যে কোনো দেশে এবং বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সমুদ্র বন্দরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মোংলা বন্দরটি বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। এ বন্দরের ব্যাপারেও বিষয়টি সত্য। তবে পশুর নদীর সঙ্গমস্থান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত ‘আউটার বার’সহ পশুর নদীর বিভিন্নস্থানে নাব্য সংকটের কারণে এ বন্দরটিকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বন্দরের স্থায়ী জেটির কাছেও পানির গভীরতা কমে গেছে। আশপাশ এলাকাসহ জেটি সন্নিকটে ১৯৯৮ সালে একবার এবং ২০০৯ সালে আর একবার ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ করা হয়েছিল; কিন্তু তারপরও ‘পলি জমাজনিত’ কারণে খননকৃত স্থানের নাব্য ধরে রাখা যায়নি। এ জেটিতে বর্তমানে কম ‘ড্রাফটের’ (জাহাজের তলদেশ থেকে পানির উপরের অংশ) দুই-একটি কার কেরিয়ার, কন্টেইনার জাহাজ এবং প্রোজেক্ট কার্গো জাহাজ ভিড়ানো ব্যতীত অন্য কোনো বড় আকারের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব নয়। এছাড়া বন্দর জেটির উত্তর দিকে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কারখানার নিজস্ব জেটিগুলোতে ৩-৪ হাজার টনের ছোট আকারের কিছু এলপিজি জাহাজ, এডিবল অয়েল ট্যাংকার এসে ভিড়তে পারে।
এখানে উল্লেখ্য, পশুর নদীর সামগ্রিক গভীরতা কম, এমনটি কিন্তু নয়। এ নদীর কোনো কোনো স্থানে ২০০-২২৫ মিটার লম্বা, ৫০-৭০ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজ নোঙর করানোর মতো পানি আগেও ছিল এবং এখনো আছে। যেমন শিবসা এবং পশুর নদীর সংযোগস্থান আকরাম পয়েন্টের কাছে ১৩-১৬ মিটার বা তারও বেশি পানি আছে; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- মোংলা ‘ফেয়ার ওয়ে বয়’ থেকে বন্দর চ্যানেলের উত্তর দিকে পানির গভীরতা কম থাকা। এস্থানে কমবেশি ১০-১১ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে পানির গভীরতা ৬.১ মিটার পর্যন্ত নেমে এসেছে। সমুদ্রবক্ষে অবস্থিত এ স্থানটি ‘আউটার বার’ নামে পরিচিত।
আমার জানামতে, বর্তমান সরকার মোংলা বন্দরকে একটি ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসাবে ঘোষণা করার পর, এবছর থেকে আউটার বারের খনন কাজটি হাতে নেওয়া হয়েছে। দুই-এক বছরের মধ্যে এ ‘বটল নেকটি’ অপসারিত হলে, ভরা জোয়ারের সময় বহু সংখ্যক ৫০-৭০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজ নদীতে ঢুকে বর্তমান নোঙর স্থান- ‘বেজ ক্রিক বা হারবারিয়া’ (গভীরতা কমবেশি ৭.৫ মি.) থেকে আরো দক্ষিণে ‘আকরাম পয়েন্টের’ কাছাকাছি নোঙর করে মালামাল ওঠানামার কাজ করতে পারবে।
আউটার বারটি খননের পাশাপাশি মোংলা বন্দরের স্থায়ী জেটির ব্যাপারেও বিকল্প একটি চিন্তার সময় এসেছে। মোংলা ফেয়ারওয়ে বয় থেকে কমবেশি ১২০ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত মোংলা বন্দরের স্থায়ী জেটির দীর্ঘ পথটি প্রয়োজনমতো ড্রেজিং করে রাখা একটি দুরূহ এবং ব্যয় সাপেক্ষ কাজ।
উল্লেখিত স্থান থেকে পশুর নদীর পশ্চিম কিনার ঘেঁষে ভবিষ্যতে খুলনা পর্যন্ত একটি পাকা রাস্তা তৈরি করে দিলে পণ্যবাহী ট্রাক-লরি এখানে আসা-যাওয়া করতে পারবে। প্রয়োজনে এপথে একটি রেল লাইন সংযোজন করার কথাও ভাবা যেতে পারে। রাস্তাটি সুন্দরবনের উত্তর সীমানায় অবস্থিত ‘ঢ্যাংমারি’ নামক স্থান থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত কমবেশি ৭০ কি.মি. অংশ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাবে। এ ব্যাপারে পরিবেশবিদ এবং ইউনেস্কো আপত্তি তুলতে পারেন। তবে আকরাম পয়েন্টে সম্ভাব্য এ স্থায়ী জেটিটির তিন পাশ এবং রাস্তাটির দু’পাশে ‘শব্দ নিরোধক উঁচু বেড়া’ (Fence) তুলে দিলে সুন্দরবনের পরিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হবার কারণ থাকবে বলে আমার মনে হয় না। পৃথিবীর বহু দেশে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসস্থান এবং সংরক্ষিত এলাকার কাছ দিয়ে চলমান রাস্তাগুলোর পাশে এ ধরনের শব্দ নিরোধক বেড়ার ব্যবস্থা আছে।
