মঈনুল আহসান সাবেরের উপন্যাস ‘আখলাকের ফিরে আসা’
জীবন মৃত্যু অথবা মৃত্যুঞ্জয়ী
প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৪, ২০:৩৪
আখলাকের ফিরে আসা
মঈনুল আহসান সাবের
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক : দিব্যপ্রকাশ
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৪
মূল্য : ১৫০ টাকা
‘নিজের মৃত্যু আখলাক বুঝতে পারলো না’—আপাত সরল এই বাক্যটি দিয়ে শুরু হয়েছে মঈনুল আহসান সাবেরের ‘আখলাকের ফিরে আসা’ উপন্যাস। বাক্যটিকে খুব সাদামাটা কোনো কাহিনির সূচনা মনে হলেও, আদতে তা নয়। আখলাক নামের যে ব্যক্তিটির মৃত্যুর কথা নিয়ে লেখক পাঠককে তাঁর গল্পের জগতে আহ্বান করেন, সেই গল্পের সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকলে নিমেষেই চেতন-অবচেতন জগতের কারুকার্যময় এক অপূর্ব দুয়ার হাট হয়ে খুলে ডাকে—আয়। পাঠক সে জাদুমন্ত্রের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারে না। আর সাড়া দেওয়া মাত্রই আবিষ্কারের উত্তেজনা নেশার মতো তাদের পেয়ে বসে।
কী সেই আবিষ্কার? আখলাক কে, কেন কীভাবে সে মারা গেল? কাহিনি খুঁড়ে পাঠক কি খুঁজে দেখতে চান—আখলাক কি আসলেই মৃত না জীবিত? নাকি অন্য কোনো পিপাসা তাদের অতৃপ্ত আত্মার বহরে ছুটিয়ে নিয়ে চলে?—এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আপনাকে আপনার জীবনের দিকে তাকাতে হবে। তারপর জীবনের বাইরে এসে দেখতে হবে আগের রংটির সাথে এবারকার দেখার রংটির কোনো পার্থক্য আছে কিনা! জীবিত অবস্থায় জীবনের ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকাটা খুব দুরূহ কাজ। সাধারণ মানুষের সবাই তা পারে না। কিন্তু লেখক যখন শব্দ শানিয়ে ঈশ্বরের মতোই শক্তিমান হয়ে ওঠেন তখন তাঁর জন্য কোনোকিছুই আর অসম্ভব থাকে না। প্রকৃত হস্তশিল্পীর মতোই তিনি তাঁর চরিত্রগুলোকে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দেন যে, বাস্তবের মানুষেরা তাঁর কাছে নিছক একটি ভাগ্যনির্ভর যান্ত্রিক পুতুল বলে মনে হয়।
আখলাকের ফিরে আসা-তে আখলাক নামের কেন্দ্রীয় চরিত্রটিও লেখকের হাত ধরে গড়ে ওঠা তেমনই একটা চরিত্র। আমাদের মধ্যবিত্তের ধূলিধূসর সমাজে ছাপোষা জীবনের বোঝা বয়ে বেড়ানো মানুষের একজনই হয়তো আখলাক। কিন্তু লেখক তাঁর জীবনের ভাঁজ খুলে খুলে বাস্তবের মানুষকে টেক্কা দিয়ে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন যে, আখলাকের উপলব্ধির দৃষ্টি আমাদের চেয়েও প্রখর। সূর্য ওঠা এবং ডুবে যাওয়ার মতো আমাদের প্রাত্যহিক যে জীবন, তার নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো অনেক অজানা সম্পর্কের খোলা প্রান্তর। এই প্রান্তরে আমরা কখনো হাঁটি না বা বয়ে চলা জীবনের মোহ কাটিয়ে নিজের জীবনকে উল্টে পাল্টে দেখার মতো সাহসী আমরা নই। তাই ক্রমশ আমরা জীবনবিমুখ হয়ে পড়ি। জীবিত থেকেও মৃতের মতো বহন করি জীবনের সমস্ত লেনাদেনা। টি এস এলিয়টের সেই হলোম্যানের মতোই আমাদের ওপরের লোক দেখানো জীবনের ভেতরটা ফাঁপা।
