গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান
প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৪, ১৯:৩২
মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
বোরের পরমাণু মডেল
পর্ব— ৪
সেদিন তো নীলকান্তবাবু সবকিছু না বলে গল্প শেষ করে দিলেন, অবশ্য সবার মাঝে একটা ঝিমুনির ভাবও এসে গিয়েছিলো। আজ আকাশ সবাইকে টেনে নিয়ে এসে বসালো মামার কাছে, গল্প কথায় পদার্থবিজ্ঞান শুনবে বলে। চন্দ্রা, সীমা, বিন্দু, কমলা, রেখা, অণু সবাই। নীলকান্তবাবু বললেন, এককাপ চা হলে মন্দ হয় না। চানাচুর আর চা।
কমলা বললেন, আনছি। কে কে চা খাবে ?
কেউ কিছু বললো না, মানে সবাই খাবে। এরা কিছু না বলার মানে ঠিক করেছে চা খাবে। না খেলে বলবে আমি খাবো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেতে করে চা আর চানাচুর এলো। জমলো আসর। গল্প কথায় পদার্থবিজ্ঞানের আসর।
নীলকান্তবাবু বললেন— কোথা থেকে শুরু করবো ?
বিন্দু বললো— ঐ যে তখন বললে না, ঋণাত্মক আর ধনাত্মক ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে। বললেন নীলকান্তবাবু। ঋণাত্মক আর ধনাত্মক আধান। আগে শোনো আধান কী।
চার্জ। বললো আকাশ। এই যে আমরা মোবাইলের ব্যাটারি চার্জ দিই।
তা তো বুঝলাম, আধান মানে চার্জ, চার্জটা কী ? আধানের ইংরেজিইতো চার্জ। তাহলে চার্জ কী ?
আকাশ চুপ করে থাকলো। জানে না।
নীলকান্তবাবু বললেন— এই যে ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন বললাম, এদের বৈশিষ্ট্যমূলক ধর্মই হলো চার্জ বা আধান। যেমন ইলেকট্রনের চার্জ হলো ঋণাত্মক বা নিগেটিভ। প্রোটনের চার্জ ধনাত্মক বা পজিটিভ।
আর নিউট্রন ? বললো আকাশ।
নিউট্রন নিউট্রাল। মামা বললেন। নিউট্রনের কোনো চার্জ নেই। মানে তড়িত্ নিরপেক্ষ।
কিন্তু তুমি গতদিন বললে রাদারফোর্ডের ব্যাখ্যায় কী যেন ত্রুটি থেকে গেলো ? বললো বিন্দু।
হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু। রাদারফোর্ডের মতে পরমাণুতে ইলেকট্রন ঘুরতে থাকলে এর বেগের দিক পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে এতে ত্বরণ ঘটে। আর আধানযুক্ত কণিকার ত্বরণ থাকলে এর মধ্য থেকে তাড়িেচৗম্বক বিকিরণ বের হয়।
কিন্তু ত্বরণটা কী ? বললো রেখা।
ত্বরণ হলো প্রতি সেকেন্ডে বেগ পরিবর্তনের হার।
আর তাড়িেচৗম্বক বিকিরণ ? কমলা বললেন। তিনি কমার্স গ্র্যাজুয়েট। এতোসব ফিজিক্সএর ধার ধারেন না।
নীলকান্তবাবু বললেন— বিকিরণ হলো রশ্মি নির্গত হওয়া। যেমন সূর্য থেকে আলোকরশ্মি নির্গত হয়, একে বলি আলোর বিকিরণ। আর তাড়িেচৗম্বক বিকিরণ মানে হলো— এক্সরশ্মি, গামারশ্মিসহ আরো অনেক ধরনের রশ্মি নির্গত হওয়া।
সীমা বললো— এক্সরশ্মি মানে কি আমরা যে হাড় ভেঙ্গে গেলে এক্সরে করি এটি ?
হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু। এটিই এক্সরে বা এক্সরশ্মি। ইলেকট্রন থেকে তাড়িেচৗম্বক বিকিরণ হলে এর শক্তি ক্ষয় হতে থাকে এবং এর ব্যাসার্ধ কমতে থাকে। আস্তে আস্তে এটি পরমাণুর কেন্দ্রে এসে একেবারে স্থির হয়ে যাবার কথা। এতে পরমাণুর গঠন কাঠামোর অস্তিত্বই আর থাকার কথা নয়।
তাহলে তো সমস্যা। বললো সীমা। সে কী বুঝেছে না বুঝেছে সেই জানে।
হ্যাঁ, এরজন্য 1913 সালে ডেনমার্কের পদার্থবিজ্ঞানী নিলস্ বোর পরমাণুর গঠন সম্পর্কে একটা নতুন মডেল উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, পরমাণুতে ইলেকট্রনগুলো একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে। এই কক্ষপথের ব্যাসার্ধ নির্দিষ্ট করা এবং ছিন্নায়িত।
ছিন্নায়িত মানে ? বললো রেখা। সে এতোক্ষণ চুপ করে শুনছিলো।
ছিন্নায়িত মানে হলো বিচ্ছিন্ন। যেমন মানুষ হাঁটে কীভাবে ? এক কদম , পরে আরেক কদম। ব্যাঙও এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে। কিন্তু সাপ কীভাবে হাঁটে ? কোনো গ্যাপ থাকে ? সাপ, কেঁচো এরা হাঁটে অবিচ্ছিন্ন পথে। মানুষসহ আরো অনেক প্রাণী হাঁটে ছিন্নায়িত পথে। এরকম পরমাণুর কক্ষপথও বিচ্ছিন্ন। প্রথম কক্ষপথের ব্যাসার্ধ যত বড়, এর পরেরটা চারগুণ, এর পরেরটা নয়গুণ। এরপর ষোলগুণ। এভাবে বাড়তে থাকে।
আকাশ বললো, বুঝেছি স্কয়ার করে করে বাড়ে। দুই এর বর্গ চার, তিনের বর্গ নয়, চারের বর্গ ষোল এভাবে।
ঠিক তাই। বললেন নীলকান্তবাবু। নিলস্ বোর একথা বললেন। আরো বললেন, ইলেকট্রন ঘূর্ণনের সময় কোনো শক্তি বিকিরণ করে না। তবে এক কক্ষপথ থেকে অন্য কক্ষপথে যাবার সময় কিছুটা শক্তি বিকিরণ করে।
কমলা বললেন, বুঝলাম না, শক্তি বিকিরণ করে আবার কী ? একটু আগে বললে সূর্যের আলো বিকিরণ করে। এখন আবার বলছো শক্তি বিকিরণ করে। শক্তিটা আবার কী ? এরা কি মারামারি করে নাকি ?
ওহ্ হো, তোমাদেরকে তো শক্তি মানে বোঝানো হয়নি। শক্তি হলো কাজ।
কিন্তু কী কাজ ? বললো সীমা। আমরা সবাই তো কাজ করি, সেই কাজ ?
নীলকান্তবাবু বললেন— সেই কাজ, আবার সেই কাজও নয়।
কমলা বললেন, তুমি একটা কথা পরিস্কার করে বলো না। সেই কাজ, আবার সেই কাজ নয়, এটা আবার কী? আমার বাপু অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। আমি এখন যাবো।
বিন্দু বললো, আমরাও যাবো। এতোসব কঠিন কঠিন গল্প মজা লাগছে না। আজকের মতো শেষ করে দাও।