মধ্যে ৮টি ফিডার লাইনে রাতভর বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় উল্লাপাড়ার বিদ্যুত্ গ্রাহকদের।
সলপ রেল স্টেশন, কয়ড়া, হাটিকুমরুল ও পঞ্চক্রোশী এলাকায় বহু গাছ-পালা উপড়ে ও ভেঙ্গে পড়েছে। উঠতি ইরি-বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে।
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) : দৌলতপুর উপজেলায় ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দৌলতপুর বিদ্যুিবহীন অবস্থায় আছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে উপজেলা মরিচা, ফিলিপনগর, হোগলবাড়িয়া মথুরাপুর, প্রাগপুর, রামকৃঞ্চপুর, দৌলতপুর, রিফাইতপুর, আড়িয়া ও চিলমারী ইউনিয়নে প্রায় দেড় হাজার আধাপাকা ও কাঁচা ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির ধান, পাট, ভুট্টা, পেঁপে, কলাবাগান ও তিন শতাধিক পানবরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার বিদ্যুত্ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি :পঞ্চগড়ে বজ্রপাতে আবু বক্কর সিদ্দিক (৩৫) নামে এক কৃষক নিহত হয়েছে। আহত হন আজাহার আলী (৩৫) নামের অপর এক কৃষক। বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলার বোদা উপজেলার মাড়েয়া কলোনীপাড়া এলাকায় বজ্রপাতের এই ঘটনাটি ঘটে। এদের দু’জনের বাড়ি ওই এলাকায়।
আশংকাজনক অবস্থায় দু’জনকেই বোদা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসে। চিকিত্সক আবু বক্কর সিদ্দিককে মৃত ঘোষণা করেন। আহত আজাহার বর্তমানে চিকিত্সাধীন রয়েছে।
ঈশ্বরদীতে নিখোঁজ ১
ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, ঝড়ে সাঁড়া ইউনিয়নের মাঝদিয়া ইসলামপাড়া গ্রামের এক মত্স্যশিকারী নিখোঁজ হয়েছেন। গাছ-পালা, বাড়িঘর ও বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের কবলে পড়ে ৩০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত পাকশীর শহীদুল ইসলামকে পাবনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ডুবুরি আশরাফ আলী খান জানান, ঝড় শুরুর আগে সাঁড়া ইউনিয়নে পদ্মানদীতে মাছ ধরতে যান আমিরুল ইসলাম। বাতাসের তোড়ে নৌকাসহ আমিরুল নদীতে ডুবে যান। এরপর থেকে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। ইউএনও মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন জানান, ঈশ্বরদীতে বছরের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়ে অসংখ্য গাছ-পালা, বাড়িঘর ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার সাহাপুর, পাকশী, ছলিমপুর, সাঁড়া ও দাশুড়িয়া ইউনিয়নে এ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ লিচু ও পেঁপের অসংখ্য বাগান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লিচু চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।