স্মৃতিতে অম্লান শাহজাদা ফৌজুল আলী খাঁন (রহ.)
প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৪, ১৮:২৯
কুল্লু
নাফসিন জা-ইকাতুল মাউত, অর্থাত্ জন্মিলে মরতে হবে, এটা চিরন্তন সত্য কথা। মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। আল্লাহ পাকের বিধান অনুযায়ী এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে একদিন না একদিন সবাইকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হয়। কিন্তু পৃথিবী থেকে মানুষ বিদায় নিয়ে চলে গেলেও রেখে যায় তাঁর অজস্র স্মৃতি, মহত্ কর্মকাণ্ড। তাঁর মহত্ কর্মকাণ্ডই সমাজের সকলের কাছে চিরস্মরণীয় ও অমর স্মৃতিতে অম্লান করে রাখে।
দীর্ঘ ৪ বত্সর আগে এমনি এক মহান সাধক আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন স্রস্টার সান্নিধ্যে। যাঁকে এখনো ভক্তবৃন্দ আশেকানরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তিনি হচ্ছেন শহর কুতুব, মাহাবুবে রব্বানী, গাউছে ছমাদানী, হযরত শাহ ছুফী আমানত খাঁন (রহ.) এর পবিত্র বংশধর হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন (রহ.)। যাঁর স্মৃতি, মহত্ কর্মকাণ্ডগুলো হূদয়ের মণিকোঠায় রয়ে গেছে। এই মহত্ প্রাণ পুরুষ ১৩৫৬ হিজরী, ১৯৩৫ ইংরেজি ১ জানুয়ারি রোজ শুক্রবার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আলহাজ্ব শাহজাদা মৌলভী শের আলী খাঁন (রহ.), মাতা ফিরোজা খানম। আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা, এই মহান আধ্যাত্মিক সাধক নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে। তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ, সম্মানের প্রতি সর্বদা যত্নবান থাকতেন এবং শরীয়তের হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। তিনি আধ্যাত্মিক জগতে বিরাজ করে মানুষকে আল্লাহ ও রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক চলার জন্য আহবান করতেন। তিনি চট্টগ্রামের প্রখ্যাত দারুল উলুম মাদ্রাসায় শিক্ষা অর্জন করেন এবং অতি অল্প বয়সে প্রখ্যাত ছুফী হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ ছিরিকোটি (রহ.) এর হাতে বায়েত গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সদা হাস্য উজ্জ্বল ও মিষ্টিভাষী এবং সকলের কাছে তিনি ছোট মিয়া হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উনার দ্বীপ্তিময় নূরানী চেহারা মুবারক দেখলে যে কেউ বিমোহিত হয়ে যেত এবং উনাকে সম্মান জানাতো। হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন (রহ.) ১৯৬৪ সাল হতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাবাজান কেবলা হযরত শাহ্ ছুফী আমানত খাঁন (রহ.) ওয়াকফনামা মোতাবেক সুদীর্ঘ ৪৫ বত্সর দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন মোতওয়াল্লী হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দরবার শরীফের সকল কর্মকাণ্ড সুন্দর, সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতেন এবং দরবার শরীফের পক্ষ থেকে তিনি দুস্থদের মাঝে প্রতিদিন দুবেলা আহার লঙ্গরের ব্যবস্থা করেন তা আজো বিদ্যমান রয়েছে। জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে ভক্তগণের হূদয়ে নিংড়ানো ভালোবাসা অর্জন করে দরবার শরীফে বাবাজানের খেদমতে নিজেকে নিবেদন করে ছিলেন পরম ভক্তি শ্রদ্ধায়। তাঁর নির্দেশিত পরামর্শ অনুযায়ী হযরত শাহ্ আমানত (রহ.) পবিত্র মাজার শরীফের সমস্ত কর্মকাণ্ড এখনো পরিচালিত হচ্ছে। মানব কল্যাণই ছিলো তাঁর মহান ব্রত, তিনি আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের পাশাপাশি নিজেকে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও জনহিতকর কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন দীর্ঘদিন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আনজুমানে খাদেমুল হজ্ব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আনজুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া আলীয়া ট্রাস্টের সম্মানিত সদস্য, আঞ্জুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মহিলা মাদ্রাসার সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। তাছাড়া চট্টগ্রাম জমিয়াতুল ফালাহ্ মসজিদের বোর্ড অব গভর্নর নির্বাচিত হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম ঈদ-জামাত কমিটির সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের সহ সভাপতি, জাতীয় যক্ষ্মা সমিতির সহ-সভাপতি, জাতীয় ওয়াক্ফ কমিটির সম্মানিত সদস্য ছিলেন। চট্টগ্রাম চাঁদ দেখা কমিটি, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ রোগী কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম রেডক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতাল ও কদম মোবারক এতিমখানার সম্মানিত সদস্য ছিলেন। এই মহান সাধক আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর মহত্ কর্মগুলো। যা আজো স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। ভক্ত আশেকানরা আজো তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। এই মহান পুরুষ ১৪৩০ হিজরীর ২৫ জমাদিউস সানি ২০০৯ সালের ২০ জুন তারিখে দরবার শরীফের সামনে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়রত অবস্থায় ফজরের আযানের কিছু পূর্বে সময়ে বাবাজান কেবলার দরবার শরীফের সামনে প্রতিদিনকার মত তাহাজ্জুদ নামায শেষে তসবীহ্, তাহালীন আল্লাহর জিকির আজগার করা অবস্থায় ইহ জগতের মায়া কাটিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে সাক্ষাত্ লাভার্থে বেসালে হাকিকী লাভ করেন। উনাকে হযরত শাহ আমানত (রহ.) এর পবিত্র রওজা শরীফের পশ্চিম পার্শ্বে সমাহিত করা হয়। প্রতি বছর ২৫ জমাদিউস সানি তার ফাতেহা শরীফ যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদার সাথে পালন করা হয়। হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন ছাহেবের নামে কোন রাস্তা বা চত্বর নামকরণ করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ রইল।
লেখক :সাংবাদিক