রাজনৈতিক অস্থিরতায় বেকায়দায় ইউক্রেনের অর্থনীতি

ইউক্রেনে আমদানিকৃত পণ্যের দাম কেবলই বাড়ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনীয় মুদ্রা তার মান হারিয়েছে দুই-পঞ্চমাংশ। ফেব্রুয়ারিতেও যে পোশাকটি তিনি কিনতে পারতেন ২০ মার্কিন ডলারে, সেটির দাম এখন ৩০ মার্কিন ডলার ইউক্রেনের ওডেসার বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী অ্যালোনা তার এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দারুণ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। ইউক্রেনে চলমান দাঙ্গা-হাঙ্গামায় কারণে তার কী করা উচিত এবং রাশিয়া ওডেসা দখল করে নিলে তিনি কোথায় থাকবেন— এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এরমধ্যে তাকে আবার পেয়ে বসেছে চাকরির নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা। আলোনা জানান, ইউক্রেনে আমদানিকৃত পণ্যের দাম কেবলই বাড়ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনীয় মুদ্রা তার মান হারিয়েছে দুই-পঞ্চমাংশ। ফেব্রুয়ারিতেও যে পোশাকটি তিনি কিনতে পারতেন ২০ মার্কিন ডলারে, সেটির দাম এখন ৩০ মার্কিন ডলার। অ্যালোনা এখনো বিয়ে করেননি বলে থাকছেন বাবা-মায়ের সঙ্গেই। বাবা ট্যাক্সি ড্রাইভার আর গৃহিণী। দেশের এ উত্তাল পরিস্থিতিতে ব্যাংকে অর্থ রাখাকে মোটেই সমীচীন মনে করছে না এ পরিবারটি। তার বদলে বাড়িতেই সঞ্চয় করছে। ইউক্রেনে সমস্যার সূত্রপাত গত নভেম্বরে। প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ রাশিয়াকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে ইউরোপিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন ডিলে স্বাক্ষর না করাতেই অশান্ত হয়ে উঠেছিল দেশটি। এতে ভিক্টও ইয়ানুকোভিচ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু তার সূত্র ধরে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ক্রিমিয়া উপদ্বীপে। স্বায়ত্তশাসিত এ অঞ্চলে অনুষ্ঠিত গণভোটে রায় এসেছে স্বাধীনতার পক্ষে, যাতে শেষ পর্যন্ত তারা রাশিয়ায় যোগ দেবে। এখানেই শেষ নয়, রুশভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্যান্য অঞ্চলেও ইউক্রেন থেকে বিযুক্ত হওয়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। তার মধ্যে ওডেসাও রয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে ৪২ জন মারাও গেছে। এদের বেশিরভাগই রাশিয়াপন্থি। ৩৯ বছর বয়সী আলেকজান্ডার ভারিচেনকো দানেস্ক-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল স্টীল কোম্পানির ম্যানেজার। তাঁর কোম্পানিতে এক-চতুর্থাংশ অর্ডারই আসে রাশান ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে। চলমান বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও তাঁর ধারণা ছিল ব্যবসায় কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভারিচেনকো জানিয়েছেন, গত নভেম্বরের পর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকৃতির ট্রাকগুলোকে সীমান্তে আটকে দিচ্ছে রাশিয়ার কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তাঁর মতে, ইউক্রেনকে শাস্তি দিতেই এ কাজটি করা হচ্ছে। এতে সামনের দিনগুলোতে রাশিয়ান ক্লায়েন্টের সংখ্যা নিশ্চিত কমে যাবে, কেননা ডেলিভারি পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কোম্পানিটি আরো সমস্যায় পড়েছে রাশিয়া তাদের সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেয়ায়। এমনিতেই সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক অবস্থা সুখকর নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অবস্থা বুঝে ইউক্রেনের জন্য ১.৭ বিলিয়ন ডলারের বেইলআউট ফান্ড অনুমোদন করেছে। ইউক্রেনের বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেয়া দ্য আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো আদ্রিয়ান কারাতনিচি ব্যবসায়ীদেরকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন। তাঁর অভিমত, আসছে ২৫ মে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ইউক্রেনের অনেক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা চলে আসতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, ইউক্রেনের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেনো তাকে স্বীকৃতি দেবে না পুতিনের রাশিয়া। তাদের অর্থনীতিও বর্তমানে ভাল নেই। এ বছর রুবলের মান পড়েছে ১০ শতাংশ। এপ্রিলের শেষে আইএমএফ জানিয়েছে, চলতি বছরে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ০.২ শতাংশ। এর আগের পূর্বাভাস ছিল ১.৩ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখি হওয়াতেই প্রবৃদ্ধি নেমে আসবে। পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে রাশিয়া। উল্লেখ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় আমদানিকৃত গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশই সরবরাহ করে দেশটি। ইউক্রেনকে শিক্ষা দিতে এরই মধ্যে তারা জানিয়ে দিয়েছে, বকেয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার পরিশোধ না করলে সেখানে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে একা পথ চলার অনেকদিন হয়ে গেলেও ইউক্রেন এখন পর্যন্ত পুঁজিবাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি, যা পেরেছে আশেপাশের অনেক দেশ। তাছাড়া এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাপক বিস্তৃত দুর্নীতি। ২০১৩ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত করাপশান পারসেপশান্স ইনডেক্স সূচকে ১৭৫টি দেশের মধ্যে ইউক্রেনের অবস্থান ছিল ১৪৪। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের আন্দ্রে মাউরসভ মন্তব্য করেছেন, ‘ইউক্রেনের উপর দুর্নীতির প্রভাব এবং এর ক্ষতির পরিমাণ অবর্ণনীয়।’ আর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কিছুদিন আগে বলেছিলেন, সত্যিকারের উন্নতি চাইলে ইউক্রেনকে লড়তে হবে দুর্নীতির ক্যান্সারের বিরুদ্ধে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা এ বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না বা ইচ্ছে করেই দিচ্ছে না। —আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে