সিকদার আমিনুল হক

পাশ্চাত্যপীড়িত কবি

সময়টা বিশ্বায়নের। আর কবিতার অনুষঙ্গে যে তার বহুরৈখিক ছাপ পড়বে সেটিই হয়তো বৈশ্বিক কাব্যপ্রতিবেশের দাবি। ফলে আধুনিকতাবাদী বাংলা কবিতায় দেখা যায় এক বহুজাতিক সুর—যেখানে কখনো বা অনায়াসে বেজে যায় পাশ্চাত্যের বিভোর বেহালা—আবার কখনো বা বেজে ওঠে প্রাচ্যের মন্দ্রিত লহরির মন্দ্রসপ্তকীয় ঘোর। আর এই আন্তর্জাতিকতামনস্ক অর্কেস্ট্রিয় মূর্চ্ছনা এখন বলা যায় কবিতার এক অন্যতম অনুষঙ্গ। তবে শুধু এখনকার এই গ্লোবালাইজড ভূমণ্ডলেই নয়—সেই ত্রিশের দশক থেকেই—আমাদের কবিরা খুঁজে ফিরেছেন এক ভ্রামণিক কণ্ঠস্বর। তখন থেকেই পৃথিবীর বহুরৈখিক পথের রূপকল্প তাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে—যেখানে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র খুঁজে ফিরেছেন ঘাসের ঘাগরাপরা হাওয়াই দ্বীপের ছায়াবরণ সুন্দরীদের—সেটা দেখেছেন তাঁর দিব্যচোখে—ভিনদেশি টহলদারের ক্যামেরা-কলুষিত চোখে নয়! আবার জীবনানন্দ তো খোদ কবিতাতেই পরিভ্রমণ করে ফেলেছিলেন পৃথিবীর হাজার বছরের পথরেখা—সেটি কখনো বা বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে—আবার কখনো সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে! আর এই আন্তর্জাতিকতা—বলা যায়—আধুনিকতাবাদী বাংলা কবিতায় চলে এসেছে শুরু থেকেই। বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় কবি হুমায়ুন আজাদ তাঁর সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার মুখবন্ধে যা তুলে ধরেছেন এভাবে—‘আধুনিকতাবাদের চারিত্র হচ্ছে সাহিত্যসংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রথাগত রাষ্ট্রসীমা ভেঙে ফেলা, এর স্বভাব আন্তর্জাতিকতা। প্রত্যেক কালেরই থাকে নিজস্ব স্বভাব ও সংবেদনশীলতা, তখনই আমরা একটি ভিন্ন কালে পৌঁছি যখন বদল ঘটে ওই স্বভাব ও সংবেদনশীলতার। এমন বদল নিয়মিত ঘ’টে চলছে সাহিত্য, শিল্পকলা, চিন্তার ইতিহাসে। কয়েক দশক পরপর—সাহিত্য, শিল্পকলা, চিন্তার এলাকায় ঘটে সংবেদশীলতার পরিবর্তন, আর আমরা এক শিল্প, সাহিত্য, চিন্তা থেকে, পৌঁছি আরেক শিল্প, সাহিত্য, চিন্তায়। তবে এ-পরিবর্তনগুলো একই মাত্রার নয়, সংবেদনশীলতা বদলের তিনটি মাত্রা চোখে পড়ে। প্রত্যেক দশকে প্রত্যেক প্রজন্ম একধরনের বদল নিয়ে আসে সংবেদনশীলতার, নিয়ে আসে প্রজন্মের দশকি ফ্যাশন; তা প্রজন্মের সাথে আসে আর তারই সাথে চ’লে যায়, এক দশক তার আয়ু। এ-বদল কেনো মৌল বদল নয়। এর চেয়ে বড়ো মাত্রার বদল ঘটে কয়েক প্রজন্ম, সাধারণত এক শতাব্দী ধ’রে, যাতে ঘটে সংবেদশীলতা ও রীতির গভীরতর ও ব্যাপক বদল, যা স্থায়ী হয় দীর্ঘ কাল ধ’রে। এ-বদল বেশ বড়ো মাত্রার; এটা সংবেদনশীলতার শতকি পরিবর্তন। কখনো কখনো সংবেদনশীলতার ঘটে এর থেকেও অনেক বড়ো মাত্রার বদল, বিশাল বদল, সহস্রকে দু-একবার; ঘটে সংস্কৃতির ভয়াবহ ভাঙাগড়া, যার ফলে মহত্ চিরস্থায়ী ব’লে গণ্য কীর্তিগুলোও হঠাত্ ধ’সে পড়ে, অতীত পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে, মহত্ সমাধিক্ষেত্রে।’ আর এই আন্তর্জাতিকমনস্কতা কবি সিকদার আমিনুল হকের কবিতার এক অনন্য স্বরূপ—যা তাঁর কবিতাকে ষাটের দশকের অন্যান্য কবিদের চেয়ে করে তুলেছে একেবারেই আলাদা; অনেক কবিতার ভিড়ে সহজেই চিনে নেয়া যায় এই পাশ্চাত্য অনুষঙ্গে ঠাসা ফ্যাশনধর্মি-অভিজাত-ভ্রামণিক-ইন্দ্রিয়আচ্ছন্ন কণ্ঠস্বরকে। ফলে সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় উঠে এসেছে নানাবিধ ভ্রামণিক টুকরো টুকরো উপকরণ—যাতে সাবলীল দেখা যায় সেজানের ছবি, কাফকার জামা, হিস্পানি রুমাল, তাহিতির মেঘ, নৈশ বুলভার, শ্লেজ গাড়ি, ভেনিসের রাত্রি, এস্কিমো টুপি, আফ্রিকার যুবতীর ওষ্ঠ, গ্রিসের বসন্ত, ম্যানহাটনের ঝলমলে রাস্তা, ফ্লানেলের জামা, শাগাল ও পিকাসোর ছবি, ফার্নেসের লাল, মেক্সিকোর উত্কট মদিরা—এ রকম আরও বহুবিধ পাশ্চাত্যঘেঁষা অনুষঙ্গ। সিকদার আমিনুল হক যেন অনেকটা তাঁর কবিতাতেই পরিব্রাজক হয়ে ঘুরে ফিরেছেন পৃথিবীর পথে পথে—বিচিত্র ও বর্ণিল সব ভূখণ্ডের রসাস্বাদন করে তাঁর নির্যাস ছড়িয়ে দিয়েছেন কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে :‘কেন যে এখানে এসে রোজ বসি একই জানালায়/ হাতে রেখে উগ্র পাত্র!—যে-নগর নয় বণিকের/ গড়া; হংকং, সিঙ্গাপুর কিংবা নয় দ্বীপ তাহিতির/ মতো; তাকে দেখি মৃত, আলোহীন, কৃষ্ণ ছায়াচ্ছন্ন।/ তথাপি আমার এ-শহর !—যাকে ছাড়া অন্ধকার/ লাগে আত্মপরিচয়। ... যদিও এখানে সেই ঠাণ্ডা/ পথ কিংবা বুলেভার। পার্ক গৌণ ; নদী নয় সিন/ অথবা ড্রিনার মতো হাস্যোজ্জ্বল। এর অধিবাসী/ অধিকাংশ ম্লান কেরানির মতো ঘরে ফেরে রাত্রে,/ প্রায়শ পাজামা পরা। কার্নিভাল অথরা রুলেত্/ টেবিল দেখেনি ইহজন্মে,— তাই লাম্পট্যও নেই ;/ নয় ব্যাধ, রাত্রি আর জঙ্গলের !—বাসে বাড়ি ফিরে/ এখন খাদ্যের গন্ধ আর আঁশটে বউ নিয়ে সুখী।’ (পানশালার জানালা থেকে হাসপাতালের বারান্দা) সিকদার আমিনুল হকের এই পাশ্চাত্যমোহগ্রস্ততা অনেক সময়ই পাঠকের মগ্নচৈতন্যে ছড়িয়ে দেয় এক আরণ্যিক ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ দৃশ্যকল্প—পাঠকের সংবেদনে ঘটতে থাকে ইন্দ্রিয়ের অনন্ত আলোড়ন :‘আমার শরীরে এলো! আমি সেই লোক, বন্দরের/ নীল জলে দেখতাম বহু সন্ধ্যা। ঘন কালো চুলে/ চিরুনি বুলিয়ে, শেষে নামতাম টায়ার বা গ্রীসে ;/ বসন্তের রাত্রি খুব জব্দ করা; মদ—মাংসই নয়,/ কামুক ডাইনি লাগে নাবিকের।... সময়ের পাপ/ গর্তে ঢোকে কাঁকড়ার মতো। আমি ভয়ঙ্কর গন্ধ/ কিছুতেই আর নেই। ঝুলিতে রয়েছে তাজা স্মৃতি/ ওক গাছ আর গুহা।/ (কাফকার জামা) দূরের কার্নিশ, তিন পাপড়ির ফুল, পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা, আমি সেই ইলেক্ট্রা, বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকারে, পাত্রে তুমি প্রতিদিন জল, এক রাত্রি এক ঋতু, সতত ডানার মানুষ, সুপ্রভাত হে বারান্দা, কাফকার জামা, সুলতা আমরা এলসা, রুমালের আলো ও অন্যান্য কবিতা, লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো—এ সব কাব্যগ্রন্থেই সিকদার আমিনুল হকের কাব্যপ্রতিবেশ ছিল অনেকটা একই রকম—আন্তর্জাতিকমনস্কতার বলয় থেকে তিনি আর কখনোই বের হতে পারেননি—বলা যায় এটিই তাঁর পাশ্চাত্যমোহগ্রস্ত-ফ্যাশনদুরস্ত-অভিজাত কণ্ঠস্বর—যা হয়তো মহাকালিক প্রেক্ষাপটেও ছড়িয়ে দেবে তাঁর কবিতার চকমকি আভা।