সিকদার আমিনুল হক স্বতন্ত্র ও সম্ভ্রান্ত এক কবি

আমাদের জীবনে বরেণ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি অনেকটা দূরের নক্ষত্রের মতো—তা সে কবি-শিল্পী-বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ কিংবা রাজনীতিক যা-ই হোক না কেন। সংকটে-দুর্বিপাকে আমরা তাঁদের দিকে তাকাই। ভরসা খুঁজি। আমরা চাই অন্ধকারে তাঁরা আলো হোক। সেই আলো আমাদেরও আলোকিত করুক। সে জন্যেই নানা ক্ষেত্রে যাঁরা মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁরা মানুষ হিসেবেও আদর্শস্থানীয় হোক—এ প্রত্যাশা সর্বজনীন। কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এ-কথা আরও বেশি করে প্রযোজ্য। ভালো কবি একই সঙ্গে একজন ভালো মানুষও হোক—এটা সবাই চায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের এ প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যায়। দেখা যায়, কবি হিসেবে যিনি অসাধারণ, মানুষ হিসেবে তিনি খুবই নিম্নমানের। অবশ্য অনেকেই এটা মানতে চাইবেন না। তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে নিম্নমানের মানুষ আবার ভালো কবি হয় কী করে? খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। কিন্তু হয়। নিম্নমানের মানুষও ভালো কবি হয়। উদাহরণ আমাদের চারপাশেই আছে। দরিদ্র বলে আমাদের অবস্থা হয়তো বেশি খারাপ, তবে উন্নত দুনিয়ায়ও এমন উদাহরণের অভাব নেই। কাউকে আহত বা বিব্রত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে এটুকু তো নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে খুবই ভালো একজন কবি—অনেক তাঁর খ্যাতি; অথচ তিনি সমপ্রদায়গত বিভেদে বিশ্বাস করেন। তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করেন পরধর্মে বিশ্বাসী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যে পদলেহন করতে পারেন জঘন্য স্বৈরশাসকের। জলাঞ্জলি দিতে পারেন দেশ ও জনগণের স্বার্থ। এমনকি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে। প্ররোচনা দিতে পারেন স্বজাতির বিরুদ্ধে বিজাতির পরিচালিত ঠান্ডা মাথার গণহত্যাযজ্ঞে। আবার প্রগতিশীলতার পোশাক পরেও প্রতারিত করতে পারেন মানুষকে। আশ্রয় নিতে পারেন শত রকম শঠতার। কবিখ্যাতিকে ব্যবহার করে মেতে উঠতে পারেন আখের গোছানোর কদর্য খেলায়। এ তালিকা অনায়াসে আরও দীর্ঘ করা যায়। তবে তার প্রয়োজন নেই। কারণ যুগে যুগে দেশে দেশে এ ধরনের নিকৃষ্ট স্বভাবের কবি-লেখকের অভাব কখনো হয়নি। কথাটা উল্টোভাবেও বলা যায়। আসলে কবিদের মধ্যে ভালো মানুষের সংখ্যাই যে বেশি তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে আমাদের বক্তব্যকে আরও স্বচ্ছ করার জন্যে জীবনানন্দ দাশের সহায়তা নেওয়া যায়। দৃশ্যত কবি অনেক। তবে জীবনানন্দ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। এখানে জীবনানন্দ যে-ধরনের কবির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—তিনি বা তাঁরাই হলেন প্রকৃত কবি বা ভালো কবি। জীবনানন্দ দাশ নিজেই ছিলেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এ ধরনের ভালো কবির মধ্যে ভালো একজন মানুষকেও পেয়ে যাওয়ার মতো সৌভাগ্য সব সময় হয় না। তবে জীবনানন্দ নিজে ছিলেন মাটির মানুষ। এতটাই ভালো মানুষ ছিলেন যে সমাজে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্যে। হয়ে পড়েছিলেন ‘আউটসাইডার’ : ‘সকল লোকের মাঝে ব’সে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা?/ আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?/ আমার পথেই শুধু বাধা?’—বোধ/ধূসর পাণ্ডুলিপি জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রায় সর্বাঙ্গেই সেই রক্তক্ষরণের মর্মস্পর্শী ছবি আছে। আছে তাঁর উপন্যাসেও। শামসুর রাহমানের মধ্যেও মহত্ মানবিক গুণাবলির সমাবেশ ঘটেছিল। বিশেষ করে ধর্মান্ধতা কিংবা সাম্প্রদায়িকতার মতো কোনো ধরনের কূপমণ্ডুকতা কখনোই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমাদের প্রজন্মের অন্যতম একটি দুর্ভাগ্য হলো, আমরা বেড়ে উঠেছি এমন সব মহত্ ও হূদয়বান মানুষের গল্প শুনে যাঁদের মাথা আকাশ স্পর্শ করত; আর বাস্তবের মাটিতে পা রেখেই আমাদের দেখতে হয়েছে সারি সারি বামনের মুখ। অনেকটা গালিভারের লিলিপুট-দর্শনের মতো। আকারে বামন হলেও আচরণের দিক থেকে কেউ কেউ বানরের সমগোত্রীয়। এমনকি এতকাল যে-বদনাম রাজনীতিকদের একচেটিয়া ছিল, আমরা কবি-লেখকদেরও সেখানে ভাগ বসাতে দেখলাম। বলা হয় যে রাজনীতিকরা বহুরূপী। তারা ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাতে পারেন। কিন্তু কবিরাও যে কম যান না—তাও আমরা স্বচক্ষে দেখলাম পঁচাত্তরপরবর্তী বাংলাদেশে। আগেও যে দেখিনি তা নয়, তবে এত বীভত্সভাবে অবশ্যই নয়। মানবেতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও কাপুরুষোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পক্ষাবলম্বন করতে দেখেছি আমরা কবিদের একটি অংশকে। তার মধ্যে এমন কবিও ছিলেন যিনি উভয় বাংলায় ভালো কবি হিসেবে স্বীকৃত ও সমাদৃত। শুধু পক্ষাবলম্বনই নয়, নিষ্পাপ নারী ও শিশুর এ-হত্যাযজ্ঞকে পুঁজি করে ফায়দাও লুটেছেন অনেকেই। যে-স্বৈরশাসক ভণ্ড ও ‘বেহায়া’ হিসেবে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাঁর কাছ থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা ধরনের সহায়তা গ্রহণ করেননি—এমন কবি-লেখকের সংখ্যা হাতে গোনা। আবার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পোশাক পাল্টিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্যে মাতম করে কতিপয় কবি যা করেছেন এবং করছেন তাতে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। সিকদার আমিনুল হক কবি হিসেবে স্বতন্ত্র একথা অনেকেই বলেছেন। বাংলা ভাষার ভালো কবিদের সারিতে তাঁর আসন যে পাকা হয়ে গেছে—তা নিয়েও দ্বিমত নেই। (সম্প্রতি এ নিয়ে আমিও একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছি—যা তাঁর একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আগামীকাল বিকেলে গণগ্রন্থাগারের সেমিনার হলে অনুষ্ঠিতব্য সেমিনারে উত্থাপিত হবে। অতএব, এখানে তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।) সিকদার আমিনুল হক মানুষ হিসেবেও যে কতটা স্নিগ্ধ, স্বতন্ত্র ও সম্ভ্রান্ত ছিলেন সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্যেই এ লেখার অবতারণা। এ এক বিরল সমাবেশই বলা চলে। অগ্রজ কবি ফজল শাহাবুদ্দীন বলেছেন, ‘সিকদার আমাদের ভদ্রলোক কবিদের প্রধান।’ রসিকতা করে বলা হলেও কথাটি সত্য। সকল অর্থেই পরিশীলিত ও উচ্চমাত্রার মানবিক গুণসম্পন্ন এক ভদ্রলোক ছিলেন তিনি। অসাধারণ এক সম্মোহন ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের। বন্ধুরা তো বটেই, অগ্রজ-অনুজ সকলেই একবাক্যে তা স্বীকার করেছেন। তাঁকে যারা কাছে থেকে দেখেছেন তারা এ-শূন্যতা সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না। আহমাদ মাযহার লিখেছেন :‘কবি হিসেবে তিনি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তা হয়তো দীর্ঘকাল ধরে আবিষ্কৃত হবে; কিন্তু এ কথা বলা যায় যে মানুষ হিসেবে তিনি যেমন স্নিগ্ধ ও রুচিবান ছিলেন তেমনটা আমাদের সমাজে ক্রমশ বিরল হয়ে পড়ছে। সামগ্রিকভাবে তাঁর ব্যক্তিত্ব আমাদের যেভাবে আলোকিত করতো তেমনটি করার মতো মানুষের অভাব আমাদের মতো তরুণতর প্রজন্ম যে অনুভব করবে তা ভেবে গভীর বেদনায় বিষণ্ন হয়ে পড়ছি।’ (মৃত্যুপরবর্তী নাগরিক শোকসভার ‘স্মারক সংকলন’ : ২৭ মে ২০০৩)। শোনা যেতে পারে অনুজ কবি কামাল চৌধুরীর সাক্ষ্যও : ‘ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কিছুটা নিভৃতচারী, সেই সঙ্গে রুচিবান ও মননশীল একজন মানুষ। আধুনিক জীবনদৃষ্টি, তীক্ষ পর্যবেক্ষণ শক্তি, উপলব্ধি ও বাকভঙ্গির ভিন্নতায় তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ও শুদ্ধাচারী এক কবিসত্তা। সমকালের ইঁদুর দৌড় ও কোলাহল থেকে দূরে ছিলেন—কবিতাকে কখনো করেননি সস্তা খ্যাতির অবলম্বন।’ (ঐ) যারা তাঁকে কাছে থেকে দেখেননি—সুযোগ হয়নি তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার—তাঁদেরও সমীহ আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন : ‘সিকদার আমিনুল হকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুযোগ ঘটেনি; কেন যে ঘটেনি তা এখন বুঝি যখন তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। তিনি ভিড় করতেন না, ভিড়ের মধ্যেও থাকতেন না। একটা নিঃসঙ্গতা ছিল তাঁর ভেতর, রোমান্টিক কবিদের যেটা থাকে। সিকদারের ভাষা ও উপমা তাঁর নিঃসঙ্গপ্রবণতার কথা বলতো; কার্নিশ, বারান্দা, রুমাল, ইলেক্ট্রা, কাফকা, প্রাচীর, পাত্রে জল, অন্ধকার—এরা খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে তাঁর কবিতায়।’ (ঐ) অধ্যয়ন নয় অধ্যবসায় নয় আত্মবিনাশী তপস্যাও নয়—এদেশে শঠতা, সংঘবদ্ধতা ও ক্ষমতার পদলেহনই যে সর্বপ্রকার সাফল্যের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে তা তাঁর মতো করে কিংবা তাঁর চেয়ে ভালো আর কেই-বা জানত। কারণ তিনি যে সময়ের কবি—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষবৃক্ষের বীজটি উপ্ত হয়েছিল তখনই। সেটা বেড়ে উঠতে সময় লাগেনি। পরে ক্রমশ পচে যাওয়া সমাজ ও রাজনীতির অনুকূল আলো-হাওয়ায় ডালপালা বিস্তার করে তা এখন সূর্যের পথ রোধ করতে উদ্যত হয়েছে। সমকালের এ গড্ডলপ্রবাহে গা না ভাসানোর পরিণতি সম্পর্কেও তিনি জানতেন। এর ভয়াবহ পরিণামও ভোগ করতে হয়েছে তাঁকে। এ রকম অজস্র তিক্ত অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে একটি দৃষ্টান্তও তুলে ধরেছেন তিনি। সেটি তাঁর জবানিতেই শোনা যাক : ‘জানো, ‘রোববার’ একবার বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরের বারো বছরের সাহিত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ইত্যাদির ওপর একটি বিশেষ সংখ্যা করেছিল। সেখানে বাংলাদেশের কবিতার ওপর প্রবন্ধ লিখেছিলো (কিংবা তাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন সম্পাদক) এক তরুণ। বিশ্বাস করবে, বগুড়া, বরিশাল এরকম ছোট জায়গার কবিদের নাম সেখানে থাকলেও, কবিদের দীর্ঘ তালিকায় আমার সামান্য নামটা পর্যন্ত ছিলো না। ঢাকার অনেক অল্পখ্যাত কবিদের ছবি, পরিচিতি প্রতি পৃষ্ঠায় বক্স করে ছাপিয়েছে সম্পাদক। এবং সে-সম্পাদক আবার আমার বন্ধুও। ঢাকার প্রথম কবিবন্ধু।’ (পূর্ণতা, এপ্রিল-মে ১৯৯৫)। সিকদার আমিনুল হক বেঁচে থাকলে দেখতেন—গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের তাবত্ কবিকুলই এখন তাঁর সেই কবিবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। সব জেনেও তিনি শুধু যে সংঘ ও দলবাজি থেকে শতহাত দূরে ছিলেন তা-ই নয়, এ নিয়ে এক ধরনের বিবমিষাও ছিল তাঁর মধ্যে। তিনি লিখেছেন :‘একা থাকার স্বভাব নিয়ে আমি জন্মেছি, দলের অনাচার ও কোলাহলে আমি বর্তমানে সত্যি বলছি, অসুস্থ। দল করলেই নিজের কিছু অন্যায় এবং অন্যের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেই হবে। যা বিশ্বাস করো না তা তোমাকে উচ্চারণ করতে হবে— নিতান্ত অর্বাচীনের ভাঁড়ামি ও চিত্কারে সাড়া দিতে হবে।’ (ঐ)। একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না শঠতা, কপটতা ও নীচতা। বিশেষ করে কবিদের মধ্যে এ ধরনের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তাঁকে প্রবলভাবে পীড়িত করত। তাঁর জীবনে এবং কবিতায় তো বটেই, এমনকি তাঁর ব্যক্তিত্বেও এর প্রতিফলন ছিল ব্যাপক ও গভীর। ‘জলবায়ুর পক্ষে শ্রেষ্ঠ পানীয় আমি পান করি। আমার পোশাক বিশদভাবে সংগ্রহ করা। আমি স্থূল আর নোংরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলিনি। যাদের নখের নীচে ময়লা, অন্য জাতিদের ঘৃণা করে, আমি দেখেছি তাদের কল্পনা আর স্বপ্নও সেরকম দুর্গন্ধময়।’ (সতত ডানার মানুষ)। তাঁর এ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের কারণেই সম্ভবত এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে পড়েছিল যে তিনি বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী। অতএব, তাঁর কোনো চাকরি-বাকরির প্রয়োজন নেই। অপরিচিত বা স্বল্পপরিচিতরা তো বটেই, এমনকি তাঁকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন তারাও এমন ধারণা পোষণ করতেন। এমনকি শামসুর রাহমানও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি লিখেছেন : ‘মানুষের কল্যাণ এবং প্রগতি কামনা করলেও সিকদার আমিনুল হক রাজনীতি থেকে নিজেকে শত হস্ত দূরে রাখতেন। সব সময় তিনি ছিলেন সংঘবিমুখ। গত পনেরো বছর তিনি লেখালেখি ছাড়া অন্য কিছু করেননি। এর ফলে তাঁর কোনো অসুবিধা হয়নি। সব সময় সচ্ছল জীবনযাপন করেছেন। অর্থ উপার্জনের জন্য কখনো মাথা ঘামিয়েছেন বলে শুনিনি।’ (স্মারক সংকলন, প্রাগুক্ত)। সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে এ ধরনের ভুল ধারণা আরও আছে। তার মধ্যে এটিই যে সবচেয়ে ট্র্যাজিক তাতে সন্দেহ নেই। জীবনের অধিকাংশ সময় অর্থকষ্ট তাঁকে কুরে কুরে খেয়েছে। চাকরির জন্যে উন্মুখ ছিলেন। কিন্তু প্রখর আত্মমর্যাদা বোধের কারণে সেটা কাউকে বুঝতে দেননি। ধরনা দেননি কারো দুয়ারে। তাঁর বন্ধু ও সতীর্থদের অনেকের অঢেল থাকা সত্ত্বেও তাদের মুখে সর্বক্ষণ যে ‘নাই নাই’ বা ‘দাও দাও’ রব শোনা যেত—সিকদার আমিনুল হকের জাত ও ধাত সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল বলে তিনি প্রায়শ এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন। কবি পরিচিতি বা খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে তাঁর সহযাত্রীদের অনেকে কোটি কোটি টাকার প্লট নিয়েছেন রাজধানীর অভিজাত এলাকায়। নিয়েছেন দেশেবিদেশে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরি। এ ক্ষেত্রে নীতি-আদর্শের বাছবিচার করেননি কেউই। কিন্তু সিকদার আমিনুল হকের সেই সুযোগ ও যোগ্যতা অন্য যে কারো চেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও তিনিই সম্ভবত একমাত্র কবি যিনি এ ধরনের কোনো সুযোগ বা আনুকূল্য গ্রহণ করেননি। এখানে বলে রাখা ভালো যে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল সিকদার-দম্পতির। কখনোই তা ক্ষুণ্ন হয়নি বা হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন, তখনই সিকদার আমিনুল হকের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে কঠিন কালবৈশাখী। তিনি চাইলেই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে পারতেন। নিতে পারতেন যেকোনো সুবিধা; —পদক-পুরস্কার তো তুচ্ছ। কিন্তু দুঃসময়ের পীড়নে পিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা করেননি। বিরল আত্মমর্যাদাবোধই যে তাঁকে সে-পথ মাড়াতে দেয়নি তা না বললেও চলে। আত্মবিক্রয়ের একালে এমন আত্মমর্যাদাবোধ কেই-বা সহ্য করবে? কেউ যদি আলাদা হতে চায় তার মূল্য তো তাকে দিতেই হবে কড়ায়গণ্ডায়। সিকদার আমিনুল হকের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। শুধু যে ভয়াল নিঃসঙ্গতার চাবুকে রক্তাক্ত হতে হয়েছে তা-ই নয়, অর্থাভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে তাঁর চিকিত্সাও। তবে প্রকৃত কবি যাঁরা তাঁরা এসবের পরোয়া করেন না। সিকদার আমিনুল হকও করেননি। তাঁর ভাষায় : ‘কবিতা বলো, শিল্প বলো— একটা দীর্ঘ ভ্রমণ। একদিন দুদিনের ঝড়-বৃষ্টির ব্যাপার নয়। তুমি শেষ পর্যন্ত চূড়ায় উঠতে পারলে কিনা সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন, সেটাই তোমার প্রাপ্তি। উত্পীড়ন, উপেক্ষা, অবহেলা— এগুলি থেকে প্রেরণা পাওয়ার শক্তিকেই বলবো, প্রতিভার শক্তি। (পূর্ণতা, প্রাগুক্ত)। কোনো আত্মদানই বৃথা যায় না। আজ না হোক কাল স্বাতন্ত্র্যের মুকুট তাঁর শিরে শোভা পাবেই। জীবনানন্দের মতো সেটা দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হবে না। তবু ভাবতে খুব ভালো লাগে যে এমন সম্ভ্রান্ত একজন কবির স্নেহ, ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব পাওয়ার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। একজন সামান্য মানুষ হিসেবে এ সামান্য জীবনে এই অসামান্য প্রাপ্তিকে আমি যক্ষের ধনের মতো বুকে আগলে রাখি।