দলীয় বিদ্রোহের মুখে পড়তে পারেন মোদী
প্রকাশ : ০৪ মে ২০১৪, ২১:০০
লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতি ভারতের সর্বত্রজুড়ে। তবে মধ্য প্রদেশের এক কোণে মোদীর উপস্থিতি একটু কমই মনে হয়। গত মাসে ভূমিবেষ্টিত রাজ্যটিতে এক সমাবেশে অনেকগুলো গ্রামের বাসিন্দা জড়ো হয়েছিলো। যেখানে ভাষণ দেন বিজেপির প্রভাবশালী নারী নেত্রী ও পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের বিরোধী দলীয় নেতা সুষমা স্বরাজ। ভাষণে তিনি একটিবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মোদীর নাম উচ্চারণ করেননি। যাতে অনেকেই অবাক হয়েছেন।
মোদী প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হয়ে দলের নেতৃত্বে আসার পর এখন পর্যন্ত যে কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন সুষমা স্বরাজ। দলের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় বয়স্ক নেতা হলেন এল কে আদভানি। তিনি এখন দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নেই। মধ্য প্রদেশের ভুপাল আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলেও পশ্চিম গুজরাটের গান্ধীনগর থেকে তাকে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে এক প্রকারে বাধ্য হয়েই। দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী যশোবন্ত সিংকে পশ্চিম রাজস্থানের বারমার আসনে মনোনয়ন না দেয়ায় তিনি ঐ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। শিষ্টাচার বহির্ভূতভাবে উত্তর প্রদেশের বারানসি আসন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে অটল বিহারী বাজপেয়ী ও আদভানির ঘনিষ্ঠ সহচর মুরালি মনোহর যোশীকে। পূর্ব আহমেদাবাদের এমপি ও বিজেপির প্রভাবশালী নেতা হারিণ পাঠকও এবার অনেকটাই অবাঞ্ছিত। এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ হলেও বিজেপি নেতারা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি।
তবে নির্বাচনে যদি বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় বা একটি স্থিতিশীল জোট করার জন্য প্রয়োজনীয় আসন পেতে ব্যর্থ হয় সেক্ষেত্রে দলের মধ্যে বিবাদের বিষয়টি সামনে চলে আসতে পারে। বেশিরভাগ জরিপই বলছে, মোদীর বিজেপি অনেক আসন পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ভারতের রাজনীতি বিশ্লেষক প্রাণজয় গুহ ঠাকুরতার মতে, মোদী শুধু কংগ্রেস ও ইউপিএ জোটের বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে না তাকে বিজেপিরও বিরোধিতার মুখেও পড়তে হচ্ছে। সুষমা স্বরাজ ও লাল কৃষ্ণ আদভানি হলেন মোদী বিরোধী পক্ষের অংশ। আর তারা সুযোগ পেলে অবশ্যই কর্তৃত্ব দেখাবে।
অন্যদিকে, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আঞ্চলিক দলগুলো যারা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করবে তারাও ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় হাজারের বেশি লোকের প্রাণহানীর জন্য মোদীকে দোষারোপ করে আসছে। কংগ্রেসও চেষ্টা করছে বিজেপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিতে। গত মার্চে কংগ্রেসের এক নেতা বলেন, স্বরাজ মোদীর চেয়ে অনেক ভালো প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। বিজেপিতে নেতাদের কোণঠাসা করার বিষয়টি রাহুল গান্ধীও তার বক্তব্যে বিভিন্ন সময় বলেছেন।
আদভানির সহযোগী হিসেবেই পরিচিত সুষমা স্বরাজ। তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু মনোনয়নের পর প্রার্থী নির্বাচনে সুষমা স্বরাজের মতামতকে গ্রাহ্য করেনি মোদীর নেতৃত্ব। গত মাসে তিনি যশোবন্ত সিংকে মনোনয়ন না দেয়ার বিষয়ে বলেন, দলের নির্বাচনী কমিটিতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনায় হয়নি। দলের এ সিদ্ধান্তে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই মর্মাহত। গত বছর মোদীকে নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান করার পর আদভানি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও পরে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়। তার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেয়ায় দুই মাস আগেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
যাহোক, বিজেপি এখন অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে সামনে আনতে চাইছে না। দলের কোষাধ্যক্ষ পিযুষ গয়ালের বক্তব্য হলো দলের অভ্যন্তরে ‘স্পন্দমান’ গণতন্ত্র রয়েছে। দলের সকল নেতাকর্মীর দৃঢ়ভাবেই মোদীর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও মধ্য প্রদেশের নির্বাচনী সভায় অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন সুষমা স্বরাজ। জনগণকে দেয়া লিফলেটে ছিলো তার বিবরণ। আর মোদীর ছবি ছাপানো হয়েছে লিফলেটের উল্টো পাশে। সুষমা স্বরাজের কারিশমা আছে। তিনি পার্লামেন্টে জনগণের কণ্ঠস্বর। এখানকার এক কর্মীর মতে, বিজেপিতে পরিবর্তন আসবে আর প্রধানমন্ত্রী হবেন সুষমা।
ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে সুষমা স্বরাজ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি হরিয়ানা রাজ্যে মন্ত্রী হয়েছিলেন। এরপর তিনি ভারতের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতের নারী কেবল অপারেটর রুপ শর্মার দাবি সুষমা স্বরাজ ভারতের সবচেয়ে ভাল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ছিলেন। একবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। অনেকের মতে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা উচিত ছিলো। যদিও সেটা হয়নি। এখন পর্যন্ত বিজেপি দলের ভেতরকার উত্তেজনা চাপিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত মাসে দলের ইশতেহার প্রকাশের সময় দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সুষমা স্বরাজ। গত সপ্তাহে বিহারে এক সমাবেশে বলেছেন, মোদীর নেতৃত্ব দেয়ার চমত্কার ক্ষমতা আছে। এবারের নির্বাচনে বিজেপির প্রচারণা কৌশল হলো মোদীকে নির্বাচনী মুখে পরিণত করা। এ প্রজেক্ট অনুযায়ী বর্ষীয়ান নেতারা এখন সাইডলাইনে। বলা চলে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছেন মোদী।
তবে বিরোধীদের মনোভাব হলো ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার জন্য মোদী দায়ী। মমতা ব্যানার্জি তাকে গুজরাটের কসাই বলে আখ্যায়িত করেছে। যদিও মোদী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, মোদী জ্যেষ্ঠ নেতাদের চেয়ে কনিষ্ঠ নেতাদের বেছে নিচ্ছেন যারা তার প্রতি বেশি অনুগত। কারণ স্বরাজ বা দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা দলের ভাগ্যের জন্য মোদীকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না।
বিজেপির সাম্প্রতিক কার্যক্রমে মনে হচ্ছে, তারা এবার অতি আত্মবিশ্বাসী। আর এজন্য পরিণতিতে মূল্য দিতে হতে পারে বিজেপিকে। তাদের ভাগ্য সম্ভবত সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে গিয়েছে আর এখন ক্রমাবনতি হচ্ছে। আপাতত দলীয় দ্বন্দ্বের সবকিছু নির্ভর করছে এখন নির্বাচনে আসন সংখ্যার উপর।