শত জনমের ববিতা...

তিনি ববিতা, একজনই ববিতা, শত জনমের ববিতা। ওপার বাংলার সত্যজিত্ রায় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের এমন কোনো মেধাবী পরিচালক নেই যার ছবিতে তাকে দেখা যায়নি। তবে এখন তিনি চলচ্চিত্রে কাজ করছেন না। ব্যক্তিজীবন নিয়েই এখন যেন তার ছুটে চলা। কী করছেন ববিতা, কেমন আছেন তিনি, আবার কবে দেখা যাবে তাকে নতুন ছবিতে—এ সবকিছুরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে আনন্দ বিনোদন-এর পক্ষ থেকে আজকের বিশেষ আলাপচারিতায়। লিখেছেন নূপুর বন্দোপাধ্যায় একজন নায়িকা হওয়ার সুবাদে জীবনের অনেককিছুরই প্রাপ্তি ঘটেছে। তবুও মাঝে মাঝে ববিতা যখন নীরবে একা ভাবেন তখন ডাক্তার না হতে পারার কষ্টটাও তাড়িয়ে বেড়ায়। কারণ ববিতার মা একজন ডাক্তার ছিলেন। দুরন্ত সেই শৈশব কিংবা চলচ্চিত্রের সোনালি সেই দিনগুলোতেই বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ববিতার। তিনি জানেন যে, এ জীবনে আর সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু তারপরও মানুষ সেই সময়টাতেই যেতে চায়, যে সময়টাতে ফিরে গেলে নিজেকে আবারও ফিরে পান, আত্মায় শান্তি পান। জীবনের এই সময়ে এসে যেন বারবার ববিতার সেই দিনগুলোতেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। বলা যায় প্রায় বছর খানেক হলো নতুন কোনো ছবিতে কাজ করছেন না দেশের কিংবদন্তি এই নায়িকা। কেন করছেন না? তার সহজ সরল জবাব, ‘বিষয়টি আমি স্পষ্ট করছি আমার ছবি না করার কারণ হিসেবে। কাউকে আঘাত দিতে নয়। আমরা যখন ছবিতে অভিনয় করেছি তখন অ্যাকশন বললে রিলের একটা সাউন্ড হতো। এটা অভিনয়ে একধরনের অনুপ্রেরণা দিত। ডিজিটাল সিনেমা আমার কাছে সবসময়ই নাটক নাটক মনে হয়। যে কারণে আমি কাজ করে আনন্দ পাই না। অন্যদিকে এখন তরুণরা কাজ করছেন। তারা কী সত্যিকার অর্থে একজন নায়করাজ রাজ্জাক, একজন ববিতাকে মন থেকে চিনেন-জানেন! যদি নাই বা জানেন তবে তারা তো তাদের ছবিতে আমাদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবেন না। এ কারণেই আমি ব্যথিত হই, কষ্ট পাই। যেন কষ্টের এই ধারাবাহিকতা না থাকে তাই ছবিতে অভিনয় থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি।’ ববিতা প্রায়ই শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে যান। ফিরে যান যশোরে ফেলে আসা শৈশবে কিংবা ঢাকার গেণ্ডারিয়ার স্কুল জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী রিটা’সহ আরও পাঁচ-ছয়জন বান্ধবীর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোতে। অনেকের সাথেই জীবনের এই সময়ে এসে যোগাযোগ না থাকলেও রিটার সঙ্গে ঠিকই যোগাযোগ আছে ববিতার। দু’দিন পরপর তার সাথে কথা হয় ববিতার। রিটা থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। ববিতা বলেন ,‘ক্যালিফোর্নিয়ায় রিটা অনেক সংগ্রাম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার কাছে যখন যাই, তখন সে আমাকে নিয়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, শুনি তার সংগ্রামী জীবনের গল্প। মুগ্ধ হই আমি।’ একজন নায়িকা হওয়ার সুবাদে জীবনের অনেককিছুরই প্রাপ্তি ঘটেছে। তবুও মাঝে মাঝে ববিতা যখন নীরবে একা ভাবেন তখন ডাক্তার না হতে পারার কষ্টটাও তাড়িয়ে বেড়ায়। কারণ ববিতার মা একজন ডাক্তার ছিলেন। তাই তারও ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি তার। তবুও তাতে আফসোস নেই। পপি থেকে ববিতা হয়ে মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছেন, মানুষ তাকে যে আসনে এনে দাঁড় করিয়েছেন তাই বা কম কিসের! এত প্রাপ্তি, এত অর্জন হতো কী অন্য কোনো জীবনে! ববিতা নীরবে ভাবেন আর এগিয়ে যান আগামীর পথে। তার এই পথ চলাতেই তিনি এখন ব্যস্ত তার গুলশানস্থ নিজের বাসা নিয়ে, যে বাসায় তার ‘নায়িকা’ জীবন কেটেছে। সেই বাসাটির আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রফিক আজম (যার প্রশংসা মুম্বাইয়ের শাবানা আজমী করেছিলেন)। বাসার কোথায় কী হবে না হবে, আলো-ছায়ার খেলা কেমন হবে—সবই তিনি শেয়ার করছেন রফিক আজমের সাথে। ববিতা ছবিতে অভিনয় করছেন না ঠিকই কিন্তু ব্যস্ততা থেকে ছুটি নেই এক বিন্দুও। অস্ট্রেলিয়ান লাভ বার্ডের ডাকে ভোরে ঘুম ভাঙে ববিতার। ফজরের নামাজ পড়েই চলে যান বাসার ছাদের উপর নিজের হাতে গড়ে তোলা বাগানের পরিচর্যা করতে। সেখানে এক্সারসাইজের কাজটিও সেরে নেন তখন। বাসায় ফিরে প্রিয় ‘ময়না’ পাখির সঙ্গে ববিতা তারই ছেলে অনিক প্রসঙ্গে কথা বলেন বেশ কিছুটা সময়। ময়না বলে, ‘পপি আপা অনিক কই, অনিক কই’। ময়না নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই আবার বলে, ‘অনিক না-ই, অনিক না-ই’। ববিতার ছেলে অনিক দেশের বাইরে কানাডায় পড়ছেন। তাই সকালে স্কাইপিতে একমাত্র ছেলের সাথে কথা বলে শুরু হয় তার সত্যিকারের দিন। এরপর দেশের বাইরে থাকা তার তিন ভাই চার্চিল, স্বপন লিটনের সঙ্গে কথা বলেন নানা বিষয় নিয়ে। তারপর বড় বোন সুচন্দার সন্তান নাতি-নাতনি, ছোট বোন চম্পা ও তার মেয়ে-মেয়ের জামাইয়ের খোঁজখবর নেন। এভাবেই ব্যস্ততার মধ্যদিয়ে কেটে যায় ববিতার এই সময়। ববিতা ও তার অন্য দুই বোন সুচন্দা, চম্পা স্বপ্ন দেখেছিলেন সাতক্ষীরায় লোহাগড়ায় মায়ের বাড়িতে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন। ডিসিআই’তে সে অনুযায়ী প্রপোজালও দেওয়া হয়েছিল। ডিসিআই থেকে সে অনুযায়ী খোঁজখবরও নেওয়া হয়েছে। ববিতা বলেন, ‘সত্যি বলতে কী যে অঞ্চলে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত করার কথা সেখানে নাগরিক সুবিধা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করেই আপাতত হাসপাতাল নির্মাণের কাজ হচ্ছে না। তবে ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিত্সা সেবা প্রদান করার বিষয়টি চালু থাকবে। ভবিষ্যতে যদি বড় কোনো সহযোগিতা আসে তবে আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণে অব্যশই এগিয়ে আসব। এজন্য সবার দোয়াও চাই।’ এদেশে ববিতা একজনই, বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক ভক্ত জনম জনম ধরে তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে, বুকে লালন করবে। এমন একজন কিংবদন্তি নায়িকা সিনেমাতে অভিনয় করছেন না (কারণ দেখিয়েছেন তিনি), তাকে ফেরানোর মতো একজন পরিচালকও কী নেই আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে!