উপকূল ঘেঁষে উঠে আসছে আর একটা বাংলাদেশ
প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৪, ২১:৫১
বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে। সাগরপ্রান্তে জমি উদ্ধারের ফলে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন নদীর মোহনায় যে চর পড়েছে তা সুপরিকল্পিতভাবে সুরক্ষা ও উদ্ধার করা হলে অন্তত ১৫ হাজার কিলোমিটার ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
যেসব এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে চর জেগে উঠছে সেসব এলাকায় ক্রসবাঁধ বেঁধে ভূমি উদ্ধার এবং বনায়নের মাধ্যমে তা স্থায়ীকরণ সম্ভব হবে। নেদারল্যান্ডস এ পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ জমি সাগর প্রান্ত থেকে উদ্ধার করেছে। বাংলাদেশকেও তারা এ ব্যাপারে আর্থিক সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করছে।
কক্সবাজার থেকে ৩০ কিলোমিটার সাগরের মধ্যে জেগে উঠেছে খণ্ড খণ্ড চর। সে চরে বেড়ে উঠছে সুন্দরবনের আদলে নতুন বন। বেড়ে উঠছে নতুন পর্যটন এলাকা। নতুন চর জাগছে আর সে চরে হচ্ছে বনায়ন। সাগরে কিছু ভেঙে যাচ্ছে আবার কিছু জমি জেগে উঠছে। ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছে এ প্যারাবন। সুন্দরবনের মতোই এ বনের ভেতরে ছোট ছোট নদী। নদীর দু’পাশে জঙ্গল।
তাই তো সম্প্রতি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নতুন চরাঞ্চল ও বনভূমি নিয়ে বলেছেন, উপকূল ঘেঁষে আর একটা বাংলাদেশ উঠে আসছে। এ নতুন বাংলাদেশ হবে বন্যপ্রাণীর জন্য অভয়ারণ্য। সমুদ্রের মধ্যে ওই এলাকায় প্রতিনিয়ত চরের আয়তন বাড়ছে। নতুন চর জাগছে। যেখানেই চর জাগছে সেখানেই জন্মাচ্ছে নানা গাছ। জেগে উঠছে ম্যানগ্রোভ। কোথাও বন বিভাগের সহায়তায়, কোথাও প্রাকৃতিকভাবে। মহেশখালী, সোনাদিয়া, শাপলাপুর, বড় মহেশখালী, ঘটিভাঙা, বলঘাটা, খোয়ানট এলাকাজুড়ে এই বনভূমি। বনের পূর্ব দিকে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র এবং কুহেলিকা নদী। উত্তরে উজানটিয়া নদী। পশ্চিম ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।
ভবিষ্যতের অপার সম্ভাবনার এই বন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিতে যেমনি, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি দেশের বনজ সম্পদের অন্যতম উত্স হতে চলেছে। সুন্দরবন থেকে যেসব কাঠ শিল্পে জোগান দেওয়া হয়, সেসব কাঠ এখান থেকেও ভবিষ্যতে সংগ্রহ করা যেতে পারে। সুন্দরবন যেমন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করছে, তেমনই এ বনও দেশের পূর্বাঞ্চলকে ভবিষ্যতে রক্ষা করবে। হতে পারে পুষ্টি উত্পাদক, পানি শুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড় প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী, সম্পদের আধার। এমনকি হতে পারে নতুন পর্যটন কেন্দ্র।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালের দিকে বন করার লক্ষ্যে এ অঞ্চলে প্রথম গাছ লাগানো হয়। শুরু হয়েছিল কেওড়া দিয়ে। সমুদ্রের পানিতে লবণ বেড়ে যাওয়ায় এখন কেওড়া গাছ আর বাড়ছে না। বেশি হচ্ছে বাইন। বন বিভাগ কিছু এলাকায় লাগিয়েছে গোলপাতা। গোলপাতা ভালোই বাড়ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া আছে ছৈইলা ও ঝাউ। রয়েছে কেয়াকাটা গাছ। মাত্র ৫০ বছরে একেবারে নতুন বনাঞ্চল তৈরি হয়েছে এখানে। বর্তমানে ২৪ হাজার একর জমিতে এই বন আছে। ১৫ বছরে বনের আয়তন হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০০০-০১ সালে এখানে বনের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার একর। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বেশ কয়েক বছর আগে একটি ছোট্ট চরের আড়াই একর জমিতে চার হাজার ৪৪৪টি গাছ লাগানো হয়েছিল। সেই চরের গাছের বীজ থেকে প্রাকৃতিকভাবে এখন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার গাছ। নতুন করে ২৭১ একর জমিতে গাছ লাগানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ দুনিয়ার অন্যতম ঘনবসতি দেশ। গত চার দশকে বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বসতবাড়ি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, শিল্পকলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে কৃষিজমি ব্যবহূত হওয়ায় তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশে এখন চাষযোগ্য জমির অপ্রতুলতা যেমন দেখা দিচ্ছে তেমন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে না। সাগর প্রান্তে জমি উদ্ধার করা সম্ভব হলে এ সংকট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে। সাগরপ্রান্তে নিঝুম দ্বীপের আশপাশের জমি উদ্ধার করে বনায়ন এবং পর্যটন জোন গড়ে তোলা হলে পর্যটন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া অবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। উদ্ধারকৃত জমিতে বনায়ন করা হলে ভূমিক্ষয় যেমন রোধ করা সম্ভব হবে, তেমন উপকূলবর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোর আঘাত থেকে রক্ষা পাবে।
স্বাধীনতার পর নিঝুম দ্বীপে বনায়ন এবং মাত্র কয়েকটি হরিণ ছেড়ে দেওয়া হয়। এ এলাকায় হরিণের সংখ্যা এখন প্রায় ২৫ হাজার এবং বছরে অন্তত ২০ হাজার হরিণ রপ্তানি করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে।
আমরা আশা করবো, সরকার সাগরপ্রান্তে জমি উদ্ধারকে তাদের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি হিসেবে নেবে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়েও জমি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। জনসংখ্যার তুলনায় ভূমির স্বল্পতা জাতির জন্য যেহেতু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সেহেতু এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তরিকতার প্রতিফলন ঘটবে—আমরা তেমনটিই দেখতে চাই।
ঢাকা