আগামী ২৬ মে শব-ই মেরাজ

হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মেরাজের বিস্ময়কর ঘটনা

মানবকুলের শিরোমনি এবং নবী ও রসূলদের মুকুটমনি হযরত মুহাম্মদ (স.) একদা মক্কাতে শিআবে আবূ ত্ব-লিবে অবস্থিত তাঁর চাচাতো বোন উম্মে হা-নীর ঘরে এশার নামায পড়ে শুয়েছিলেন। তখন তাঁর একপাশে নিদ্রিত ছিলেন প্রাণপ্রিয় চাচা হামযা এবং অন্যপাশে ঘুমাচ্ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ চাচাতো ভাই জাফর (রা.) (ফতহুল বারী)। অতঃপর তাঁর ঘরের ছাদ ফুঁড়ে জিবরীল আমীন ও মীকায়ীল (আ.)-এর আগমন তাঁর কাছে হয়। তখন তিনি ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিলেন। অতঃপর জিবরিল তাঁকে ঐ ঘর থেকে বের করে মসজিদুল হারামের দিকে হাত্বীমের কাছে নিয়ে আসেন। তখন তাঁর মধ্যে ঘুমের ভাব ছিল। এরপর জিবরীল তাঁর সীনা থেকে নাভীর ওপর পর্যন্ত ফেড়ে এবং তাঁর বুক ও পেট থেকে কিছু বের করে সেটাকে যমযম পানি দিয়ে ধুয়ে তাঁর পেটটাকে পাকসাফ করে দেন। তারপর তিনি সোনার একটি তশ্তরী আনেন। যা ঈমান ও হিকমত (শরীআতী জ্ঞান) দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। তদ্বারা তিনি তার সীনাটাকে ভরে দেন এবং তার ফাড়া অংশটা ঠিকঠাক করে দেন (বুখারী ১ম খন্ড, ৫৪ পৃষ্ঠা, মুসলিম ১ম খণ্ড, ৯২ পৃষ্ঠা, মিশকাত ৫২৬-৫২৭ পৃষ্ঠা)। তাঁর বুক অপারেশনের কারণে তিনি তন্দ্রালু অবস্থায় যখন কাবা শরীফের নিকটবর্তী হিজর তথা হাত্বীমে ছিলেন তখন জিবরীল তার পায়ে টোকা মারেন। তিনি উঠে বসে কাউকে দেখা না পেয়ে শোবার জায়গায় ফিরে যান। আবার জিবরীল তাঁর পায়ের পাতায় টোকা মারেন। ফলে তিনি উঠে বসেন। এবার জিবরীল তাঁর হাতটা ধরেন। অতঃপর তিনি তার সাথে উঠে দাঁড়ান। তারপর মসজিদুল হারামের দরজার দিকে তিনি রওয়ানা হন। ওখানে একটি সাদা জন্তু ছিল। যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি ছিল। তার দুটি উরুর মধ্যে দুটি ডানা ছিল। যা তার পা দুটির কাছাকাছি ছিল (তফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ৩য় পৃষ্ঠা)। ঐ জন্তুুটির নাম বুরা-ক্। ওর বর্ণনা সা’লাবীর দুর্বলসূত্রে আছে যে, ওর চেহারাটা মানুষের চেহারার মত। ওর পায়ের ক্ষুরটা জন্তুদের পায়ের ক্ষুরের মত। ওর লেজটা বলদের লেজের মত। ওর আগেপিছেটা ঘোড়ার মত। ওকে যখন রাসূলুল্লাহ্র কাছে আনা হয় তখন সে লাফালাফি করতে থাকে। ফলে জিবরীল তাকে ছুঁয়ে বলেন, হে বুরাক! তুমি মুহাম্মদ (স.) দেখে লাফালাফি করো না। আল্লাহ্র কসম! তোমার ওপর এমন কোন ফেরেশ্তা চড়েনি এবং এমন কোন প্রেরিত নবীও সওয়ার হননি যিনি মুহাম্মদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন এবং তিনি আল্লাহর নিকটেও তাঁর চেয়ে মর্যাদাবান হতে পারেন (তফসীরে কুরতুবী, ১০ম খণ্ড, ১৩৬ পৃষ্ঠা) তিরমিযীতে আনাসের বর্ণনায় আছে, তখন বুরাকটি ঘামেতে ভিজে যায়। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আছে, বুরাকটি তখন কাঁপতে থাকে। পরিশেষে সে যমীনে ঠেকে যায়। অতঃপর রসূলুল্লাহ (স.) তাতে সওয়ার হন। নাসায়ীতে আনাসের বর্ণনায় আছে, ঐ বুরাকটিকে অন্য নবীদের জন্যও নিয়োজিত করা হতো। বিশিষ্ট তা-বিয়ী সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, এই বুরাকটি সেই জন্তু, যাতে চড়ে ইবরাহীম নবী (সিরিয়া থেকে মক্কায় তার পুত্র) ইসমায়ীলকে দেখতে আসেন। ঐ বুরাকটির দৃষ্টি যতদূর যেত ততদূরে তার পা পড়তো (ফাতহুল বারী) আনাসের বর্ণনায় ইবনে জারীর বলেন, বুরাকে চড়ার পর রসূলুল্লাহ (স.) জিবরীলের সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে রওয়ানা হন। হঠাত্ রাস্তার একদিকে তিনি একটি বুড়ীকে দেখতে পান। তিনি (স.) বলেন, এটা কে? হে জিবরীল! তিনি বলেন, চলুন, হে মুহাম্মদ! তিনি চলতে থাকেন। আবার রাস্তার ধারে একটি জিনিস তাঁকে ডাকলো, আসুন, হে মুহাম্মদ! তখন জিবরীল তাঁকে বলেন, চলুন, হে মুহাম্মদ! তাই তিনি চলতে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কিছু সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত্ হল। তাঁরা বললেন, আসসালা-মু আলাইকা, হে হা-শির (যাঁর পরে কেউ নেই)। তখন তাঁকে জিবরীল (আ.) বলেন, আপনি সালামের জওয়াব দিন। তাই তিনি সালামের জওয়াব দিলেন। তারপর তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়জনের সাক্ষাত্ পেলেন। তাঁদেরকেও তিনি ঐরূপ বললেন। পরিশেষে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর তাঁর কাছে পানি ও শারাব এবং দুধ পেশ করা হল। তখন রসূলুল্লাহ (স.) দুধটাকে গ্রহণ করলেন। অতঃপর জিবরীল আলাইহিস সালাম বলেন, আপনি স্বভাবজাত প্রকৃতিকে পেয়ে গেছেন। আপনি যদি পানিটা পান করতেন তাহলে আপনি ডুবে যেতেন এবং আপনার উম্মতও ডুবে যেত। আর আপনি যদি শরাব পান করতেন তাহলে আপনি পথভ্রষ্ট হতেন এবং আপনার উম্মতও বিভ্রান্ত হয়ে যেত। তারপর জিবরীল বলেন, সেই বুড়ীটা যাকে আপনি রাস্তার ধারে দেখেছিলেন সে হচ্ছে পৃথিবীর সেই অংশ যতটা বয়স এই বুড়ীটার বাকী আছে। আর সে চেয়েছিল যে, আপনি তার প্রতি আকৃষ্ট হন। সে ছিল আল্লাহর দুশমন ইবলীস। সে চেয়েছিল যে, আপনি তার দিকে ঝুঁকে যান। আর যারা আপনাকে সালাম দিয়েছিলেন তারা হলেন ইবরাহীম এবং মুসা ও ঈসা (আ.) (তাফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ৫ম পৃষ্ঠা)। হাফেজ ইবনে কাসীর বলেন, এর কোন কোন শব্দে আপত্তি এবং অভিনবত্ব আছে (তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ৬ষ্ঠ পৃষ্ঠা)। মুসনাদে বাযযার ও ত্ববারানীতে এবং বাইহাকীর দালা-য়িলুন নুবওঅতে শাদ্দাদ ইবনে আওসের বর্ণনায় আছে যে, রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, যখন আমরা খেজুর গাছওয়ালা একটি যমিনে পৌঁছলাম তখন জিবরিল বলেন, আপনি এখানে নামুন এবং নামায পড় ুন। তাই আমি নামলাম এবং নামায পড়লাম। তারপর আমরা বুরাকে চড়লাম। অতঃপর জিবরিল বলেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় নামায পড়লেন? আমি বললাম, আল্লাহ ভাল জানেন। এবার জিবরিল বললেন, আপনি নামায পড়লেন, ইয়াসরিবে (মদীনা শরীফের পুরাতন নাম) তথা ত্বইবাতে। নাসায়ীর বর্ণনায় আছে, এটাই আপানর হিজরতের জায়গা হবে ইন-শা-আল্লাহ! অতঃপর বুরাকটি চলতে লাগলো এবং যেখানে তার দৃষ্টি পড়ছিল সেখানে সে তার পা-টি ফেলছিল। তারপর আমরা একটি জায়গায় পৌঁছলাম। জিবরীল আমাকে বললেন, এখানে নামুন এবং নামায পড় ুন। তাই আমি নামলাম এবং নামায পড়লাম। অতঃপর জিবরীল বললেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় নামায পড়লেন? আমি বললাম, আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি বললেন, আপনি মাদ্য়্যান শহরে নামায পড়লেন মূসার গাছের নীচে। অন্য বর্ণনায় আছে, এটা সিনাই পর্বত। যেখানে আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছিলেন। অতঃপর বুরাকটি তার দৃষ্টি পর্যন্ত পা ফেলে চলতে লাগলো। তারপর আমরা একটা জায়গায় পৌঁছলাম। যার সৌধগুলো আমাদের সামনে প্রকাশিত হল। তখন জিবরীল বললেন, এখানে নামুন এবং নামায পড় ুন। তাই আমি নামলাম এবং নামায পড়লাম। তারপর আমরা বুরাকে চড়লাম। অতঃপর জিবরীল বললেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় নামায পড়লেন? আমি বললাম, আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা বাইতুল লাহাম। যেখানে মারয়্যামের পুত্র ঈসা মাসীহের জন্ম হয়েছিল। তারপর বুরাক আমাদের নিয়ে চললো। পরিশেষে আমরা ইয়ামনী দরজা দিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের শহরে ঢুকলাম। [ চলবে ] লেখক :সাংবাদিক ই-মেইল: mzhazadi@yahoo.com