পরিশেষে, আশা করা যায় ‘আউটার বারের’ খনন কাজ শেষ হবার পর মোংলা বন্দরে আগত জাহাজের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে, এ বন্দরটিকে একটি কার্যক্ষম এবং ‘ব্যবহারকারী বান্ধব’ বন্দর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য নিচে উল্লেখিত কাজগুলোর দিকেও কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন।
১) একটি এ্যাংকরেজ পোর্টের কাজে অভ্যন্তরীণ জাহাজের ব্যবহার অনস্বীকার্য। বর্তমানে এসব জাহাজ নদীতে যত্রতত্র নোঙ্গর করে থাকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নদীর কিছু কিছু জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে এসব লাইটার জাহাজের জন্য ‘মুরিং বয়’ স্থাপন করে দেয়া উচিত। ২। একটি জাহাজ বন্দরে আগমনের পর বহির্গমন পর্যন্ত পোর্টহেলথ, কাস্টমস, সার্ভেয়ার, শিপিং এজেন্ট, স্টিভেডর, শিপ চালডনারের মতো অনেক সংস্থার লোকজন জাহাজে আসাযাওয়া করে। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জাহাজে যাতায়াতের সুবিধার্থে মোংলা নালার ওপর একটি ব্রীজ এবং পশুর নদীর পূর্ব কিনার ঘেঁষে দক্ষিণ দিকে ‘জয়মনিগোল’ পর্যন্ত (কমবেশি ২০ কি.মি. পথ) গাড়ি চলার উপযোগী একটি পাকা রাস্তা নির্মাণ করার কথা বেশ কিছু বছর ধরে শুনে আসছি। এ উদ্যোগটির সফল বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন। এছাড়াও জয়মনিগোলে ছোট ছোট নৌযানের থাকার জন্য একটি ‘পোতাশ্রয়’ নির্মাণ করে দিলে এসব নৌযান, মোংলা নালার পরিবর্তে জয়মনিগোলের এ পোতাশ্রয় থেকে সহজেই জাহাজে যাওয়া-আসা করতে পারবে।
জয়মনিগোল পর্যন্ত রাস্তাটি হবার আগে মোংলা বন্দরের পানির ঘাট সংলগ্ন স্থানে একটি পন্টুন অথবা মেরিন একাডেমির পতেঙ্গা জেটির আদলে একটি কংক্রিট জেটি তৈরি করে দেয়াও প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম এবং ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ব্যবহারের জন্য মোংলা নালার উত্তর কিনারে সংরক্ষিত ঘাটের ব্যবস্থা থাকলেও, বন্দর ব্যবহারকারী বা সুন্দরবনে ভ্রমণপিপাসু লোকজনের জন্য এখানে কোনো কার্যকর ঘাটের ব্যবস্থা নাই। ৩) উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো ছাড়াও- ক) ঘসিয়াখালি খালের নাব্য বজায় রাখা খ) মোংলা থেকে ফেয়ার ওয়ে বয় পর্যন্ত সার্বক্ষণিক মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করার ব্যবস্থা করা গ) আকরাম পয়েন্টে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য একটি স্থাপনা তৈরি করে দেয়া ঘ) মোংলা বন্দরের নির্দিষ্ট একটি স্থানে জাহাজের ক্রু-অফিসারদের (সী-ফেয়ারার) জন্য বাজারঘাট করাসহ বিনোদনের ব্যবস্থা করা ঙ) নৌ-পুলিশসহ হেলিকপ্টারসমৃদ্ধ কার্যকর একটি SAR (সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ) পার্টি গড়ে তোলা ছ) পশুর চ্যানেলের যেখানে, যখন এবং যতটা প্রয়োজন খনন কাজ করার জন্য সাংবাত্সরিক একটি ড্রেজার নিযুক্ত রাখা জ) বন্দর জেটি এবং তার উত্তরদিকে অবস্থিত কল-কারখানা জেটিগুলোর দিকে খেয়াল রাখা যাতে এসব জায়গায়ও নদীর নাব্যতা প্রয়োজন মতো বাড়িয়ে ছোট আকারের জাহাজ আনা-নেওয়া করা যায়। ঝ) বলতে দ্বিধা নাই, একটি বন্দর সঠিকভাবে চালানোর জন্য, বন্দর ভবনের সুরম্য দালান-কোঠা, দামি গাড়িঘোড়া ইত্যাদির চেয়ে, বন্দরটিতে একটি দক্ষ পাইলটেজ ব্যবস্থা, পাইলট বোট, টাগ বোট, আগুন নেভানোর জলযান ইত্যাদি থাকা বেশি জরুরি। বন্দর কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়গুলোর দিকেও আশু নজর দিয়ে এ বিষয়ে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাবেন এমনটাই আশা করতে পারি।
n লেখক :মেরিন ক্যাপ্টেন,
শীপ সার্ভেয়ার এবং কনসালটেন্ট