মেঘনায় লঞ্চডুবি ১২ লাশ উদ্ধার

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরের কাছে মেঘনা নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে তিনশ’ যাত্রী নিয়ে ডুবে গেছে একটি লঞ্চ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত শিশু ও নারীসহ ১২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এছাড়া জীবিত অবস্থায় তীরে উঠতে পেরেছেন আরও অর্ধশতাধিক যাত্রী। শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের উদ্দেশে দুপুর ১টার দিকে ঢাকার সদরঘাট থেকে এমভি মিরাজ-৪ নামের ওই লঞ্চটি ছেড়ে আসে। এদিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ ও ‘দুর্বার’ সন্ধ্যার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ৮০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকা লঞ্চটি সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপরই শুরু হয় উদ্ধার তত্পরতা। লঞ্চ থেকে উদ্ধার পাওয়া যাত্রীরা দাবি করেছেন- অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও লঞ্চ চালকের ভুলের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। লঞ্চটির উদ্ধার পাওয়া যাত্রীদের অধিকাংশই কমবেশি আহত বলে জানা গেছে। কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি হলেও বাকিরা মেঘনা তীরেই স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছেন। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে নিখোঁজদের স্বজনরা ঘটনাস্থলে আসতে শুরু করেছেন। তাদের আহাজারিতে মেঘনার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চটির কেরানি দোলন মিয়া (৪৩) সাঁতার কেটে নদীর পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। তবে লঞ্চের সারেং জীবিত না মৃত তিনি কিছুই জানেন না। দোলন জানান, আনুমানিক বেলা ৩টায় হঠাত্ ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি। কিছু বুঝার পূর্বেই লঞ্চটি বাম দিক কাত হয়ে ডুবে যায়। লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রী মোবারক হোসেন জানান, তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ঢাকা থেকে বাড়ী যাওয়ার পথে লঞ্চে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া লঞ্চে বাড়ী ফিরছিলেন শরিয়তপুর নড়িয়া থানার পাঁচগাঁও গ্রামের লিটন মিয়া (৪২), স্ত্রী টুম্পা (২৬), ছেলে সুমন (৮) ও মাহিন (৪)। স্ত্রী টুম্পা ও ৪ বছরের ছেলে মাহিন লঞ্চ ডুবিতে মারা গেছে। লিটন মিয়া স্ত্রী সন্তান হারিয়ে পাগলপ ায়। সুরেশ্বর গ্রামের হোটেল ব্যবসায়ী জামাল সিকদার (৫৫) ও তার ছেলে আবিদ সিকদার (২৮) এর লাশ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। নড়িয়া থানার রাহা পাড়া গ্রামের দুবাই প্রবাসী আখন্দের স্ত্রী সেতারা বেগম (৫৫) এর লাশ উদ্ধার হয়েছে লঞ্চের ভিতর থেকে। এছাড়া হযরত আলীর (৫০), অজ্ঞাত পুরুষ (৬০) মুখে দাড়ি আছে, অজ্ঞাত শিশু (২), অজ্ঞাত মহিলাসহ (৫৬) আরো তিনটি লাশ উদ্ধার করেছেন কর্মীরা। নৌ পরিবহনমন্ত্রী মো. শাহজাহান খান, স্থানীয় এমপি এডভোকেট মৃনাল কান্তি দাস, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহ তালুকদার, অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জের ডিসি সাইফুল হাসান বাদল ও নারায়ণগঞ্জের ডিসি মো. আনিছুর রহমান মিঞা দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ তদারিক করছেন। উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়’র পেটি অফিসার এম এইচ এ মাসুদ জানান, ৮০ ফুট পানির নিচে কাত অবস্থায় পরে থাকা লঞ্চটি সনাক্ত করা হয়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে লঞ্চটি টেনে তোলা হবে। এটি করতে রাত ১২টা বাজতে পারে। তিনি জানান, ১২০ ফুট দীর্ঘ ও ৩৫ ফুট প্রস্থের দ্বিতীয় তলার লঞ্চটির আনুমানিক ওজন ১১০ টন। তবে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ের ধারণ ক্ষমতা ২৫০ টন। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে লঞ্চটি উদ্ধার এবং স্বজনদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার এ এস এম সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, লঞ্চ ডুবির সংবাদ পেয়ে যাত্রীদের স্বজনরা নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর লঞ্চঘাটে এসে ভিড় জমাচ্ছেন। তারা নিজ উদ্যোগে ট্রলার ভাড়া করে গজারিয়ার উদ্দেশে ছুটলেও এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বজনদের গজারিয়ায় পৌঁছানোর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। লঞ্চঘাটে স্বজনের খোঁজে অপেক্ষমান উপজেলার ভোজেশ্বর গ্রামের আক্কাস রাঢ়ী জানান, তার মামা সৌরভ হোসেন ঢাকা থেকে বাড়ি আসার উদ্দেশে মিরাজ-৪ লঞ্চের যাত্রী হয়েছিলেন। মোবাইল বন্ধ থাকায় তিনি জীবিত আছেন না মারা গেছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। একই উপজেলার সুরেশ্বর গ্রামের আলামিন জানান, তার ভাই লিটন, ভাবী এবং ভাতিজা ও ভাতিজি ঢাকা থেকে বাড়ি আসার উদ্দেশে লঞ্চটির যাত্রী হয়েছিলেন। ভাই জীবিত থাকলেও ভাবী, ভাতিজা ও ভাতিজি মারা গেছে বলে জানতে পেরেছেন।