উত্তরে মরুময়তা দক্ষিণে লবণাক্ততা

আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বরেন্দ্র অঞ্চল। এ এলাকায় দিনে দিনে দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর প্রধানতম কারণ কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহার। অন্যদিকে এ অঞ্চলের নদ-নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া অর্থাত্ নদ-নদীর তলদেশ ভরে ওঠা, নদী হারিয়ে যাওয়া, দখল, নদী ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত করাও অন্যতম। এছাড়াও ভূ-উপরিভাগে পানির আধার খাল-বিল-পুকুর হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে বড় বড় বৃক্ষ, ছোটখাটো জঙ্গল, ঝোপঝাড় হারিয়ে যাবার ফলে বৃষ্টি কমে গেছে। এসব এলাকায় এখন ভূগর্ভস্থ পানি পেতে ১৫/১৬ ফুট গর্ত করে এরপর মেশিনের সাহায্যে পানি প্রাপ্তির চেষ্টা করতে হয়। বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বাড়ছে। মরুময়তার পূর্ব লক্ষণ যেন দেখা দিচ্ছে। তার প্রমাণ—মৌসুমে পাট পচানো, আমন ও ইরি চাষ বৃষ্টিহীন খরার কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘটছে উলটো। অর্থাত্ পানি প্রচুর, তবে লবণাক্ত। এই লবণাক্ততার প্রভাব এতোটাই বাড়ছে যে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞগণ। কেননা খাবার জন্য মিঠাপানির প্রাপ্যতা দিনে দিনে কঠিনতর হয়ে পড়ছে, কৃষিক্ষেত্রে ঘটছে বিঘ্ন। ফলত মানুষের জীবিকায়নে দুর্বিষহ অবস্থা দ্রুত ধেয়ে আসছে। ব্যবহারযোগ্য মিঠা পানি দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এ অঞ্চলে মিঠাপানির উত্স খাল, পুকুর ক্রমান্বয়ে লবণাক্ততায় পরিণত হচ্ছে। অগভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলনকৃত পানিও লবণাক্ততায় পূর্ণ। এটি উপকূলীয় অঞ্চলের চিত্র। উভয় অঞ্চলে নানা রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি খরা ও লবণাক্ততার ভয়াবহতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞগণ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে ২০৯০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে ৪০ শতাংশ ফসলি জমি বিলীন হওয়ার সম্ভাবনাসহ মাটি এবং পানির লবণাক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন লবণ সহিষ্ণু কৃষি বীজসমূহ এই মাত্রা সইতে পারবে না। সুন্দরবনসহ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে। অধিক হারে সংগঠিত জোয়ার, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করবে। এই উভয় প্রান্তের সমস্যার জন্য মূলত দায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব। জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধি ও মোকাবেলার চেষ্টা, দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণে ও বাস্তবায়নে সমস্যা, অসচেতনতা মূলত এর মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে আমাদের দেশের মাঝখানে অর্থাত্ ঢাকা শহরে বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা সাময়িক হলেও নগরজীবনে সমস্যা বিরাট হচ্ছে দিন দিন। এটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-খাল-জলাশয় দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি, পানি নিষ্কাশনে রাস্তার বাধাগ্রস্ততা ইত্যাদি বড় কারণ। ফলত সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। একদিকে পানি প্রাপ্তির কষ্ট, অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা। উত্তর, মধ্য, দক্ষিণ—তিন এলাকার সমস্যা মূলত পানি নিয়ে। এই পানির ওপরই আমাদের জীবিকায়ন, বেঁচে থাকা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা। একদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, দুষ্প্রাপ্ততা—অন্যদিকে পানি থেকেও যেন অনেক দূরে অর্থাত্ লবণাক্ততা। আবার পানিতে রয়েছে আর্সেনিক সমস্যা। গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমরা বলছি যে বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তনে শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রধানত দায়ী কিন্তু আমরাও দায়ভার থেকে মুক্ত হতে পারি কি? জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা হুমকির সম্মুখীন শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মোকাবেলায় নানা রকম পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আশু প্রয়োজন উভয় প্রান্তের জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ, নদী ড্রেজিং, পুকুর ও জলাশয়সহ জলাধার সংরক্ষণ, অধিকহারে বৃক্ষরোপণ করা (অবশ্যই দেশি বৃক্ষ), নদীগুলোর উভয় পাশ ও জেগে ওঠা চর নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ক্ষেত্র তৈরি করাসহ গবেষণালব্ধ বিকল্প বৃক্ষ ও বন সৃজনভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি জরুরি, কৃষিক্ষেত্রে খরা লবণাক্ত সহিষ্ণু ফসল, পানি কম ব্যবহার্য ফসলের জাত আরো ব্যাপকতর উদ্ভাবনাসহ ব্যবহার করা। ধান উত্পাদনে পানি কম ব্যবহারের পদ্ধতিগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়াসহ পানির অপচয় না করার জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। চীনের একটি অঞ্চলে লবণাক্ত পানি শোধন প্রক্রিয়ায় পানযোগ্য করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে পত্রিকায় বেরিয়েছে। লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য এ বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। ঢাকার আশেপাশের নদী, খাল, জলাশয় রক্ষাসহ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীর করে দূষণমুক্তভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য আরো ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এ ব্যাপারে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সচেতনতা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সহযোগিতা করতে হবে। কেননা এ অবস্থা থেকে কেউ আলাদাভাবে রক্ষা পাবে না। গাইবান্ধা