সাত খুনের ঘটনায় দুইদিন গণশুনানি
ইত্তেফাক রিপোর্ট ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ মে ২০১৪, ২৩:৩২
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গণশুনানির উদ্যোগ নিয়েছে। আগামীকাল সোমবার ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিন গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। যে কেউ ইচ্ছে করলে কমিটির সামনে এসে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এদিকে তদন্ত কমিটি গতকাল শনিবার নিহত সাত জনের স্বজনদের সাক্ষ্য নিয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, নিহত কারো স্বজনই সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ দিতে পারেননি। শুধুমাত্র নিহত নজরুলের স্বজনরা নূর হোসেনের ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়েছেন। তাছাড়া র্যাবের সম্পৃক্তার ব্যাপারেও অভিযোগ করেছেন তারা। অপরদিকে মামলার তদন্ত নূর হোসেনের মধ্যেই আটকে আছে। নূর হোসেন গ্রেফতার না হলে মামলার কাজ এগুচ্ছে না বলে জানিয়েছে তদন্ত সূত্র।
প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব আবুল কাশেম মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে ওই গণশুনানি। গণশুনানিতে যে কেউ ইচ্ছে করলে তথ্য দিতে পারবেন। কেউ কোন তথ্য দিলে তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে বলেও জানান তিনি। এছাড়া গতকাল বেলা ১১টা থেকে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাহামুদুর রহমান এর কার্যালয়ে নিহতদের স্বজনদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। প্রথমেই সাক্ষী দেন নিহত নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা। তার পরিবারের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম, ভাই আবদুস সালাম ও শ্বশুর শহীদুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন।
তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের পরিবারের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেন তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আলী খান, স্ত্রী মোর্শেদা বেগম, ভাই রিপন, দুই মেয়ে স্বর্ণা ও মাহি। এডভোকেট চন্দন সরকারের পরিবারের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেন তার দুই মেয়ে ডা. সুস্মিতা সরকার ও সেজুতি সরকার এবং দুই জামাতা রঞ্জিত দেবনাথ ও ডা. বিজয় কুমার পাল। নিহত তাজুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দিতে আসেন তার মা তাসলিমা, বাবা আবুল খায়ের ও ভাই সাইফুল ইসলাম রাজু। সিরাজুল ইসলাম লিটনের পরিবারের পক্ষে তার বড় ভাই রফিকুল ইসলাম ও ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম মিন্টু। ড্রাইভার জাহাঙ্গীরের পরিবারের পক্ষে তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সামসুন্নাহার নুপুর, মা মেহেরুন নেছা, ভাই শাহজাহান সাজু ও শাহবুদ্দিন। নিহত আরেক ড্রাইভার ইব্রাহিমের বাবা আবদুল ওহাব মিয়া, স্ত্রী অনুফা বেগম, ছেলে রনি, বোন রহিমা ও ভাগ্নে শাকিল সাক্ষ্য দেন।
নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত- সেলিনা ইসলাম
সাক্ষ্য শেষে নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যা ঘটেছে সেই সকল ঘটনার বিবরণ তদন্ত কমিটির কাছে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নজরুলকে কারা খুন করতে পারে সে ধারণাও দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আমাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। তবে তদন্ত কমিটির সদস্যরা দ্রুত নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান সেলিনা।
সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান বলেছেন, নূর হোসেনই নজরুলের খুনী। নূর হোসেনের বাড়ি থেকে রক্তমাখা শার্ট উদ্ধার হয়েছে। চন্দন সরকারের মোবাইল উদ্ধার হয়েছে। র্যাব অফিসের সামনে থাকা ইট, লাশের সাথে উদ্ধার হওয়া ব্যাগ, রশিই প্রমাণ করে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে কারা জড়িত। চাকরিচ্যুত র্যাবের ৩ কর্মকর্তা সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি সংস্থার লোক তার সদস্যদের বিচার করতে পারে না। তাদের বিচারের জন্য র্যাবের ওই ৩ কর্মকর্তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার দাবি জানান তিনি।
শহীদ চেয়ারম্যান বলেন, ‘কমিটির কাছে আমি তদন্ত কাজে ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি।’ অভিযুক্ত ব্যর্থ কর্মকর্তাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না এ নিয়েও প্রশ্ন করেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নরসিংদীতে মেয়র লোকমান হোসেনের হত্যা মামলার তদন্তকারীরা বর্তমানের মামলাটি তদন্ত করছেন, আমি তাদের নিয়ে আশাবাদী। নূর হোসেনকে ক্রসফায়ারে না দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নূর হোসেনকে ক্রসফায়ারে দিলে মামলাটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই নূর হোসেনকে ক্রসফায়ারে না দেয়ার আহবান জানিয়েছি আমি।
