আদিবাসী সম্পর্কে গোঁজামিল প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগ

‘ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) অ্যান্ড রাইটস অব দি ইন্ডিজেনিয়াস পিপলস: বাংলাদেশ পারসপেকটিভ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘ভূমি কমিশন’ অংশ বাস্তবায়ন না করে শান্তিচুক্তির অধিকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে রাষ্ট্র বিশ্ববাসীর কাছে যে দাবি করছেন, তাতে করে দেশের মানুষ, বিশেষ করে আদিবাসী সমাজকে বোকা বানানো হচ্ছে। তবে জনগণকে বোকা বানানো এতো সহজে সম্ভব নয়। সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মিজানুর রহমান এ সব কথা বলেন। বৈঠকটি পরিচালনা করেন, আয়োজক সংগঠনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের ব্যবস্থাপক সৌভাগ্য মঙ্গল চাকমা। ড. মিজানুর রহমান বলেন, জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইউপিআর-এ গিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসী সম্পর্কে গোঁজামিল প্রতিবেদন দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বরং বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দিচ্ছে রাষ্ট্র। বাংলাদেশের আদিবাসীদের সব অধিকার দিয়ে যদি জীবনের অধিকারই না দেয়া হয়, তবে অন্য সব অধিকারের মূল্য কি বলে সরকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন তিনি। এ সময় রামুতে সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলার জন্য সেখানকার জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়েছে কিনা সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, যারা আদিবাসী ককাসে থাকবেন তাদের আদিবাসীদের নিয়ে সংসদে কথা বলতে হবে। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র না হলে গণতন্ত্র আশা করা যায় না। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে মানবাধিকার হুমকির মধ্যে থাকে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সুপারিশ দিয়েছি যে, কোন ব্যক্তিকে সাদা পোশাকে আটক করা যাবেন না। আটক করার সময় পরিচয়পত্র দেখাতে হবে এবং এলাকার দু’জন ব্যক্তির উপস্থিতিতে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এসব জানিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, আদিবাসী সংজ্ঞা ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লি¬ষ্ট থাকতে হয়। সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আদিবাসীরা সম্পূর্ণরূপে সংজ্ঞায়িত। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানেই তাদের অবহেলা করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে আদিবাসীদের সঙ্গে সরকার ধর্মীয় ও জাতিগত নিপীড়ন চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কাপেং ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার গত মেয়াদে কোনও পদক্ষেপই নেয়নি। বর্তমান মেয়াদেরও ছয় মাস চলে গেলেও এ বিষয়ে সরকারের কোনও ভাবনা-চিন্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না । জাতীয় আদিবাসী ফোরামের প্রেসিডেন্ট রবীন্দ্রনাথ সরেন আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে এসে তত্কালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার আদিবাসীদের ‘জাতিগত পরিচয়’ উল্লেখ না করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ইত্যাদি শব্দে অভিহিত করেছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং রাষ্ট্র আদিবাসীদের সঙ্গে ভুল ও অন্যায় আচরণ করছে উল্লেখ্য করে বলেন, কোন দেশই অস্বীকার করে না তাদের দেশে আদিবাসী নেই। অথচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। এ কথা বলে অদিবাসীদের কঠিন অবস্থায় ফেলে দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের এ মানসিকতা থেকে ফিরে আসা উচিত। বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য কাজী রোজী, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য হাফিজুর রহমান, আদিবাসী নেত্রী চঞ্চনা চাকমা প্রমুখ।