নবম-দশম শ্রেণির বাংলা দ্বিতীয়পত্র

সারমর্ম ১.একদা ছিল না জুতা চরণ যুগলে দহিল হূদয় মম সেই ক্ষোভানলে। ধীরে ধীরে চুপি চুপি দুঃখাকুল মনে গেলাম ভজনালয়ে ভজন কারণে। দেখি সেথা এক জন পদ নাহি তার অমনি জুতার খেদ ঘুচিল আমার। পরের দুঃখের কথা করিলে চিন্তন আপনার মনে দুঃখ থাকে কতক্ষণ। সারমর্ম: পদহীন দুঃখিজনের কথা চিন্তা করলে কারো পায়ে জুতা না থাকার দৈন্য মনে স্থান পায় না। আসলে পরের দুঃখ কষ্টকে উপলব্ধি করার মাঝেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। ২. এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে। চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাবো আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। সারমর্ম: পৃথিবীতে নতুনের জন্যে পুরাতনকে স্থান ছেড়ে দিতে হয়- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। জীর্ণ পৃথিবীর ব্যর্থ, মৃত, ধ্বংস্তূপ আর গ্লানি দূর করে তাকে নবীনদের বাসযোগ্য আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র কাম্য। ৩. কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর? মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেই সুরাসুর। রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয় আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনি পুড়িতে হয়। সারমর্ম: এই পৃথিবীতে মানুষের মাঝেই স্বর্গ ও নরক বিদ্যমান। বিবেকবর্জিত মানুষ পৃথিবীতেই নরক-যন্ত্রণা ভোগ করে, আর যারা ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলে তাদের কাছে পৃথিবীটাই স্বর্গ। ৪. দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণ ব্যথা নাহি পায় কোন, তারে দণ্ড দান প্রবলের অত্যাচার। যে দণ্ড বেদনা পুত্রেরে পার না দিতে, সে কারেও দিও না। যে তোমার পুত্র নহে, তারও পিতা আছে, মহাঅপরাধী হবে তুমি তার কাছে। সারমর্ম: বিচারের সময় অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীর হলে সে বিচার হয় আদর্শ বিচার। কারণ অপরাধ নিন্দনীয়, অপরাধী নয়। তাই একমাত্র সহানুভূতিশীল বিচারই পারে অপরাধীর মনের পরিবর্তন করাতে ও চরিত্রের সংশোধন ঘটাতে। ৫. দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর হে নব সভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী, দাও সেই তপোবনে পুণ্যচ্ছায়া রাশি, গ্লানিহীন দিনগুলি; সেই সন্ধ্যাস্নান, সেই গোচারণ, শান্ত সামগান, নীবার ধান্যের মুষ্টি, বঙ্কল-বসনে মগ্ন হয়ে আত্মমাঝে নিত্য আলোচন মহাতত্ত্বগুলি। পাষাণপিঞ্জরে তব নাহি চাহি নিরাপদে রাজভোগ নব- চাই স্বাধীনতা, চাই পক্ষের বিস্তার, বক্ষে ফিরে পেতে চাই শক্তি আপনার, পরানে স্পর্শিতে চাই-ছিড়িয়া বন্ধন, অনন্ত এ জগতের হূদয়স্পন্দন। সারমর্ম: আধুনিক কর্মনাশা স্রোতে আরণ্যক পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। নগর সভ্যতার কৃত্রিমতায় মানবজীবন অতিষ্ঠ। তাই মানুষ আজ আরণ্যক জীবন ফিরে পেতে চায়। ৬. দৈন্য যদি আসে, আসুক, লজ্জা কিবা তাহে, মাথা উঁচু রাখিস। সুখের সাথী মুখের পানে যদি নাহি চাহে, ধৈর্য ধরে থাকিস। রুদ্র রূপে তীব্র দুঃখ যদি আসে নেমে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াস, আকাশ যদি বজ্র নিয়ে মাথায় পড়ে ভেঙে ঊর্ধ্বে দু’হাত বাড়াস। সারমর্ম: জীবনের দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে কোনো লজ্জা নেই, বরং কারও মুখাপেক্ষী হওয়ার মধ্যেই লজ্জা। বিপদে ধৈর্য ধারণ করে দুঃখ-দারিদ্র্যকে সাহস ও মনোবল দিয় প্রতিহত করতে পারলে জীবনে সফল হওয়া যায়। ৭. পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মনে সকলি দাও, তার মত সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও। পরের কারনে মরণেও সুখ, ‘সুখ-সুখ’ করি কেঁদো না আর; যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে, ততই বাড়িবে হূদয়-ভার। আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেউ অবনী পরে সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। সারমর্ম: ব্যক্তিগত দুঃখ সন্তাপে হা-হুতাশ না করে বরং নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে পরের উপকার করার মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত। মানব জীবন ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক নয়, একে অন্যের কল্যাণে ব্রতী হওয়াই মনুষ্যত্বের পরিচয়। ৮. বসুমতী, কেন তুমি এতই কৃপণা? কত খোঁড়াখুঁড়ি করে পাই শস্য কণা। দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস- কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস? বিনা চাষে শস্য দিলে কি তা হতে ক্ষতি? শুনিয়া ঈষত্ হাসি কন বসুমতী, আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে; তোমার গৌরব তাহে একেবারে ছাড়ে। সারমর্ম: শ্রমবিমুখ মানুষ এই পৃথিবীর সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়। সুকঠিন শ্রম ও কর্মসাধনার কোনো জিনিস লাভ করলে তাতে গৌরব ও আত্মতৃপ্তি দুই-ই পাওয়া যায়। পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীলতা মানুষের মর্যাদা ও গৌরব বাড়ায়।