পশ্চিমবঙ্গে ‘বর্ণময়’ ভোটযুদ্ধ

অনেক রঙের সমষ্টি একসঙ্গে যুক্ত হলেই বর্ণময় বলা যায়। যে কেউই শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে তাকালেই বুঝতে পারবেন কতটা ‘বর্ণময়’ হতে পারে ভোট। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে নানা ঘটনা, ইস্যু নিয়ে তুমুল চর্চা চলছে। সারদা ইস্যু থেকে বাংলাদেশি বিতাড়ণ। কিছুদিন আগেও ছিল তিস্তা-ছিটমহল ইস্যু থেকে মমতার ছবি বির্তক। আছে সংখ্যালঘু তাস ব্যবহার করার মতো রাজনৈতিক কূট-কৌশল। মিডিয়ার এক অংশও সূক্ষ্মভাবে কোনও কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আক্রমণ করে চলেছে। সবমিলিয়ে নানা ইস্যুতে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, যুক্তি-তর্ক, ভাষা সন্ত্রাস ইত্যাদি মিলিয়ে জমজমাট ভোট-যুদ্ধ। রাজনীতির হেভিওয়েট প্রার্থী এবং সেলিব্রেটি প্রার্থীদের নিয়েও আলোচনায় চায়ের টেবিলেও ঝড় তুলছেন অনেকেই। কলকাতার কফি হাউজ বরাবরই এসব আলোচনার জায়গা হয়ে ওঠে। শনিবার দুপুরে দেখা গেল, বিজেপি না কংগ্রেস কেন্দ্রে তৃতীয় ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসছে নাকি মমতার দলই কেন্দ্রের ক্ষমতায় নির্ণায়ক শক্তি হতে যাচ্ছে; এসব আলোচনায় ছিল কফি-সিঙ্গাড়ার সঙ্গে সবার মুখে মুখে। তিন দফার নির্বাচনে এ পর্যন্ত ১৯ আসনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। বাকি ২৩ আসনের ভোট গ্রহণ। বাসুদেব আচার্য, মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তী, বংশ গোপাল চৌধুরীর মতো হেভিওয়েট বাম প্রার্থীরা যেমন এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতি কেন্দ্রীয় রেলপ্রতিমন্ত্রী অধীর চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী দীপা দাশমুন্সি, গণি পরিবারের সদস্য আবু হাসেম খান চৌধুরী, মৌসুম বেনজির নূর কিংবা রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পুত্র অভিজিতের মতো কংগ্রেসের ঝানু-রাজনীতিকরাও ভোট ময়দানে নেমেছেন এবার। রাজ্যের শাসক দলের একডজনের বেশি হেভিওয়েট নেতার মধ্যে বাবা-ছেলে শিশির অধিকারী, শুভেন্দু অধিকারি, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে রয়েছেন প্রায় একডজন সেলিব্রেটি প্রার্থী। তাঁরা হলেন, সন্ধ্যা রায়, দেব, শতাব্দি রায়, তাপস পাল, ইন্দ্রনীল ঘোষ, সৌমিত্র রায়, অর্পিতা ঘোষ এবং অবশ্যই যাদবপুরের প্রার্থী ড. সুগত বসু। তিনি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রপৌত্র। ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপিও কম যায়নি। বরং তৃণমূলের পরের সেলিব্রেটি প্রার্থী দাঁড় করিয়ে রীতিমত ভোটের চমক তৈরি করেছে হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী দলটি। বাপ্পি লাহিড়ী, যাদুসম্রাট পিসি সরকার, বর্ষীয়ান অভিনেতা জর্জ বেকারসহ ছয়-ছয়জন সেলিব্রেটি প্রার্থী এবার বিজেপির প্রার্থী। কলকাতার উত্তর কেন্দ্রে প্রার্থী এবার তিন দলের তিন হেভিওয়েট প্রার্থী কংগ্রেসের সৌমেন মিত্র, বিজেপির রাহুল সিনহা এবং তৃণমূলের সুদীপ বন্দ্যোপ্যাধায়। দেশজুড়ে যেভাবে মোদী হাওয়া বইছে তাতে করে রাহুল এবার শক্ত প্রতিপক্ষ বলেই মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। যাদবপুর আসনে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রপৌত্র ড. সুগত বসু লড়ছেন। ওই আসনে তৃণমূলের বর্তমান এমপি কবীর সুমন। তিনি এবার লড়ছেন না। মাওবাদীদের পক্ষে গান লিখে তৃণমূল নেত্রীর রোষানলে পড়েন সুমন। পরবর্তীতে প্রকাশ্যেই তৃণমূলের নীতির সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সে কারণেই তৃণমূল তাকে এবার টিকিট দেয়নি। তাই ওই আসনে সুগত বসুকে টিকিট দিয়েছেন মমতা। প্রতিপক্ষ সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী। ফলে আসনটি নিয়েও আলোচনা চলছে। বারাসাত আসনে তৃণমূলের ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কাকলি ঘোষ দস্তিদার। সেখানে বিজেপির সেলিব্রেটি প্রার্থী প্রদীপ কুমার সরকার সংক্ষেপে যাকে দেশ-বিদেশের মানুষ পিসি সরকার বলে চেনেন। হুগলির শ্রীরামপুরের তৃণমূলের আইনজীবী নেতা বলে পরিচিত কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপির বাপ্পি লাহিড়ী লড়ছেন। কৃষ্ণনগর আসনে তৃণমূলের অভিনেতা তাপস পালের সঙ্গে লড়ছেন বিজেপির সত্যব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরভূমে তৃণমূলের শতাব্দি রায়, বিজেপির জয় বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন লড়ছেন এরই মধ্যে তেমন প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গে দার্জিলিং আসনের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছে ভাইচুং ভূটিয়ারও। চতুর্থ দফার ভোট হবে ৭ মে। সেদিন ভোট হবে বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, আসানসোল, ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া এই ছয় আসনে। বাঁকুড়া থেকে লড়ছেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের মেয়ে শ্রীমতী দেববর্মা বা মুনমুন সেন। যার বিরুদ্ধে তার লড়াই তিনি ৯ বারের জয়ী সিপিএমের বাসুদেব আচার্য। মেদেনীপুরের আছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়ও। গত রবিবার হুগলি শ্রীরামপুরের দলের তিন প্রার্থীর সমর্থনে এসে ১৬ তারিখের পর বাক্স-পেটরা নিয়ে বাংলাদেশিদের রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে এমন হুমকি দিয়ে গেছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী। এই হুমকি এবার বিজেপির বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবেই তৃণমূল ব্যবহার করছে। ১২ তারিখ ভারতের চূড়ান্ত এবং নবম পর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গেও শেষ দফার ভোট গ্রহণ হবে। এর আগে ৭ মে আবার একদিনের ঝটিকা সফর করে বারাসাত, নদীয়া এবং উত্তর কলকাতায় তিনটি সভা করবেন মোদী। এর আগে উত্তরবঙ্গের কংগ্রেস বেল্ট বলে খ্যাত এলাকায় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং থেকে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী প্রচার করে গেছেন কয়েক দফায়। ৪২ আসনের লোকসভায় বিজেপি সব আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। তবুও এবার তাদের দেয়া ১৮ আসনের মধ্যে অন্তত ৩ থেকে ৪টি আসন পাওয়ার টার্গেট রয়েছে দলটির। যদিও তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, তাদের ১৭ থেকে ৩২ আসন হবে এবার। মোদী হাওয়া নেই এই রাজ্যে- এখানে একমাত্র হাওয়া ‘মমতা ব্যানার্জি’।