নতুন জীবনের পথে

গানের মাঝেই স্বপ্ন আঁকেন হূদয়ের ভালোবাসা দিয়ে। নিজের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে গানের ভুবনে সফলতার পেয়েছেন। তিনি হলেন সংগীতজগতের সবারপ্রিয় গীতিকার দেলোয়ার আরজুদা শরফ। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৬ বছরে গান লিখেছেন চার হাজারেরও বেশি। দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, সৈয়দ আব্দুল হাদী, বেবী নাজনীন থেকে শুরু করে ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুসহ এই সময়ের ব্যস্ততম শিল্পীরা তার লেখা গান কণ্ঠে ধারণ করেছেন। সম্প্রতি হাতিরঝিলে রাতের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে এই গুণী মানুষটির সাথে কথা হলো তার গানের নানা গল্প ও আগামীর ভাবনা নিয়ে। সেই আলাপচারিতার উল্লে¬খযোগ্য অংশ নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন আশীষ সেনগুপ্ত অনেক স্বপ্ন নিয়ে সবাই কাজ করেন নিজের পছন্দের কোনো প্ল্যাটফর্মে। কখনও নাটক, কখনও গান লিখে বা গেয়ে বনে যান তারকা। কেউ কেউ নিজেদের খ্যাতি ধরে রাখতে পারেন, আবার কেউ হয়তো নিজের অর্জিত জায়গা থেকে ছিটকে পড়েন। গানের ভুবনে কাজ করে সফল হয়েছেন গীতিকার দেলোয়ার আরজুদা শরফ। শুরুতে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল একটি গান সৃষ্টির পর অনুভূতি কেমন? জবাবে তিনি বললেন, ‘প্রতিটি সৃষ্টির মাঝে এক ধরনের আনন্দ থাকে। তাই গানের লেখার পর নিজের ভেতরে ভালোলাগার একটি অনুভূতি ছুঁয়ে যায়।’ গীতিকার হয়ে ওঠার গল্প জানতে চাইলে দেলোয়ার মৃদু হাসলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হারিয়ে গেলেন নিজের সোনালি অতীতে। এরপর গল্পের ঝাঁপি খুলে বলা শুরু করলেন, ‘শুরুটা স্কুলজীবন থেকে। ওই সময় প্রচুর গান শুনতাম। মান্না দে, হেমন্ত দা, আশা জি, লতা জি, কিশোর কুমারের গান শুনতাম বেশি। একসময় আমাদের ভরসা ছিল কলকাতার গান। পড়াশোনার পাশাপাশি গান শুনতে শুনতে সংগীতের ভেতর মনটা ডুবে যেতে থাকলাম। তখন ভাবতে শুরু করলাম গান কীভাবে লেখা যায়? এপর গান লেখা শুরু করলেও তখন সেগুলো আসলে গান হচ্ছিল না। তাই গান লেখার নিয়মটা জানতে চেষ্টা করলাম। পরে গান লেখার প্র্যাকটিসও করলাম। এভাবেই স্কুল পেরিয়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করলাম। পরবর্তীতে গানের জগতে প্রবেশ করলাম। শুরুতে গান লেখা ছিল আমার শখ। সেটা একসময় পেশায় পরিণত হলো। ১৯৯৮ সালে আমার লেখা প্রথম গান রেকর্ডিং হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত গান লিখে যাচ্ছি। দীর্ঘ ১৬ বছরের সংগীতজীবনে আমার লেখা গানের সংখ্যা ৪ হাজারের উপরে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনপ্রিয় শিল্পী আমার লেখা গান কণ্ঠে ধারণ করেছেন। এরমধ্যে অনেক গান জনপ্রিয়ও হয়েছে। জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—বেবী নাজনীনের ‘দু’চোখে ঘুম আসে না’, এন্ড্রু কিশোরের ‘বিন্দিয়ারে বিন্দিয়া’, বারী সিদ্দিকীর ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’, বজলুর রহমান বাবুর ‘ইন্দুবালা গো’, এস আই টুটুলের ও ন্যান্সির ‘দ্বৈত জীবনের সবটুকু সুখ’, নাসিরের ‘নদী’, ইভা রহমানের ‘টিপ টিপ বৃষ্টি’, মমতাজের ‘সংসার আমার ভালো লাগে না’, আইয়ুব বাচ্চুর ‘আজ মন ভালো নেই আমার’, বোম্বের উদিত নারায়ণ ও আঁখি আলমগীরের দ্বৈত ‘যদি তুমি বলো’ ও ‘ছুঁয়ে দেখ জোছনা’, কলকাতার মিতালী মুখার্জি ও এন্ড্রু কিশোরের দ্বৈত ‘প্রতিদিন ভোর হয় সূর্য ওঠে’, বেবী নাজনীন ও এন্ড্রু কিশোরের দ্বৈত ‘শুধু ভালোবাসা’, ন্যান্সির ‘ভালোবাসার অধরা’ ও ‘জীবনের সবটুকু সুখ দেবো আমি তোমায়’ ইত্যাদি।’ এখন আপনার ভাবনার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সে সম্পর্কে কিছু বলুন। জবাবে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘মানুষ বিভিন্নভাবে জীবনকে অতিবাহিত করে। আমি জীবন শুরু করেছিলাম পড়াশোনার মধ্য দিয়ে। এরপর সংগীত ক্যারিয়ার। দীর্ঘদিন কাজ করার সময় একটা ভিন্ন জীবনের মধ্যে ছিলাম। এখন আমি নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছি। অর্থাত্ আমার ভাবনাটার বদল হয়েছে। বলা যায় নতুন একটা দর্শনের দেখা পেয়েছি। নতুন এই জীবনটাকে খুব ফিল করছি। প্রচণ্ড একটা চেতনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছি সামনের দিকে। এই চেতনাটা যেখান থেকে এসেছে, আমি তার কাছে চির কৃতজ্ঞ। তিনি হচ্ছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় গুরুজী শহীদ আল বোখারী মহাজাতক। তিনি নতুন জীবনের পথের সন্ধানটা দিয়েছেন। এজন্য আমি মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কৃতজ্ঞ। তাঁর কাছে দয়া চাই ও রহমত কামনা করি—যেন নতুন এই পথে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতে পারি। এই পথটা সত্য ও সুন্দরের পথ। আলোময় এই পথটা প্রতিটি মানুষের জন্যই দরকার বলে আমি মনে করি। এই পথ ছাড়া জীবনকে পরিপূর্ণভাবে বোঝা যায় না। জীবনকে বুঝতে হলে আত্মনিমগ্নতার প্রয়োজন। এটা আসে গভীর ধ্যানের মাধ্যমে।’ বর্তমানের কাজ সম্পর্কে গীতিকার দেলোয়ার বলেন, ‘বর্তমান ব্যস্ততা চলচ্চিত্রের গান নিয়ে। সম্প্রতি আসিফ আকবর ও কনাকে দিয়ে গান করলাম। ‘অনেক সাধনার পরে’ শিরোনামের চলচ্চিত্রটির চিত্রপরিচালক আবুল কালাম আজাদ। একই পরিচালকের ‘হূদয় দোলানো প্রেম’ ছবির জন্য গান করালাম এসআই টুটুল ও কনাকে দিয়ে। এ ছাড়া অন্যান্য পরিচালকরাও তাদের ছবিতে গান দেওয়ার জন্য বলছে। আমার লেখা চলচ্চিত্রের প্রথম গান ছিল ‘হূদয়ের বাঁশি’ ছবিতে। তার পরিচালক ছিল রেজা হাসমত। এরপর হাসিবুল ইসলাম মিজানের ‘কপাল’ ছবির টাইটেল সঙ ‘কপাল’ গানটি আমার লেখা ছিল। পরে ‘টিপটিপ বৃষ্টি’ চলচ্চিত্রের গান লিখেছি। ওই ছবির পরিচালক ছিল প্রয়াত মোহাম্মদ হান্নান। আমি চাই চলচ্চিত্রের জন্য নিয়মিত গান লিখতে এবং সেটা করেও যাচ্ছি।’ আপনি রোমান্টিক গানের পাশাপাশি সুফি গানও লিখছেন। হঠাত্ করে সুফি গানের প্রতি আপনার অনুরাগের কথা জানতে চাই। তার সাবলীল উত্তর, ‘সুফি দর্শনের প্রতি আমার ছোটবেলা থেকে একটা আকর্ষণ কাজ করেছে। সুফি পরিবেশের ভেতর আমার বেড়ে ওঠা। আধ্যাত্মিক বিষয়টা আমাকে খুব টানে। ওই দর্শন থেকে আমি চেষ্টা করেছি—আমি পৃথিবীতে এসেছি আবার কেন চলে যাব অথবা একটা অন্ধকারে ছিলাম, সেখান থেকে আলোতে এলাম আবার অন্ধকারে চলে যাব। তাই আমার কাছে জীবন মানে হলো—গভীর অন্ধকারের মাঝে ছোট্ট একটু আলোর ঝলক। এই চিন্তাগুলো আমাকে আলোড়িত করে। সেখান থেকে সুফি গান লেখা শুরু। যেমন—আমার লেখা কয়েকটা গান আছে—‘কলাপাতার বাঁশি বাজে, ‘অচীন হাওয়ার জোরে’, ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’। সুফি গান নিয়ে আমার বেশকিছু পরিকল্পনা আছে। বেশকিছু সুফি গান রেডি করেছি। এই গানগুলো পর্যায়ক্রমে আমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘রিঙ্গার’-এর ব্যানারে অ্যালবাম আকারে বের করব। আসলে আমাদের দেশে সুফি গান গাওয়ার মতো শিল্পী অনেক কম। কেননা সুফি গানের জন্য শিল্পীদের সেভাবেই তৈরি হতে হয়। আমি চেষ্টা করেছি যারা সুফি গান করেন তাদের দিয়ে গাওয়াতে। আমার ইচ্ছা আছে সুফি গান নিয়ে বড় কিছু করার। প্রয়োজনে দেশের বাইরের স্বনামধন্য শিল্পীদের দিয়ে সুফি গান করানোর।’ গান নিয়ে আপনার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার কথা জানতে চাই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে কি, সংগীত নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। বিশুদ্ধ কিছু গান দেশের শ্রোতাদের উপহার দিতে চাই। আমার লেখা গান দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন বাজে—এটা আমার ভালো লাগে। এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এই প্রাপ্তি থেকে আরও সুন্দর কিছু গান লিখতে চাই—যা শ্রোতাদের হূদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আর আমার একটা স্বপ্ন হলো—আমাদের বাংলা গানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে চাই। এজন্য আমি সবার দোয়া কামনা করছি।’