রবীন্দ্রনাথের গানে বৈশাখ

রবীন্দ্রনাথ মন বুঝতেন। মনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতিকে বুঝতেন। স্বভাবতই তিনি বুঝতেন মানুষকে। সময়কে। প্রকৃতিকে তো অবশ্যই। কী এক অফুরন্ত বিশ্বাস আর শিকড়ের শক্তি তুলে একেবারে বাঙালি হূদয়ের আসল কথাকে চমত্কারভাবে বলেছেন। আমাদের একান্ত উত্সব পয়লা বৈশাখকে তিনি হূদয় থেকে ধারণ করেছেন? বৈশাখী বিলাস বলি আর সপন্দন বলি, দুই দিক থেকে সংগীতের মধ্যে এমন একটি আবহ যাকে বিনম্রভাবে শ্রদ্ধা করি। রবীন্দ্রনাথের বৈশাখী গান ‘এসো হে বৈশাখ’ আমাদের প্রচণ্ডভাবে টানে। হূদয়কে বলে বোঝাতে পারি না যে মানুষ প্রাকৃতিক সময়কে হূদয়ে ধারণ করে এমন অসাধারণ গান লিখতে পারেন কীভাবে? এ গান আমাদের প্রশমিত করে। উত্সবকে হূদয়ের সাথে সমার্থক করে তোলে। দুই. বড় ভাববার অবকাশ করে দেয়। প্রথম লাইনটিতে কেমন অসাধারণত্ব! একটি সময়কে কত আপন করে আহ্বান করছেন। বলছেন (‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। তিনবার এসো শব্দটি ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ মাসের সাথে ও উত্সবের সাথে আমাদের অতিথিপরায়ণ মনের সত্য আবিষ্কার করেছেন বৈশাখকে ‘হে’ সম্বোধন করেছেন। যার ভেতর দিয়ে কালগত শ্রদ্ধাবোধ এক হয়েছে। বাঙালি যে খালি সংস্কৃতির জন্য অন্তঃপ্রাণ তা নয়। এখানে কিছু অসঙ্গতি আছে। লোকের মধ্যে কিছু ভিন্নতা আছে। কেউ সংস্কৃতিকে ধারণ করতে জানে না। ঘরকুনো হয়ে থাকবে কিন্তু মুখে বড়াই করবে, এমন মুমূর্ষু হূদয়কে রবীন্দ্রনাথ চাননি। তিনি সোজা ত্যাগ করেছেন। তাঁর নিঃশ্বাসের বায়ুতে মুমূর্ষু হূদয়কে ওড়ানোর প্রত্যয়ে ইঙ্গিতে তিনি বাঙালির ঘুমন্ত সত্তাকে জাগরণের মন্ত্র দিলেন। আমরা শিখলাম সংস্কৃতিতে অসুস্থ হূদয়ের কোনো জায়গা নেই। বছর ধরে জড়ো করা যত আবর্জনা, নির্বিশেষে তাকে ফেলে দেন তিনি। কী অকুণ্ঠচিত্তে বলেন, ‘বত্সরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’। এমন বক্তব্য আমরা একালে এসেও পাই না। একটি লাইনে পুরোনো প্রথাকে আর জড়ো হওয়া অপ্রয়োজনীয় মানসিকতাকে কত বলিষ্ঠভাবে ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শেখানো আছে। পুরাতন স্মৃতি আর ভুলে যাওয়া গীতির মধ্যে সাদৃশ্য খোঁজা হয়েছে। আমরা ফেলে আসা স্মৃতির সাথে গানের মোহময়তা খুঁজি। মনে করি গানেই স্মৃতির মুক্তি। অথচ এক ধরনের মৌনতার রেশ বাড়ে। তখন মানসিকভাবে দুর্বল লাগে। এমন মনকে ঘিরে নতুনত্ব চলে না। তাই স্মৃতি আর গানের সাথে অশ্রু বা কান্নাকেও বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। বছরের আবর্জনাকে যেখানে দূরের সঙ্গী হওয়ার কথা বলা হয়েছে, কান্নাকে সেখানে ‘সূদূরে মিলাক’ বলা হলো। কী দরকার নবীন আহ্বানে আবেগের দুর্বলতাকে স্থান দিয়ে? নতুন বছরের জন্য একটি দেশ, একটি জাতি কাজ করবে। আপন