চিকিত্সকদের বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো রোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে
প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৪, ২১:৫২
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিত্সকদের প্রতি রোগীদের পাশে বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, চিকিত্সকদের একটু দরদি স্পর্শ, একটু সহানুভূতি, একটু হাসিমাখা মুখের কথা—যা জটিল ও কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকেও আশাবাদী করে তোলে, রোগযন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গত ৪ মে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস)-এর দ্বাদশ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান তাত্পর্যপূর্ণ।
চিকিত্সক শুধু চিকিত্সা প্রদান নয়, তাঁর মুখের একটু কথাতেও অনেক সময় রোগী সুস্থবোধ করেন। এটা নিশ্চিত করেই বলা চলে যে অনেক চিকিত্সক স্বপ্রণোদিত হয়েই এমনটি করেন। তাঁদের কারণেই দরিদ্র ও অসহায় নারী-পুরুষ হাসপাতালে কিংবা চিকিত্সকের চেম্বারে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে। তবে এর ব্যত্যয় ঘটে বলেই প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে।
চিকিত্সা একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে এই অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকার এই সাংবিধানিক তাগিদকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র বা সরকারের দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রয়াস সত্ত্বেও দেশ এখনো চিকিত্সা ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। গত চার দশকে চিকিত্সা ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঈর্ষণীয় হলেও তাতে আত্মপ্রসাদের অবকাশ নেই। এ ক্ষেত্রে আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে চিকিত্সকদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সরেজমিন পরিদর্শন করে কার্যস্থলে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে কয়েকজন চিকিত্সকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাতে ইতিবাচক ফলও মিলছে।
গত চার দশকে দেশে অসংখ্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে সব সরকারের আমলেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য উন্নয়নশীল দেশগুলো তো বটেই, ভারতের মতো অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিধর দেশকেও ছাড়িয়ে গেছে। সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশের চিকিত্সকদের একাংশ তাদের পেশাকে আদৌ মানবসেবার পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন কিনা তা এক প্রশ্ন বটে!
স্বাস্থ্যসেবার প্রসারের জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে—চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে না। এতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্ররা। সচ্ছল জনগোষ্ঠীর জন্য কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, অনেক জেলাতেও বিশ্বমানের হাসপাতাল ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র গড়ে উঠছে। উন্নত দেশগুলোতেও অনেকে চিকিত্সাসেবা নিচ্ছেন। দরিদ্রদের তো বিকল্প নেই। তাদের সরকারি হাসপাতালেরই দ্বারস্থ হতে হয়। সঙ্গত কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীর চাপ অত্যধিক। ওষুধপত্র ও চিকিত্সা সরঞ্জামের ঘাটতি প্রকট।
চিকিত্সকরা চাইলেও সবার প্রয়োজন মেটাতে পারবেন না। তবে অসাধ্যসাধনের উপায়ও তাদের হাতে রয়েছে। তারা দরদি হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। কথায় যেন মধু ঝরে। যিনি এটা করেন, তার ক্ষতি নেই এতে। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে মধুবর্ষণ তার জীবনটা মুহূর্তেই হয়ে উঠতে পারে আনন্দময় ও স্বপ্নিল। প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবেই চিকিত্সকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাদের শিক্ষার পেছনে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের অবদান অনেক। এর প্রতিদান নানাভাবেই দেওয়া সম্ভব। তবে মিষ্টি কথায় তুষ্ট করা দিয়েই তা শুরু হোক না।
চিকিত্সা ক্ষেত্রে শুধু ওষুধপত্র কিংবা অস্ত্রোপচারের ওপর রোগ নিরাময় নির্ভর করে না, রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে রোগীর মনোবলও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আমাদের চিকিত্সকদের অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন নয়। এ অসচেতনতা রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে যেমন সংকট সৃষ্টি করছে তেমন চিকিত্সকদের ওপর আস্থার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস নিজেদের সুনামের স্বার্থে চিকিত্সকরা প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
ঢাকা