সৃজনশীল পদ্ধতি :বিপাকে শিক্ষক, শঙ্কায় শিক্ষার্থী

‘সনাতন প্রশ্নপদ্ধতি’ বাদ দিয়ে উন্নত বিশ্বের ধারণায় ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ শুরু হওয়ার ছয় বছর পার হলেও এক্ষেত্রে ততটা অগ্রগতি হয়নি। এখনো জোড়াতালি দিয়েই চলছে এই পদ্ধতি। ২০০৯ সালে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক্রমে চালু করা হয় এই পদ্ধতি। এতে দীর্ঘ ছয় বছর পার হলেও খোদ শিক্ষকেরাই এই পদ্ধতি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি। এ পদ্ধতির প্রশ্ন প্রণয়ন করতে না পেরে এখনো কোথাও কোথাও বাইরে থেকে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা নেন শিক্ষকরা। পাশাপাশি শ্রেণীকক্ষে সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। নিজে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পেয়ে শ্রেণীকক্ষে পড়াতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন শিক্ষকরা। আর এ কারণে শঙ্কায় আছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সব শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, শিক্ষকরা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন, শিক্ষার্থীরাও ভালোভাবে শিখেছে- বরাবরই শিক্ষা প্রশাসন এমন বক্তব্য দিলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্রের সাথে এই বক্তব্যের বিস্তর ফারাক। এখনো সব শিক্ষক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি। এর প্রমাণ বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেয়া। খোদ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সর্বশেষ গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ঢাকা অঞ্চলে ৬৩ ভাগ শিক্ষক নিজে প্রশ্ন প্রণয়ন করেন। আর আংশিক প্রশ্ন প্রণয়ন করেন ১৬ ভাগ এবং বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেন প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষক; কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে এসে সৃজনশীলে আরো অদক্ষতার পরিচয় দেন শিক্ষকরা। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ৫৩ শতাংশ শিক্ষক নিজে প্রশ্ন প্রণয়ন করে পরীক্ষা নেন, আংশিক প্রণয়ন করেন ৪৫ শতাংশ আর বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেন ২২ শতাংশ। জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে প্রায় ১১ শতাংশ শিক্ষক, ময়মনসিংহে ১৬ শতাংশ, রংপুরে ১৭ শতাংশ, বরিশালে ২০ শতাংশ শিক্ষক বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেন। এ হার ফেব্রুয়ারিতে এসে দাঁড়ায় চট্টগ্রামে প্রায় ৮ শতাংশ, বরিশালে ১৯ শতাংশ, রংপুর ও ময়মনসিংহে ১৪ শতাংশ। সার্বিক হিসাবে জানুয়ারিতে মাত্র ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে পারেন। তবে ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা উন্নীত হয় ৬২ শতাংশে। ১২ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাইরে থেকে গোটা প্রশ্নপত্র কিনে পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। আর আংশিক প্রশ্ন নিজেরা তৈরি করে এবং কিছু অংশ প্রশ্ন অন্য বিদ্যালয় কিংবা সমিতি থেকে কিনে পরীক্ষা নিয়ে থাকে এরূপ প্রতিষ্ঠানের হার ৩০ শতাংশ। শিক্ষা অধিদপ্তরের এই চিত্রই বলে দেয়, সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষকরা কতটা শিখেছেন। ‘একাডেমি সুপারভিশন’ নামের ওই অনুসন্ধান পর্যবেক্ষণ শেষে সুপারিশে বলা হয়, প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যাতে সৃজনশীল প্রশ্নমালা প্রণয়ন করেন সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ বাইরে থেকে প্রশ্নমালা যাতে সংগ্রহ করতে না পারে সে বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাইরে থেকে সংগ্রহ করে প্রশ্ন আনার কারণ হিসাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এইসব শিক্ষক প্রশ্ন করতে পারেন না বলেই বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেন। এ বিষয়ে মাউশির ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপ-পরিচালক একেএম ফজলুল হক বলেন, অনেক শিক্ষক প্রশ্ন করার জন্য অন্য কাউকে দায়িত্ব দেন, নিজেরা প্রশ্ন করছেন না। আমরা এ বিষয়ে কঠোর হয়েছি। যারা প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছেন না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরো ভয়াবহ। গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষকই প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন না বলে শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ২০০৯ সালে দেশে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। সব শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ না দিয়ে নতুন এ পদ্ধতি চালু করায় বিপাকে পড়েন শিক্ষকরা। যদিও এ বিষয়ে এখনো প্রশিক্ষণ চলছে। এসএসসিতে গণিত, উচ্চতর গণিত, বাংলা দ্বিতীয়পত্র এবং ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয়পত্র এই পাঁচটি বিষয় বাদে বাকী ২১টি বিষয়ের পরীক্ষা হয় সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে। আর এইচএসসিতে বাংলা প্রথমপত্র, রসায়ন, পৌরনীতি, ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ, জীববিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, হিসাব বিজ্ঞান, ব্যবসায় উদ্যোগ ও ব্যবহারিক ব্যবস্থাপনা, সমাজ বিজ্ঞান এবং কম্পিউটার শিক্ষা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রসহ মোট ২৫টি বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়। আগামী ২০১৫ সালে উচ্চতর গণিত এবং গণিতেও সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। একাধিক অভিভাবক এই প্রতিবেদককে বলেন, শিক্ষকরা ভালোভাবে এ পদ্ধতি না বুঝে শ্রেণীকক্ষে পড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর কেমন হবে সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা দিতে পারছেন না। এ কারণে অনেক অভিভাবক বাইরে থেকে গাইড বই কিনে বোঝার চেষ্টা করেন। ২০১৭ সালের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় উচ্চতর গণিত বিষয়ের পরীক্ষা এ নিয়মে হবে। সারাদেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার। তার মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত, দক্ষ, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক রয়েছেন রাজধানী ঢাকার নামি-দামি বিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু রাজধানীর মত দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এমন করুণ দশা হলে সার্বিকভাবে সারাদেশের চিত্র কী হবে তা সহজেই ধারণা করা সম্ভব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, ভালোভাবে প্রশিক্ষণ না দিয়ে এ পদ্ধতি চালু করে বিপাকে ফেলা হয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরকে। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী একটি উপজেলার এক শিক্ষা অফিসার বলেন, আমি দেখেছি অনেক শিক্ষক বাংলাবাজার থেকে সৃজনশীল গাইড কিনে সেখান থেকে প্রশ্ন প্রণয়ন করে পরীক্ষা নেন। সারাদেশেই এই ঘটনা ঘটছে। সরকারের উচিত, এ বিষয়ে কঠোর মনিটরিং করা এবং শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া। রাজধানীর এক শিক্ষক বলেন, বাইরে থেকে প্রশ্ন ক্রয়ের বিষয়ে শিক্ষকদের দায়ী করলে চলবে না। শিক্ষকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি বলেই প্রশ্ন করতে পারছেন না। এখন এসব শিক্ষক কী করবেন? পরীক্ষা তো নিতেই হবে, এ কারণে বাধ্য হয়ে তারা বাইরে থেকে প্রশ্ন কিনে স্কুলের পরীক্ষাগুলো নেন। শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি মনিটরিং এ্যান্ড কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ইউনিটের উপ-পরিচালক ওসমান ভুঁইয়া বলেন, অনুসন্ধান করে দেখা গেছে শিক্ষকরা নিজেরা প্রশ্ন প্রণয়ন না করে সমিতির কাউকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব দেন। আশপাশের স্কুলগুলো সেই প্রশ্নের আলোকে পরীক্ষা নেয়। তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়ায় বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রশাসন কাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সব শিক্ষক প্রশ্ন প্রণয়নের দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি বলেই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এসব শিক্ষকদের আরো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, নতুন এই পদ্ধতিতে ইতিমধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, যার সুফলও ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তবে নতুন কিছু চালু করলে রাতারাতি শতভাগ সাফল্যের কাছাকাছি যাওয়া যায় না।