না’গঞ্জে র্যাব না রাখার পরামর্শ হাইকোর্টের

সাত খুনের ঘটনায় ভয়মুক্ত পরিবেশে সাক্ষীরা যাতে সাক্ষ্য দিতে পারেন সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে নারায়ণগঞ্জে র্যাব না থাকলে কি ক্ষতি হবে? এ মুহূর্তে ওই এলাকায় র্যাবের প্রয়োজন আছে কি? বরং র্যাব না থাকলেই মানুষ নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য হাইকোর্ট এটর্নি জেনারেলকে মৌখিক নির্দেশ দেন। এছাড়া নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব ঘটনা বের হয়ে আসবে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের এ ধরনের মন্তব্য সম্পর্কেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, শহীদ চেয়ারম্যানকে আসামি করার কথা বলে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হয়েছে। এটা হলে নিরপেক্ষ কোন সাক্ষী পাওয়া যাবে না। এই শহীদ চেয়ারম্যানই ৬ কোটি টাকা লেনদেনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন, তাকেই হুমকি দেয়া হল। তার এই মন্তব্য সম্পর্কে আমরা আদেশ দিতে পারি। আদালত বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করতে এটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ ঠাকুরের ডিভিশন বেঞ্চে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম। এ ঘটনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি, র্যাব, সিআইডি, পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ সাতবিবাদীর পাঠানো অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদন উপস্থাপন করে এটর্নি জেনারেল পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চার সপ্তাহ সময় প্রার্থনা করেন। আদালত দুই সপ্তাহ সময় মঞ্জুর করে আগামী ৪ জুন আবারো অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। সমপ্রতি র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের একটি সাক্ষাত্কার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। ঐ সাক্ষাত্কারে জিয়াউল আহসান বলেছেন, “সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন এখন কলকাতায় অবস্থান করছেন। ঘটনার তিন দিন পর তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই সব রহস্য উন্মোচিত হবে। এছাড়া নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যান এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ ঠাকুর সাক্ষাত্কারের এই অংশ বিশেষ তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বলেন, ঘটনা উন্মোচিত করার দায়িত্ব তার না। আমাদের সুস্পষ্ট আদেশ রয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সঙ্গে র্যাব কোনভাবেই সম্পৃক্ত হতে পারবে না। কিন্তু র্যাবের ঐ কর্মকর্তা নজরুলের শ্বশুর ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। আদালত বলেন, এটা আদালত অবমাননার শামিল। শহীদ চেয়ারম্যানই প্রথমে সাহস করে সত্য বলেছেন। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলার অন্যতম সাক্ষী শহীদ চেয়ারম্যানকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি বিষয়টি সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন। তার এ ধরনের বক্তব্য দেয়া ঠিক হয়নি। আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ দেব? নাকি আপনি বিষয়টি দেখবেন? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমিই পারবো। এটা আমাকে বলা মানেই আদেশ দেয়া হল। আদালত বলেন, সাক্ষীকে তিনি হুমকি দিলেন। নজরুলের শ্বশুরকে এ ধরনের হুমকি দিলে কেউ কি সাক্ষ্য দিতে সাহস দেখাবে? অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ডিবি সিআইডি তদন্ত করছে। আদালত বলেন, র্যাব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের ভাবমূর্তির স্বার্থে নারায়ণগঞ্জে র্যাবের তত্পরতা না থাকলে ক্ষতি কি? এ মুহূর্তে ঐ এলাকায় র্যাবের প্রয়োজন আছে কি? কারণ, না থাকলে মানুষ একটু নির্ভয়ে সাক্ষ্য দেবে। আদালত বলেন, এ ব্যাপারে আমরা আদেশ দিতে পারি, তবে না দিলেই ভালো হয়। আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি বিষয়টি প্রশাসনকে জানাবেন। আদালত এ পর্যায়ে বলেন, র্যাবের দু’-একজন খারাপ হয়ে গেলে গোটা বাহিনী কি খারাপ হয়ে যাবে? বিচার বিভাগের দু’-একজন বা সাংবাদিকদের দু’-একজন খারাপ হলে পুরো পেশার সবাই কি খারাপ হয়ে যাবে? বিষয়টি তা নয়। এ জন্য আমরা আদেশ দেয়ার সময় শব্দ চয়নে