দ্রুত রহস্য উম্মোচন হোক- ডা. সুম্মিতা সরকার
হত্যাকাণ্ডের শিকার এডভোকেট চন্দন সরকারের মেয়ে ডা. সুস্মিতা সরকার সাক্ষ্য শেষে সাংবাদিকদের বলেন, কাউকে সন্দেহ করার মতো কিছু ছিল না। যেহেতু বাবার সাথে কারো কোন শত্রুতা ছিল না, তাই আমরা নিজেরাই রহস্যের মধ্যে আছি। কেন তাকে হত্যা করা হল। কারাই বা তাকে হত্যা করল। তাই আমরা চাই দ্রুত এই রহস্যের উম্মোচন হোক।
মরে যাওয়ার কথা বলেছিল জাহাঙ্গীর- শামসুন্নাহার নুপুর
ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুলের গাড়ি চালক ছিলেন নিহত জাহাঙ্গীর। তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শামসুন্নাহার নুপুর সাক্ষ্য দিয়ে বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাহাঙ্গীর খুন হওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে আমাকে বলেছিল, মরে যাওয়ার হুমকি আছে। নজরুল ভাইয়ের গাড়ি চালালে মরে যেতে পারি। এপ্রিল মাসের বেতন পেলে নজরুল ভাইয়ের গাড়ি চালানো ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছিল। আমি সেটাই তদন্তকারী কমিটির কাছে বলেছি।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সবাইতো সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হয় এটা দেখার বিষয়। সামনের দিনগুলো বাঁচবো না-কি মরে যাবো এ নিয়ে শঙ্কায় আছি।’
আমরা কিছুই জানি না— অনুফা বেগম :এডভোকেট চন্দন সরকারের গাড়ি চালাতেন ইব্রাহিম। তার স্ত্রী অনুফা বেগম সাক্ষ্য দিয়ে বের হয়ে সাংবাদিকদের জানান, ‘ইব্রাহিমের কোন শত্রু ছিল না। তার উপার্জন দিয়ে অনেক কষ্টে আমরা দিনপার করতাম। এর বেশি আমি আর কিছুই বলতে পারবো না।’
প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির কার্যপরিধি
গণতদন্তের মাধ্যমে সাতজন অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে প্রশাসনের কোনো সদস্য বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না, তা উদঘাটন করবে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া অপহরণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপহূত ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো অবহেলা বা ইচ্ছাকৃত গাফিলতি ছিল কি-না, তা নির্ণয় করবে। কমিটি সাত দিনের মধ্যে তদন্তকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে প্রতিবেদন দাখিল করবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লার নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দুই উপ-সচিব আবদুল কাইয়ুম সরকার ও আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন, আইন মন্ত্রণালয়ের দুই উপ-সচিব মোস্তাফিজুর রহমান ও মিজানুর রহমান খান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই উপ-সচিব শফিকুর রহমান ও সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার।
টেকনাফে কড়া নজরদারি
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীসহ সাতজনকে অপহরণের পর অভিযুক্তরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
টেকনাফ স্থলবন্দরের অভিবাসন কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হারুন-অর-রশিদ জানান, মিয়ানমারের সঙ্গে টেকনাফ সীমান্তে ট্রানজিট বর্ডার পাসের মাধ্যমে যাতায়াতে তল্লাশি চৌকি রয়েছে। এলাকায় সন্দেহভাজন লোকজনকে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নূর হোসেনসহ কয়েকজনের ছবি টাঙ্গানোর পাশাপাশি পুরো এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বেগমগঞ্জে ২ জনকে
আটক
সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জ সিআইডি পুলিশের একজন এএসপি’র নেতৃত্বে গতকাল শনিবার বিকালে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ইয়ারপুর ও বেগমগঞ্জের লাউতলী এলাকায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশের একটি বিশেষদল। সিআইডি পুলিশের দলটি বেগমগঞ্জের লাউতলী এলাকা থেকে দুইজনকে আটক করে।
আটককৃতরা হলেন- জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের লাউতলী গ্রামের মো. ছেরাজুল হকের পুত্র মো. সম্রাট (৩৫) ও তার ভগ্নিপতি মো. মাসুদ (৩৩)। আটকের পর পরই তাদের নিয়ে সিআইডি পুলিশের দলটি নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়। আটককৃতরা নারায়ণগঞ্জে ফার্নিচার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে লাউতলী গ্রামের স্থানীয় লোকজন জানায়। তবে আটককৃতরা কি ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত তা স্থানীয় পুলিশ বলতে পারেনি।