লবণ উত্পাদন বেশি হলেও হাসি নেই চাষিদের মুখে
আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৪, ২৩:০৮
চলতি মৌসুমে লবণ উত্পাদন বেশি হলেও চাষিদের মুখে হাসি নেই। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসেও মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম কমছেই। এরমধ্যে একটি সিন্ডিকেট দেশে লবণের ঘাটতি দেখিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। এতে লবণ চাষিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমের লবণ উত্পাদন এখন একদম শেষ পর্যায়ে। বিসিকের জরিপ মতে গত ২ মে পর্যন্ত দেশে ১৬ লাখ ৮২ হাজার টন লবণ উত্পাদন হয়েছে। ২ দিনের সামান্য বৃষ্টিপাতের পরও কেবল গত ১৪ দিনে লবণ উত্পাদন হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন। তীব্র তাপদাহের কারণে মাঠে আবদ্ধ পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ায় এখন লবণ উত্পাদনের গতি বেড়েছে বলে জানান কক্সবাজারস্থ বিসিক লবণ প্রকল্পের গবেষণা কর্মকর্তা এটিএম ওয়ালিউল্লাহ।
তিনি জানান, দেশে লবণ উত্পাদনের পরিসংখ্যান রাখার জন্য মাঠ পর্যায়ে বিসিকের জরিপ দল রয়েছে, যারা প্রতি শুক্রবার সাপ্তাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিসিকের এই জরিপ দলের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মাসের ১২ তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত এক সপ্তাহে লবণ উত্পাদন হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ২৩ হাজার টন, আর গত পক্ষকালে উত্পাদন বেড়ে হয়েছে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার টন। বিসিক কর্মকর্তাদের ধারণা, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে লবণের উত্পাদন ১৮ লাখ ৩০ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে। আর মাত্র ২/৩ দিন বৃষ্টিপাত না হলেই এ বছরের বিশাল লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে।
জানা যায়, গতবছর বিসিক লবণের চাহিদা নিরূপণ করেছিল ১৫ লাখ টন ও উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল ১৫ লাখ ২০ হাজার টন; কিন্তু চলতি মৌসুমে লবণ চাহিদা ও লক্ষ্যমাত্রা এক লাফে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টন করা হয়েছে। অথচ দেশে লবণের চাহিদা প্রতিবছর ৫ শতাংশেরও কম হারে বাড়ছে; কিন্তু ‘আমদানি সিন্ডিকেটে’র চাপে এ বছর বিসিক উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা এক লাফে ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বিসিক ‘আমদানি সিন্ডিকেট’কে উত্সাহিত করলেও ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৫ শতাংশ অর্জিত হওয়ায় এ বছর আর লবণ আমদানি করতে হবে না। এছাড়া আগামী কয়েকদিন অনুকূল আবহাওয়া থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লবণ চাষি আবদুল করিম, খুরুস্কুলের আবদুল মাবুদ ও খুটাখালীর কবির আহমদ জানান, একদিকে চলতি মৌসুমে লবণের দাম খুব কম, অন্যদিকে মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে দাম আরো কমে যাচ্ছে। এতে চাষিদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে।
জানা যায়, চলতি সপ্তাহে লবণের দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় মণপ্রতি ২ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। এরমধ্যে পলিথিন লবণ প্রতিমণে ২০ টাকা, মাঠওয়াশ লবণ প্রতিমণে ৫ টাকা ও কাদামিশ্রিত লবণ প্রতিমণে ২ টাকা হারে দাম কমেছে। এখন মাঠ পর্যায়ে পলিথিন লবণ প্রতিমণ ৯৮ টাকা, মাঠওয়াশ লবণ প্রতিমণ ৯১ টাকা ও কাদামিশ্রিত লবণ প্রতিমণ ৮৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষিরা জানান, শ্রমের মূল্য ও পলিথিনের মূল্য মিলে প্রতি মণ লবণের উত্পাদন খরচ পড়ে ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত; কিন্তু পেটের দায়ে এখন চাষিরা কমদামে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তারা। লবণ চাষিরা আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণ ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হলেও চাষিরা আড়াই টাকাও দাম পাচ্ছে না। কক্সবাজারস্থ বিসিক লবণ প্রকল্পের গবেষণা কর্মকর্তা এটিএম ওয়ালিউল্লাহ জানান, চলতি মৌসুমে দেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৫৯ হাজার ৯৬০ একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৭ হাজার ২৫৬ একর জমি ছাড়া বাকি জমি কক্সবাজার জেলার। লবণ উত্পাদনে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিয়োজিত রয়েছে বলে জানান তিনি।