সচেতন ছিলাম। কারণ একজন ব্যক্তির জন্য পুরো বাহিনীকে দায়ী করা ঠিক হবে না। আর সেটি করা হলে মনে হবে ওই বাহিনীতে সত্ লোক নেই। এজন্যই আমরা এ ঘটনায় আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্য সম্পৃক্ত কিনা তা তদন্ত করতে বলেছি। এরপর বরখাস্তকৃত তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে হাইকোর্টের অন্য একটি বেঞ্চের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ উপস্থাপন করেন রিটকারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। এটর্নি জেনারেল বিষয়টি উপস্থাপনের বিরোধিতা করে বলেন, মনে হচ্ছে কেউ কেউ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ওই বেঞ্চের আদেশেই আছে, আদেশটি এই বেঞ্চকে অবহিত করতে হবে। বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য রিটকারীদের প্রতিও আদেশ রয়েছে। আদালত এটর্নি জেনারেলকে আরো বলেন, আপনাদের কিছু বলার থাকলে ওই বেঞ্চে যান। অথবা আপিল বিভাগে যান। এরপর সুব্রত চৌধুরী পুরো আদেশটি পাঠ করে শোনান। আদালত গ্রেফতার সংক্রান্ত আদেশটি নথিভুক্ত করেন। তবে পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে এখনো কেন গ্রেফতার করা হয়নি এ বিষয়ে আদালতে কোন পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য উপস্থাপিত হয়নি। আদালতে উপস্থাপিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এজাহারকারী, নিহতদের নিকটাত্মীয়সহ ২৫জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ডিবি অফিসে সংরক্ষিত মামলার আলামত পরিদর্শন ও গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে তারা তদন্ত সম্পন্ন করতে চার সপ্তাহ সময় চান। এ প্রসঙ্গে আদালত বলেন, আমরা তাদেরকে সময়সীমা বেঁধে দেইনি। তার মানে তারা হয়তো চার সপ্তাহের মধ্যে পারবে। সিআইডির প্রতিবেদনে কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার, আলামত জব্দ, উদ্ধারকৃত গাড়ির ফরেনসিক পরীক্ষার বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার দিন আদালত চত্বরে নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগী কর্তৃক একজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিকে আটক ও একজন র্যাবের পোশাক পরিহিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঐ ব্যক্তিকে উদ্ধারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ওই এলাকার আশপাশের লোকজন কিছুটা আতঙ্কগ্রস্ত রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই আতঙ্কের প্রতি এটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আদালত বলেন, প্রতিবেদনে আতঙ্কগ্রস্তদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু লোকজনের এই আতঙ্ক দূর করতে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেটা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। স্থানীয় লোকজন যদি আতঙ্কে থাকেন, তাহলে তারা সাক্ষ্য দেবেন কিভাবে? এ পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল বলেন, কোর্ট প্রাঙ্গণে একটি বোমার বিস্ফোরণ হলে আমরাও আতঙ্কিত হব। তবে থানা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশও নারায়ণগঞ্জে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। সিআইডির প্রতিবেদন ছাড়াও পুলিশের আইজি ও র্যাবের মহাপরিচালকের প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়। অভিযুক্ত র্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে র্যাব মহাপরিচালকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গঠিত কমিটি চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তাসহ র্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের ১৩ জন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। পুলিশের আইজির প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশও নজরদারি অব্যাহত রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর এটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে আদালত বলেন, এটর্নি জেনারেলের পদটি সাংবিধানিক। পুলিশের আইজি ও র্যাবের ডিজির পাঠানো প্রতিবেদনে আপনাকে (এটর্নি জেনারেল) সম্বোধন করে কিছু বলা হয়নি। এটা করলে কি তাদের সম্মান কমে যায়? এ থেকেই তাদের মানসিকতা বোঝা যায়। শুনানিকালে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এসএম নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন।