আব্বু রওনা হলেন দুধমুখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
প্রকাশ : ০৬ মে ২০১৪, ১৮:০৯
পড়ালেখাটাকে আমার একটা খেলা মনে হতে লাগল— স্টাডিগেম
আরিফ মঈনুদ্দীন,
কবি ও কথা-সাহিত্যিক
মস্তিষ্ক যখন স্মৃতি ধরে রাখার যোগ্যতা অর্জন করল তখন আমার বয়স ৫/৬-এর মতো হবে। এবার তো ছেলেটিকে স্কুলে দিতে হয়। ত্রস্ত ব্যস্ত হয়ে আব্বু জোগাড়যন্ত্রে লেগে গেলেন। পাঞ্জাবি-পায়জামা, স্যান্ডেল কেনা হলো। বইখাতা, শ্লেট-পেন্সিল, কলম কিছুই বাদ থাকল না। তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ— চন্ডিপুর মুন্সিবাড়ি থেকে আমাকে নিয়ে আব্বু রওনা হলেন দুধমুখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমার আনন্দ আর ধরে না। স্কুলে যাচ্ছি— এই ভাবনার ভেতর তখন কী কী পরিকল্পনা ছিল তা আজ আর মনে নেই। তবে স্কুলে গিয়ে নতুন এক পরিবেশে আমার যে বেশ লাগছিল তা মনে আছে। স্কুলের একজন শিক্ষক মরহুম আবুল খায়ের স্যার। এই স্যারের সাথে আব্বুর আগে থেকেই জানাশোনা। দুধমুখা বাজারে ১১৬০ বর্গফুটের একখানা ঘর আছে, যা ফেনী জেলা পরিষদ থেকে বন্দোবস্ত নেয়া। এই ঘরের ৫টি কামরার প্রথম কামরাটিতে আবুল খায়ের স্যারের মনোহরির দোকান ছিল। স্কুল টাইমের পরে স্যার এখানে বসতেন। আমাদের ভাড়াটিয়া হওয়ার সুবাদেই স্যারের সাথে আমাদের আলাদা ভাব ছিল। শ্রদ্ধেয় আবুল খায়ের স্যার আমার ভর্তির বিষয়ে যথেষ্ট মমতা দেখিয়েছেন। স্যারের এই আলাদা মমতা আমার স্কুলে ভর্তির শুভ সূচনাকে চমত্কার এক মাহাত্ম্য দান করেছে যা পরবর্তী জীবনে আমার জন্য বাতিঘরের মতো কাজে লেগেছে।
আমি দুধমুখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। সময়টা ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাস। শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখি এলাহী কাণ্ড। ৫০/৬০টির মতো ছেলেমেয়ে, বসার বেঞ্চ আছে মাত্র ৬/৭টি। যারা আগে এসেছে তারা বেঞ্চ দখল নিয়ে নিয়েছে। বেশিরভাগই পাকা মেঝেতে লুটোপুটি করছে। বিরামহীন কথাবার্তা আর চিত্কার-চেঁচামেঁচিতে একটা বাজার বাজার পরিবেশ। খায়ের স্যার ক্লাসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই একদম চুপ। আব্বুর সম্মানে স্যার আমাকে একটি বেঞ্চির শেষপ্রান্তে কোনোরকমে বসিয়ে দিলেন। যেই মাত্র স্যার ক্লাস থেকে বের হলেন অমনি আবার সেই বাজার বাজার পরিবেশ বড় কথা না, বড় কথা হলো আমি আর বেঞ্চিতে বসে থাকতে পারলাম না। আগে যারা বসেছে তারা সবাই মিলে ধাক্কা ধাক্কা খেলে আমাকে বেঞ্চি থেকে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু ব্যথা তেমন কিছু পাইনি। সতীর্থরা সবাই হো হো করে হাসছে এবং কী আশ্চর্য আমিও ওদের সাথে হাসিতে যোগ দিয়ে বেশ মজা পেলাম। ঐদিন আর বেঞ্চিতে বসার সুযোগ পেলাম না। আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই বসতে না পারার জন্য আমার কোনো বেদনাবোধ হলো না। মনে হচ্ছিল এটাই স্বাভাবিক।
স্কুলের পরের দিনগুলোতে আমার আর মেঝেতে বসতে হলো না। সবার আগে আগে চলে আসতাম। পড়া শিখে বাড়ির কাজ যথাযথভাবে করে নিয়ে আসতাম। শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণের এই বিষয়টা আমার গৃহশিক্ষক আবুল হাসেম স্যার আমাকে এবং আব্বু-আম্মুকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এতে আব্বু-আম্মুরও বেশ তাগাদা ছিল। আমার আগ্রহ বিবেচনায় নিয়ে শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মরহুম নাদেরুজ্জামান (নাদুমিঞা স্যার) ৩/৪ মাসের মাথায় আমাকে প্রথম শ্রেণিতে নিয়ে নিলেন। মেধাস্থান দখল করতে না পারলেও প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হলাম। লেখাপড়ার স্বাভাবিক গতি ধরে এগোলেও সারাক্ষণ পড়ালেখা করতে ভালো লাগে না। ইচ্ছেমতো চলার স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার একটি বিষয় কেন যেন মেনে নিতে পারছিলাম না। তারপরও গৃহশিক্ষক এবং আব্বু-আম্মুর যত্নে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলাম মেধাক্রম অনুসারে রোল নম্বর হলো ২৩। এই ক্লাসে ওঠার পর আমি নিজের ভেতর একটা পরিবর্তন টের পেলাম। ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং তার পরবর্তী ৪, ৫ রোল পর্যন্ত ছেলেদের দাপট দেখে আমি হিংসায় জ্বলে যাচ্ছিলাম। সব স্যার এদেরকেই খাতির-যত্ন করেন। ২৩ নম্বর রোলের ছাত্রের দিকে স্বাভাবিক নজর ছাড়া অন্য খাতিরের প্রশ্নই ওঠে না। বিষয়টা আমাকে খুব পীড়া দিল। শুরু হলো আমার অন্য জীবন— সবার আগে পড়ালেখা। স্কুলের পাঠ প্রস্তুতি থেকে শুরু করে রীতিমতো প্রত্যেক বিষয়ের বাড়ির কাজ ঠিকমতো করে আনা, ক্লাসে মনোযোগী হওয়া— সবই চলল সাধ্যমতো। অল্প ক’দিনেই সব স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেললাম। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ১, ২, ৩-এর ভেতর চলে এলাম। খায়ের স্যার আব্বুকে আমার অগ্রগতির খবর দিলে বাড়িতেও আমার কদর বেড়ে যায়। আমিও যথেষ্ট মজা পেলাম এবং শক্ত করে হাল ধরলাম। পড়ালেখাটাকে আমার একটা খেলা মনে হতে লাগল— স্টাডিগেম। সব সতীর্থকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাবার খেলা। এই চমত্কার খেলায় আমি ২২টি উইকেট ফেলে দিয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে গেলাম এবং অবাক হয়ে দেখলাম ক্লাস ফোরের ফার্স্ট বয় হবার যে গৌরব আমি অর্জন করলাম তা কীভাবে আমাকে সবার আদরের ছোট্টমনিতে পরিণত করল। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কেবলই সামনে এগিয়ে চলা। চলতে চলতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।