স্মরণীয় বরণীয়
কবি কামিনী রায়
প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৪, ২০:০২
বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য অসাধারণ কবি কামিনী রায়। যে সময় বাঙালি মেয়েরা লোকালয়ে আসতে পারত না, তখন তিনি সাহিত্য রচনা করতেন, লিখতেন কবিতা। রবীন্দ্র যুগে জন্ম নিয়েও কামিনী রায় সম্পূর্ণ নিজস্ব ঢং-এ লিখতেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাঙালি ভুলতে বসেছে এই কবিকে। এ কবির জন্ম অবিভক্ত ভারতের চন্দ্রদ্বীপ-এর অন্তর্গত বাকেরগঞ্জে। যা আজকের বরিশাল জেলায়। গ্রামের নাম বাসন্ডা। কবি কামিনী রায়ের জন্মতারিখ ১২ অক্টোবর ১৮৬৪ সাল। কামিনী রায়ের বাবার নাম চন্ডী চরণ সেন। আর মায়ের নাম রামা সুন্দরী দেবী। ১৮৯৪ সালে কামিনী রায়ের বিয়ে হয় কেদারনাথ রায়ের সাথে। সেই থেকে সেন পরিবারের মেয়ের নামের সাথে রায় যুক্ত হয়। সেই থেকে তিনি কামিনী রায় নামেই পরিচিত লাভ করেন। মায়ের কাছেই কামিনী রায়ের লেখাপড়ার হাতেখড়ি। বাড়িতেই তিনি বর্ণ পরিচয় বইগুলো পড়ে শিক্ষা অর্জন করেন। শিশু শিক্ষা শেষ করে ৯ বছর বয়সে কামিনী রায়কে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। তিনি ১৮৮৩ সালে প্রাইমারী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেন। কামিনী রায় ১৪ বছর বয়সে মাইনর পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৮৮০ সালে কলকাতা বেথুন ফিমেল স্কুল হতে এনট্রান্স পাস করেন। ১৯৮৩ সালে ফার্স্ট আর্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ হতে ভারতের প্রথম নারী হিসেবে সংস্কৃত ভাষায় অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ভারতের প্রথম নারী হিসেবে কামিনী রায় এ সম্মান অর্জন করেন।
কামিনী রায় কর্মজীবন শুরু করেন বেথুন স্কুলের শিক্ষক হিসেবে। পরে অবশ্য তিনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। কামিনী রায় অবিভক্ত ভারতের প্রথম মহিলা অনার্স গ্র্যাজুয়েট। তিনি শিক্ষিত মার্জিতদের ও সাহিত্যিকদের ভালোবাসতেন। সহযোগিতা করতেন নারী কবিদের। কামিনী রায় বরিশালের মেয়ে হলেও বাস করতেন কলকাতায়। এ কবি ১৯২৩ সালে এক সম্মেলনে বরিশাল এসেছিলেন। তখন বাংলার আরেক মহিয়সী নারী সাহিত্যিক কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়। কামিনী রায়ের উপদেশমূলক কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যকে করেছে পরিপূর্ণ। তার একটি বিখ্যাত কবিতা হলো, ‘করিতে পারি না কাজ। সদা ভয় সদা লাজ। সংশয়ে সংকল্প টলে। পাছে লোকে কিছু বলে।’ এটা কবি কামিনী রায়ের পাছে লোকে কিছু বলে কবিতার মাত্র কয়েকটি লাইন, ‘সুখ’ কামিনী রায়ের আরো একটি বিখ্যাত কবিতা। ‘নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ? এ ধরা কি শুধু বিষাদময়। যাতনে জ্বলিয়া কাদিয়া মরিতে, কেবলি কি নর জনম লয়।’ এমনই অসংখ্য কবিতা লিখেছেন তিনি। তিনি ত্যাগের কবি, মানবতাবাদী কবি, তিনি মহত্ উদ্দেশ্যের কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো— আলো ও ছায়া, নির্মাল্য, অশোক সংগীত, দীপ ও ধূপ এবং জীবন পথে। তিনি নাটক ও জীবনী গ্রন্থও রচনা করেছেন।
শেষ জীবনে কবির স্বামী কেদারনাথ রায় ও সন্তানরা মারা যান। আপনজনদের হারিয়ে একা হয়ে পড়েন কবি কামিনী রায়। শেষ জীবনে কবি ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে বাস করতে থাকেন। কামিনী রায় যে এলাকায় থাকতেন তার নাম হাজারীবাগ। এখানেই কবির জীবনাবসান ঘটে। ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে কবি কামিনী রায় মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে “জগত্তারিণী পদকে” সম্মানিত করে।
করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে—
পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।
০০০
একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,—
চলে যাই উপক্ষোর ছলে
পাছে লোকে কিছু বলে।
০০০
বিধাতা দিছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।