উন্নয়নের স্বার্থে ঝুঁকি নিতে চান অর্থমন্ত্রী
প্রকাশ : ১২ মে ২০১৪, ২৩:০৭
আসছে বাজেট
পরিবহন এবং যোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে আট হাজার কোটি টাকা
উন্নয়নের জন্য ঝুঁকি নিতে চান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাই আসছে নতুন বছরের বাজেটেও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য স্থির করে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ইতিমধ্যেই তিনি বাজেটের আকার আড়াই লাখ কোটি টাকার হতে পারে বলে জানিয়েছেন। প্রতিবারের মত এবারেও সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির চিন্তা করছেন তিনি। যদিও সঠিক মাত্রায় এর সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশের অর্থনীতি। বরং বেসরকারি বিনিয়োগে বন্ধ্যাত্ব রয়েই গেছে।
গত ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও নতুন করে বিনিয়োগে সিদ্ধান্তহীনতা কাটেনি। ব্যাংকগুলোতে তারল্য থাকলেও হলমার্কসহ অন্যান্য কেলেঙ্কারির উদাহরণ ধরে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে গেছে। একইসঙ্গে আছে জ্বালানির অপ্রতুলতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ কিছু সমস্যা। অভ্যন্তরীণ এসব সমস্যার মধ্যে আন্তর্জাতিক কিছু চাপও রয়েছে। বিশেষত, এবারে বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও মিলছে না। বৈদেশিক সাহায্য অবমুক্তও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। এ অবস্থায় নতুন বছরের জন্য একটি বাজেট প্রণয়ন সত্যিই চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, অর্থমন্ত্রী অন্যবারের মতই বাজেট প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন। তবে নতুন বাজেটে পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বেশ কিছু প্রকল্পে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু এসব প্রকল্পে বিদেশি সহায়তা না এলে শুধু অভ্যন্তরীণ উত্স অর্থায়ন করলে ফলপ্রসূ হবে না। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এই সময় বাজেট একটু বাস্তবভিত্তিক হওয়া উচিত। বিনিয়োগ স্থবিরতার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও প্রথমবারের মতো দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। ফলে অর্থনীতি গতি পাচ্ছে না। যদি বড় প্রকল্পে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে অর্থায়ন করা হয়, তাতে বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগ করা আরো দু:সাধ্য হয়ে পড়বে। তাতে কর জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্যও পূরণ হবে না। অর্থমন্ত্রী আগামী ৫ বছরের মধ্যে কর জিডিপির অনুপাত বর্তমানের ১৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৮ শতাংশে উন্নীত করার কথা ভাবছেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হলে, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি না হলে এটা সম্ভব হবে না।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে এখন বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও অর্থনৈতিক স্ফূরণ হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে আটকে গেছে। অবকাঠামো খাতে প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে প্রণোদনা দিতে হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, আসছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের ৭৯ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটে পরিবহন এবং যোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে আট হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে আসছে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, গত ৫ বছরে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতায় চলতি অর্থবছরের শুরুতে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা ছিল। তা না হলে পরিস্থিতি আরো উন্নত হতো। তিনি বলেন, নতুন বছরের বাজেটে জেলা বাজেট এবং বৃহত্ অবকাঠামো গড়ার দিকে বিশেষ মনোযোগী হওয়া দরকার। বিনিয়োগ হচ্ছে না মূলত অবকাঠামো সুবিধার অভাবে।
অন্যদিকে বাজেটের আকার যত বড়ই হোক না কেন এর বাস্তবায়নের দিকে মনযোগী হতে তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজেট বাস্তবায়ন চিত্রে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের নয় মাসে অর্থাত্ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৩ শতাংশ। বিগত সময়ে দেখা গেছে এডিপি’র বড় অংশ ব্যয় হয়েছে অর্থবছরের শেষ ভাগে। চলতি অর্থবছরে এ চাপ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এডিপি সংশোধন করে ৬০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হলেও অর্থবছর শেষে এর গুণগত বাস্তবায়ন নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় মানে সরকারের বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির জন্য প্রাপ্তি। বাস্তবায়ন না করতে পারলে সে ব্যর্থতা বৈদেশিক সহায়তাকারী সংস্থার নয়, নিজেদের। আমাদেরকে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার প্রতি মনযোগ দিতে হবে। সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি ব্যতিরেকে উন্নয়ন-অনুন্নয়ন বাজেটের অর্থ ব্যয় হলে তা অর্থনীতিতে বিরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে পারে বলে মনে করেন তিনি।