কক্সবাজারে ভূ-গর্ভে পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে
আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ মে ২০১৪, ২২:৫৫
কক্সবাজার শহরসহ জেলার অধিকাংশ স্থানে ভূ-গর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। গত ৩ বছরে শহরে প্রায় ৩৫ ফুট নিচে নেমে গেছে পানির স্তর। এতে শহরের একাংশে পানীয় জলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। নলকূপে সুপেয় মিঠাপানির পরিবর্তে উঠে আসছে লবণাক্ত জল। এভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশংকাজনক হারে নেমে যাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিধসের পাশাপাশি পানীয়জলের সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করার আশংকা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার শহরে গভীর ও অগভীর নলকূপ বসিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে গৃহস্থালী ও পানীয়জলের চাহিদা পূরণ করা হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত নগরায়নের সাথে পাল্লা দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার পাম্প স্থাপনের কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। কক্সবাজার পৌরসভার প্রকৌশলী রণজিত্ জানান, শহরে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ১০ ফুটের বেশি হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। গত ৩ বছরে ৩০ থেকে ৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে।
মাত্র ১০ বছর আগেও শহরের টেকপাড়া এলাকায় ১৮০ ফুট গভীরে নলকূপ বসিয়ে সুপেয় পানির স্তর পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ২৮০ থেকে ৩০০ ফুট গভীরে যেতে হয়।
মিঠাপানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে বাঁকখালী তীরবর্তী শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানীয়জলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকায় স্থাপিত হাজার হাজার নলকূপ প্রতি বছর অকেজো হয়ে পড়ছে। পানীয়জলের সবচেয়ে তীব্র সংকট রয়েছে শহরের উত্তর নূনিয়াচড়া, কস্তুরাঘাট, এন্ডারসন রোড, পেশকারপাড়া, টেকপাড়া, মাঝিরঘাট ও উত্তর রুমালিয়ারছড়া এলাকায়।
কক্সবাজার শহর ছাড়াও জেলার অধিকাংশ স্থানে ভূ-গর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঈদগাঁও অঞ্চলে মাত্র এক দশক আগেও ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীরে টিউবওয়েল বসিয়ে পানীয়জল পাওয়া যেত। এখন সেখানে প্রায় ২শ’ ফুট গভীরে যেতে হয়। পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জেলার সমুদ্র উপকূলীয় নিম্নভূমিসহ টেকনাফের অধিকাংশ এলাকায় পানীয়জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার জেলায় কৃষি, গৃহস্থালী, পানীয়জলসহ নানা প্রয়োজনে প্রায় ৮০ শতাংশ জল ভূ-গর্ভস্থ উত্স থেকে এবং বাকি ২০ শতাংশ মাটির উপর থেকে সংগ্রহ করা হয়। কক্সবাজার শহরে প্রায় শতভাগ জল আসে ভূ-গর্ভস্থ উত্স থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন ভূ-গর্ভস্থ পানিতে টান পড়ে, তখন নিকটবর্তী নদ-নদীর পানিই নানা প্রাকৃতিক সংযোগ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ মজুদ এলাকায় প্রবাহিত হয়ে ঘাটতি পোষানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কক্সবাজার জনপদ সংলগ্ন লবণাক্ত জলের সমুদ্র থেকে সেই ঘাটতি পূরণের কারণে ভূ-গর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর দিন দিন লবণাক্ত জলের গ্রাসে চলে যাচ্ছে। সেচ অবকাঠামোর কারণেও ভূ-গর্ভস্থ পানির অপচয় ঘটছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, সেচ কাজে যতটুকু পানি ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়, তখন তার বেশিরভাগই যথাযথ সেচ অবকাঠামোর অভাবে বাষ্পীভূত হয়। তাই এ বিষয়ে উন্নত কলাকৌশল রপ্ত করা দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিককালে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় বিপদ আসন্ন। অতিরিক্ত হারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে কক্সবাজারের তলদেশ সম্পূর্ণভাবে লবণাক্ত পানিতে সয়লাব হয়ে যাবে।
লবণাক্ত জলের পাশাপাশি ভূ-গর্ভস্থ পানির আধারে শূন্যতা সৃষ্টি হলে ভূ-গর্ভে ফাটল সৃষ্টির মাধ্যমে ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে। এতে পর্যটন শহরে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের। এই সংকট নিরসনে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন কক্সবাজারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিরাপদ ক্ষমতার ভিতরে রাখতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হবে। সেচ দক্ষতা ও পানির উত্পাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। চাষাবাদে ডিপ টিউবওয়েলের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজার মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশংকা করেন তিনি।
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র সরওয়ার কামাল শহরে ভূ-গর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া এবং শহরের অধিকাংশ স্থানে পানীয়জলের সংকট দেখা দেয়ার ঘটনা স্বীকার করে বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কক্সবাজার পৌরসভা ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নদ-নদীর পানি ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে। এজন্য শহরতলীর রাবার ড্যাম এলাকায় পানি শোধনাগার স্থাপন করার জন্য ৫০ শতক জমি খোঁজা হচ্ছে।