ভারতের মিডিয়া মেতেছে মোদীকে নিয়ে

কলকাতার নিউমার্কেটে কথা হয় বিজয় উপাধ্যায় নামে এক স্থানীয় তরুণের সঙ্গে। কলকাতা পৌরসভা ঘেঁষে এটিএম কাউন্টারের পাশে ইংরেজি-হিন্দি-বাংলা-উর্দু বিভিন্ন ভাষার পত্রিকা নিয়ে কয়েকজন হকার বসে আছেন। বিজয় সেখানে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকা দেখে একটি ইংরেজি এবং একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা কিনে নেন প্রায় দিন। কিন্তু গত শনিবার পত্রিকাগুলো দেখে কিনলেন না। হকার জিজ্ঞাসা করলেন পত্রিকা না নেওয়ার কারণ কি। বিজয় উপাধ্যায় একটু তেঁতেই উত্তর দিলেন, আজ মনে হচ্ছে মোদীকে নিয়ে বাড়াবাড়ি রকম খবর সাজানো পত্রিকায়। টাকা খরচ করে নেওয়া পত্রিকায় মোদীর প্রচার কেন শুনবো। পত্রিকাগুলো কি মোদীকে নিয়ে সত্যিই অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশ করছে -বাংলাদেশের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিজয় বললেন, মোদী মোদী রবটা আসলেই মিডিয়ার জন্যই উঠেছে। মোবাইল ফোনে কথা হচ্ছিল, কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক অমিত বসুর সঙ্গে। তিনি বললেন, মোদী এক অর্থে কাগুজে বাঘই। মমতার সুরে-সুর মিলিয়ে মোদীকে কাগুজে বাঘের সঙ্গে তুলনা করার প্রসঙ্গ তুললে বর্ষীয়ান ওই সাংবাদিক হেসে উত্তর দিলেন, মমতার সঙ্গে মোদীর নামের আদ্যাক্ষরের মিল থাকলেও দু’জনের কর্মে-রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের মিল নেই। কাগুজে বাঘের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিনই মোদীকে ঘিরে সংবাদ, বিশ্লেষণ, আলোচনা এবং ছবি দেখে মনে হবে সত্যিই কিছু কিছু কাগজের নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছেন মোদী নিজেই। অধিকাংশ পত্র-পত্রিকা তাকে নিয়ে মাতোয়ারা। কলকাতার একটি নাম করা বাংলা দৈনিকের নিউজ এডিটরের নাম উচ্চারণ না করে অমিত বসু বলেন, ওই নিউজ এডিটর তাকে এক সন্ধ্যায় ফোন করে বলছেন দেখ অমিত মোদী এখন রিডারদের ফেভারিট ’নিউজ ফিড’। তাই তার খবরটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রথম পাতায় আনা হচ্ছে। পাঠকের চাহিদা বুঝে চলা ওই পত্রিকার ধর্ম। ফলে পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রায় প্রতিদিনই বড় বড় শিরোনামে গুজরাট দাঙায় নাম জড়ানো ব্যক্তিটির খবর প্রকাশিত হচ্ছে। মিডিয়ার একটি বড় অংশ জুড়ে এখন মোদী বন্দনা চলছে বলে মনে করছেন স্থানীয় অনেক সচেতন মানুষ। কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা প্রচারের কাজে ব্যবহার করছেন মোদী। আনন্দবাজার, বর্তমান, প্রতিদিন, আজকাল থেকে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, টেলিগ্রাফ, এই সময় থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক পত্রিকা গুলোতেও বিজেপির ঢালাও বিজ্ঞাপন আসছে নিয়মিত। কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন। একই সঙ্গে বিজেপির খবর প্রচারের সাংবাদিকদের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য গাড়ি-থাকার জায়গা এবং নানা রকম-ইচ্ছার বিনোদনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে ভারতের অনেক সাংবাদিক বন্ধুই জানিয়েছেন। টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য বিজেপি আরো সু-ব্যবস্থা করেছে। যেমন নিউজ চ্যানেলের কোন ক্যামেরাতেই ভিডিও ধারণ করার প্রয়োজন হচ্ছে না। মোদীর সব ভিডিও ফুটেজ সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলের অফিসে পৌছে দেওয়া হচ্ছে প্রচারসভা শেষ হওয়া মাত্র। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাইভ-কানেক্টিভিটির ব্যবস্থা রেখেছে বিজেপি। এতে কোন চ্যানেল যদি লাইভ সমপ্রচার করতে চায়-তারা যেন সেখান থেকে ওই সংযোগ নিয়ে সরাসরি ওই খবর টেলিকাস্ট করে দিতে পারে। এই সব সুবিধা পেয়ে স্বভাবিকভাবে খুশি সাংবাদিকদের একটি বড় অংশই। অতীতে এমন সুযোগ-সুবিধা কংগ্রেস কিংবা বামফ্রন্টের তরফ থেকে দেওয়া হয়নি। বিজেপি এই সুবিধা নিশ্চিত করেছে। ভারতের ১৬ তম লোকসভা নির্বাচনের সবচেয়ে বেশি আলোচনার ঝড় ছিল মোদীর থ্রিডি প্রচারে। প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার পথ শোভা যাত্রা অতিক্রম করেছে এরই মধ্যে। অত্যাধুনিক এবং ব্যয়বহুল এই প্রচার চলবে ১০ মে পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশ জুড়ে যেভাবে মোদী হাওয়াকে কার্যত সুনামি হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছে এক শ্রেণীর স্থানীয় মিডিয়া, এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের চতুর্থ স্তম্ভটিই। ১৬ মে মোদির ভাগ্য পরীক্ষার সঙ্গে কিন্তু ভারতের এক শ্রেণীর মিডিয়ার ভাগ্য পরীক্ষা হয়ে যাবে। কেননা, সেদিনই জানা যাবে সত্যিই মোদী অমিত বসুর ভাষায় সেই ধরনের কাগুজে বাঘ হয়ে রইলেন নাকি ভারতবাসী তাকে সত্যিই ভোট দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসালেন। যদি বিজেপি হেরে যায়, তবে এক শ্রেণীর মিডিয়ার বিরুদ্ধে খবরে ’অতিরঞ্জন’ এই সাধারণ মানুষের অভিযোগটিই প্রমাণিত হবে। আর না হলে মিডিয়ার ওই অংশের খবরে সবাই ’সাধুবাদ’ জানাবে।