আখলাককে আমাদের সেই ফাঁপা জীবনের জীবন্ত ছায়া বলা চলে। স্ত্রীর সাথে তুচ্ছ ঝগড়ার জেরে সে উদ্দেশ্যহীন বেড়াতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ে যায়। ছিনতাইকারীর ছুরি তাকে এফোঁড়ওেঁফাড় করে দিলে, সে কি মারা যায়? নাকি সবই তার কল্পনা, ফাঁপা জীবন থেকে মুক্তির স্বপ্নাচ্ছন্ন চিন্তাভাবনা? এরকম চিন্তা তো আমরা প্রায়ই করি, তাই না? নষ্ট সময়, নিথর সম্পর্কের চাপে নুয়ে পড়া জীবনকে যেনতেনভাবে ছুঁড়ে ফেলে হালকা হতে চাই! বেশিরভাগ কাহিনিতে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা—এই প্রশ্নের উত্তর পেতে খুব একটা দেরি হয় না। কিন্তু আখলাকের ফিরে আসা নিয়ে যে প্রশ্নের অবতারণা, তার উত্তর পেতে আমাদের কাহিনির শেষ শব্দটি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার এই সময়টুকুতে আমরা দেখতে পাই, আখলাকের মনের ভেতর কীভাবে সম্পর্কের টুকরো টুকরো দৃশ্যে গেঁথে জোড়া লেগে তৈরি হচ্ছে সমান্তরালে বয়ে যাওয়া আরেকটা জীবনের স্রোত। এই স্রোত আখলাকের নিজের কাছেই অচেনা। নিজের নিরাশাবাদী ফাঁপা জীবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে, আশার সেই তুমুল নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছাই আখলাককে আমাদের থেকে আলাদা করে দেয়। নিজের ভেতরে পুষে রাখা দৈনন্দিন দ্বন্দ্ব, যার গোলকধাঁধা থেকে আমরা কখনো বের হতে পারি না, ধুঁকে ধুঁকে সম্পর্কের সন্দেহময় অন্ধকারে ক্ষয় হয়ে পচে গলে যাই, সেই কানাগলি থেকেই শেষ পর্যন্ত সে তার জীবনের প্রাণ খুঁজে পায়।
আর তাই, আখলাকের দৈহিক মৃত্যু হয়েছিল কি হয়নি ছাপিয়ে আখলাকের কাহিনিতে মানুষের জীবনদর্শনটাই পাঠকের কাছে বড় হয়ে ওঠে। নির্মম বোঝার মতো বয়ে চলা জীবনকে কীভাবে নিজের মুখোমুখি করা যায়, আখলাকের ফিরে আসা-তে আখলাকের সদা ক্রিয়াশীল মনোজগত্, আমাদের সেই চিন্তার খোরাক জোগায়। সেই অর্থে, জীবন মৃত্যু স্বপ্ন এবং ভালোবাসায় চেতনার অন্তঃপ্রবাহের ভেতর দিয়ে নিজের সাথে নিজের কথোপকথনে আখলাক আমাদের জানিয়ে দেয় যে, জীবনের দিকে খানিকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে জীবনের শিরা উপশিরায় রক্তপ্রবাহ স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
সন্দেহ নেই যে, চিন্তা এবং উপস্থাপনের দিকে দিক দিয়ে আখলাকের ফিরে আসা একটি ভাবজাগানিয়া আধুনিক উপন্যাস যেখানে আখলাক আধুনিক মানসের প্রতিভূ। চমকপ্রদ কাহিনির পাশাপাশি সময়ঘনিষ্ঠ শব্দ, খাপখোলা বাক্য এবং দুর্দান্ত দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে মঈনুল আহসান সাবের এই উপন্যাসে ঝকঝকে এক আয়না তুলে ধরেছেন। যে আয়নায় আধুনিক পাঠক মুখ রাখা মাত্রই নিজেকে স্পষ্টভাবে চিনতে পারবেন।