প্রগতির জন্য এগিয়ে যাবে খুব স্বচ্ছন্দে। তার জন্য গ্লানিহীন পরিবেশ দরকার। গ্লানি আমাদের মুক্তিকে যে ভালোমতোই বাধাগ্রস্ত করে তা আমরাও কম বুঝি না। গ্লানির সাথে জরা এসে চেপে ধরে সর্বাত্মকভাবে। জীর্ণতার জন্য আমাদের মানসিকতা নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে। এই দুই শঙ্কা ‘গ্লানি’ আর ‘জরা’কে নিঃশেষ করার প্রত্যয়ে রবীন্দ্রনাথ অগ্নিস্নানের কথা বলেছেন। এটি আমাদের নতুন ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। ‘অগ্নিস্নান’ কত সুশীল নির্বাচন কবির। ‘আগুনের জলে স্নান’ যদি এভাবে বলি তাও অত্যুক্তি হয় না। কারণ, গ্লানি আর জরার মরণ ডেকে আনতে সক্ষম আগুনের মতো বিনাশী শক্তিই। আগুন সর্বাঙ্গীন মুক্তির ধারক। একেবারে ধুয়ে মুছে নতুন দিনের পথে জাতির অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। এখানে রবীন্দ্রনাথের শান্তিকামী মনকে জানতে পারি। পরক্ষণে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, রসের সাথে থাকা যুক্তির নয়। রস বলতে খেয়ালি মনের অস্বাভাবিকতাকে বোঝানো হয়েছে। রসের সাথে এক হয়ে একটি আশার নতুন উন্মেষ ঘটবে না। এখানে হেঁয়ালিপনার এই স্বভাবকে প্রলয়ের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তুলে আনেন কবি, যাতে আমরা ভারসাম্যের সাথে আপস করতে শিখি। মায়া যে কুজ্ঝটিকাজাল তৈরি করে রেখেছে তাকেও ত্যাগ করতে হবে। নতুন দিন শুরু হবে সেখানে পিছুটান এসে কেন বাদ সাধবে? কখনো কখনো এমন দুর্দান্ত কৌশলও খুব দরকার। তাতে মানুষ নতুন ভাবনায় নিমজ্জিত হতে পারে। নতুন চিন্তা এবং চেতনাকে একাগ্র করে প্রগতিশীল হতে শেখে। মানুষ আর সংস্কৃতির মধ্যে যে টান বা মায়া আছে তাকে রবীন্দ্রনাথ যথার্থ তুলে ধরেছেন। দুই মায়া স্বতন্ত্র হয়ে দুই অর্থে দীক্ষিত হয়েছে। প্রথমটি সংস্কৃতির প্রতি মানুষের চিরকালীন বোধ ও কর্তব্য। দ্বিতীয়টি যে অহেতুক আবেগ আত্মাকে দুর্বল করে দেবে তার বিনাশই ভালো। মঙ্গলচিন্তার অপরিসীম এ আবেগ এক দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সুপ্ত রাষ্ট্রচিন্তাকে জাগ্রত করে। আমরা বারবার চমকে যাই, কী নিটোল অনুভূতি! একটি গান, একটি মাস, একটি মাসের উত্সব। তার যে বহুমাত্রিক বোধ আর বোধের ভেতর থেকে উঠে আসা অনন্য নির্দেশনা, তাকে অসীম চেতনা না বললে নিজের চরম দুর্বলতাই বলা হবে। তিন. বৈশাখের এই গানটি বিখ্যাত, এটি আমাদের কাছে বড় কোনো কথা নয়। বড় কথা অন্যটি, এ গান মানুষ বুঝেছে। ওই যে মন বোঝার প্রসঙ্গ ওটাই আছে এ গানে। তাই সবার আগে বৈশাখের গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গীত হয়। বাঙালির চেতনার সাথে সীমাবদ্ধতাকে তুলে এনে রবীন্দ্রনাথ দ্বৈতসত্তার মিলন ঘটান। সাথে আমাদের চেতনার দরজা খুলে যায়। গানের এমন শক্তি দেখা যায় না। ধন্য তুমি রবীন্দ্রনাথ।