সমস্যা জর্জরিত চাঁদপুর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট

বিচারক, এজলাস সংকটসহ নানামুখী সমস্যায় বিচারিক কার্যক্রম বিঘ্নিত চাঁদপুরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দীর্ঘদিন যাবত্ বিচারক, জনবল, আসবাবপত্র, এজলাস, সরকারি ফরম, যানবাহন ইত্যাদি সংকটসহ নানামুখী সমস্যা বিরাজ করায় বিচারিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মাধ্যমে সারা দেশের ন্যায় চাঁদপুরেও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি গঠন করা হয়। কিন্তু এখানে এই কার্যক্রম শুরু হবার পর আজ পর্যন্ত অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পদ ও বিচারক দেয়া হয়নি। ২০১৪ সালের ৩১ মার্চ এর হিসেব অনুযায়ী এখানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৯ হাজার ২১৫টি। অথচ এখানে বর্তমানে বিচারক কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। উল্লেখিত বিপুলসংখ্যক মামলা মাত্র ৫ জন বিচারকের পক্ষে পরিচালনা করা খুবই কঠিন। তার উপর আবার ৮৮ জন কর্মচারীর মধ্যে ১৩টি কর্মচারীর পদ শূন্য পড়ে আছে দীর্ঘদিন। এখানে এজলাসের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে বিচারকদের সকাল বিকাল ভাগাভাগি করে একই এজলাসে বিচার কার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। যে কয়টি পুরনো এজলাস রয়েছে তার বেশির ভাগই উঁই পোকার ঢিবিতে ভরপুর। জীর্ণ এজলাস ও খাস কামরাগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। তারপরও সেখানেই প্রতিকূল পরিবেশে বিচারকদের বিচারিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিল, নথি রাখার র্যাক ও আলমারি নেই। ২০১৩ সালে তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি কর্তৃক চাঁদপুরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু ভবন নির্মাণের প্রাথমিক কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক জানান, ফৌজদারি মামলার বিচার ব্যবস্থায় কোর্ট পুলিশ দপ্তরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই দপ্তরটিতে নানামুখী সমস্যা। সেখানে আসামি আনা-নেয়ার জন্য কোন প্রিজন ভ্যান বা গাড়ি নেই। স্থান স্বল্পতাও একটা বড় সমস্যা। একই কক্ষে ঠাসা-ঠাসি করে বসতে হচ্ছে। চাঁদপুরে সরকারের নির্ধারিত ছাপানো ফরম ও সরঞ্জামের তীব্র অভাবে প্রায়ই সংশ্লিষ্ট সকলকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। অনেক সময় সরকারি নির্ধারিত ফরম ফটোকপি করে কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সময়কালে চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কয়েকটি স্মারকে কেবল বিচারাধীন নথিসমূহ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তারিখের পূর্বে নিষ্পত্তিকৃত মামলার কোন নথি প্রেরণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। অনেক সময় বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার আগে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে পুলিশ ধরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করেন। তখন সংশ্লিষ্ট নথি না থাকায় এবং সাজা পরোয়ানা যুক্ত না থাকায় ধৃত আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা দেয়া যায় না। অনেক সময় হাইকোর্ট হতে এরূপ নথি তলব করা হয়। এসব ক্ষেত্রে নথি না পাওয়ায় আদেশ দেয়া যায় না। ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত হতে এরূপ কয়েকটি নথি তলব করা হয়েছে। কিন্তু সময়মত পাঠানো সম্ভব হয়নি। পুলিশ প্রতিবেদন সময়মত না আসায় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। তার উপর পুলিশ প্রতিবেদন, চার্জশিট, ইনজুরি ও ময়না তদন্ত প্রতিবেদনগুলোর বেশিরভাগ সেই পুরনো আমলের ন্যায় হাতে লিখে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে দাখিল করা হয়। এসব হাতের লেখা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট এবং সরকারি নির্ধারিত ফরমের যে ছক থাকে তার নিয়ম নীতি অনুসরণ করে তৈরি হয় না। আবার অনেক সময় ডাক্তারী পরীক্ষার সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে ডাক্তারের সিল, স্বাক্ষর, তারিখ থাকে না আবার থাকলেও তা অনেকাংশে বোধগম্য হয় না। ফলে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের সাক্ষী হিসেবে আদালতে ডাকা যায় না। সেক্ষেত্রে মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে থাকে। উপরন্তু রয়েছে সাক্ষীদের সময়মত উপস্থিত না হওয়া, বিভিন্ন সময়ে সমনজারিতে বিলম্ব, ভিন্ন জেলায় ওয়ারেন্ট, পিএন্ডএ জারি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনেক সময় জটিলতা থাকায় মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়। সম্প্রতি পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স ২০১৪ চলাকালে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দিলীপ কুমার ভৌমিক উপস্থিত সকলকে এসব সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, এতো সমস্যার মধ্যেও চাঁদপুরে বিগত বছরগুলোতে প্রচুর মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সমাধান করা গেলে চাঁদপুর হতে পারে বিচারিক ব্যবস্থায় একটি মডেল।