চট্টগ্রামের দুঃখ কি ঘুচিবে না
প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৪, ২১:৩৯
বর্ষা মৌসুম শুরুই হয় নাই। অথচ গত রবিবারের সামান্য বৃষ্টিতেই তলাইয়া গিয়াছে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে কর্মব্যস্ত বন্দরনগরীর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জনজীবন। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হইয়াছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষকে। এখনই যদি এই অবস্থা হয়, তাহা হইলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে কী হইবে—তাহা ভাবিয়া চট্টগ্রামবাসীর ঘুম হারাম হইবার জোগাড়। তবে এই পরিস্থিতি যে আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয় নাই, তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। বরং চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘলালিত দুঃখের অপর নাম হইয়া দাঁড়াইয়াছে এই জলাবদ্ধতা। কয়েক বত্সর আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে বর্তমান মেয়র যখন নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন তখনও এই জলাবদ্ধতাই হইয়া দাঁড়াইয়াছিল জয়-পরাজয়ের মূল ফ্যাক্টর। নির্বাচনী প্রচারণা যখন তুঙ্গে কাকতালীয়ভাবে তখনও তুমুল বৃষ্টির তোড়ে পানির নীচে তলাইয়া গিয়াছিল চট্টগ্রাম মহানগরের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। বর্তমান মেয়র ইস্যুটিকে ভালোভাবেই কাজে লাগাইয়াছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন যে প্রতিকারহীন জলাবদ্ধতার ঘোলাজলেই ভরাডুবিই হইয়াছিল দুইবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় মেয়রের। হইবারই কথা। তিনি দুই মেয়াদে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। তাহারও অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান। কিছু উদ্যোগও তিনি নিয়াছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাহার দৃশ্যমান কোনো সুফল জনগণ পায় নাই। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে।
বর্তমান মেয়রেরও একনম্বর নির্বাচনী ওয়াদা ছিল জলাবদ্ধতা সমস্যার নিরসন। তাহার মেয়াদকালেরও উল্লেখযোগ্য একটি সময় অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু ফলাফল যে এখন পর্যন্ত অভিন্ন রহিয়া গিয়াছে, রবিবারের জলাবদ্ধতা যেন তাহাই স্মরণ করাইয়া দিল। তবে ইহা বলা যাইবে না যে তিনি কিছুই করেন নাই। অন্তত অর্থব্যয়ের খতিয়ান তাহা বলে না। জানা যায়, শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পেই গত চার বত্সরে ব্যয় হইয়াছে দেড়শত কোটি টাকা। কোথায় গেল এই টাকা? বলা হইয়াছে যে নর্দমার মাটি উত্তোলন ও অপসারণ, নালা-নর্দমা নির্মাণ ও খাল সংস্কার প্রভৃতি কাজে ব্যয় করা হইয়াছে এই অর্থ। তাহাই যদি সত্য হয়, তাহা হইলে কেন এই জলাবদ্ধতা? কেন এই জনদুর্ভোগ? মেয়র অবশ্য ইহাকে জলাবদ্ধতা বলিতে রাজি নহেন। তাহার মতে, ইহা ‘সাময়িক জলজট’ মাত্র। একই সাথে চট্টগ্রামের ধমনী বলিয়া পরিচিত চাক্তাই খালসহ বিভিন্ন খাল খননেরও দাবি করিয়াছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে তাহার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। খনন কার্য সম্পন্ন হইবার কিছুদিনের মধ্যেই ভরাট হইয়া গিয়াছে মুরাদপুরের মির্জাপুর খালও। আর যেই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য এতো কাঠখড় পোড়ানো—তাহার অসারতা তো রবিবারের সামান্য বৃষ্টিতেই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে।
প্রশ্ন হইল, দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগণের অর্থের অপচয় কি চলিতেই থাকিবে? বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় হইবে অথচ জনগণের দুর্ভোগ ঘুচিবে না—এই প্রহসন মানিয়া লওয়া যায় না। দীর্ঘদিন যাবত্ যেইভাবে যাহাদের দ্বারা এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলিতেছে তাহাতে যে কাজ হইতেছে না—এই সত্য উপলব্ধি করিতে আর কতো সময়ের প্রয়োজন? সমস্যাটি যেহেতু জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী তাহার সমাধানে যতো দ্রুত সম্ভব যথোচিত উদ্যোগ গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও গ্রহণ করিতে হইবে বৈকি।