কৃষিতে নারী শ্রম ও স্বীকৃতি

সৃষ্টির আদিপেশা কৃষি। সূচনা হয়েছিল নারীর হাত দিয়ে। দেশে মোট শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে নারী যার ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মত্স্য খাতের সাথে জড়িত। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে এর কোন হিসাব নেই। শ্রমিক হিসেবে নেই মূল্যায়ন। কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের স্বীকৃতির অভাব লক্ষণীয়। এছাড়া নিয়মহীন নিযুক্তি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বল্প মজুরি, মজুরি বৈষম্য ইত্যাদি তো থাকছেই। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কৃষিখাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। কৃষি কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ লাখ। এ বৃদ্ধির হার ১১৬ শতাংশ। যদিও এদের ৭২ শতাংশই অবৈতনিক পারিবারিক নারী শ্রমিক। কৃষি খাতে গত এক দশকে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমেছে ১০.৪ শতাংশ। শ্রমশক্তির সংজ্ঞানুযায়ী, ২৯ শতাংশ নারীই কেবল শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। সিএসআরএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ নারী গৃহকর্মে সরাসরি অবদান রাখছেন। এদের অনেকে কিষানী, তবে তা শ্রমশক্তির বিবেচনায় ‘অদৃশ্য’। কিন্তু পুরুষদের মধ্যে যারা শ্রমশক্তির বাইরে পড়েছেন, তাদের ৬৫ শতাংশ ‘ছাত্র’ হিসেবে স্বীকৃত ! শুধু নারীরই যেন স্বীকৃতির দরকার নেই। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে প্রদত্ত এক কোটি ৩৯ লাখ কৃষক কার্ড বিতরণ করা হলেও কতজন কিষানী এই ‘কৃষক কার্ড’ পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা তা জানেন না। কৃষিখাতের ২১টি কাজের ধাপের মধ্যে ১৭টি ধাপেই নারীর অংশগ্রহণ বিদ্যমান। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮১ সালে ঘোষিত নারীর প্রতি বিরাজমান সব রকম বৈষম্য বিলোপের দলিল যা সংক্ষেপে সিডও সনদ নামে পরিচিত। ১৯৯৮ সালে কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিল ‘অন্ন জোগায় নারী’ এ স্লোগানটি। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে ১৮৯টি দেশের প্রায় ৩০ হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে নারী উন্নয়নের সামগ্রিক রূপরেখা হিসেবে ‘বেইজিং ঘোষণা ও প্লাটফরম ফর অ্যাকশন’ গৃহীত হয়। এরই আলোকে ২০১১ সালে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণীত ও মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে। রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়নে নারীর কাজের সামাজিক ও আর্থিক স্বীকৃতি আবশ্যক। এজন্য নারী কৃষি শ্রমিকদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান, সমান মজুরি নিশ্চিত করা, অগ্রাধিকার দেয়া, পেশাগত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কৃষানীদের অগ্রাধিকার দেয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেন বিশেষজ্ঞরা।