উত্তম কর ও ভাড়াটিয়া
প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৪, ২২:২৭
সেই কর-ই উত্তম কর যে করের বোঝা যাদের ওপর চাপানোর উদ্দেশ্য থাকে তাদের ওপরই চাপানো যায়। করের বোঝা অনাকাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর বর্তালে তা আর উত্তম কর থাকে না এবং তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনে না। কর আরোপের উদ্দেশ্য শুধু রাজস্ব সংগ্রহ নয়, বরং জনগণের মাঝে সম্পদের সুষম ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করা। আগামী বাজেটকে সামনে রেখে সম্প্রতি বাড়িভাড়া থেকে উপার্জিত আয়ের ওপর সরকার কর আরোপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আমরা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই এবং আমরা চাই এ কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হোক; অর্থাত্ ভাড়াটিয়ারা যেন কিছুতেই বলির পাঁঠা না হয়ে যান। এ কাজে সরকারের সফলতার জন্য দরকার দেশের সকল বাড়ি এবং বাড়িভাড়া সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্য—বাংলাদেশে কত সংখ্যক বাড়ি, কত কোটি বর্গফুট ফ্লোর, মোট কত টাকায় প্রতিমাসে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত সরকারের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য নেই। মাননীয় অর্থমন্ত্রী একটি সমাধান দিয়েছেন—ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া পরিশোধে বাধ্যবাধকতা আরোপ। এক্ষেত্রে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে স্মরণ রাখতে হবে যে, বাংলাদেশে দৃশ্যমান লেনদেনের চেয়ে অদৃশ্যমান লেনদেন কম নয় এবং তা কীভাবে করতে হয় বাংলাদেশের মানুষ তা বেশ ভালো জানে। অতএব ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে বলা হলে বাড়ির মালিকরা যে সম্পূর্ণ টাকাটাই ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করবেন তা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ফলে বাড়িভাড়া পরিশোধের এই বিধানটিই সব সমস্যার সমাধান নয়। আর এজন্যই প্রথমে বাড়ি সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহের কথা বলেছিলাম। এটা গেলো কর ফাঁকি সংক্রান্ত আশঙ্কা; আশঙ্কা আরো আছে। করের উপলক্ষে বাড়িওয়ালারা আর এক দফা বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করবেন এবং করের সম্পূর্ণ বোঝাটাই ভাড়াটিয়ার ওপর চাপাবেন। অতএব সরকারকে লক্ষ রাখতে হবে বাড়িভাড়া থেকে উপার্জিত আয়ের ওপর আরোপিত করের হার বছর বছর পরিবর্তন নাহয়, কমপক্ষে দশ বছর যেন অপরিবর্তিত থাকে; অর্থাত্ বাড়িওয়ালারা যেন বছর বছর বাড়িভাড়া বাড়ানোর উপলক্ষ না পান। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ আবাসনের ব্যবস্থা করে ফ্ল্যাট সরবরাহ বৃদ্ধি করতে হবে যাতে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া প্রভাব লোপ পায় এবং ভাড়াটিয়াদের জিম্মি করে ভাড়া বৃদ্ধি করতে না পারে।
এবার আসা যাক, ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া আদায়ের যে পদ্ধতি তার অর্থনৈতিক ক্ষতিকর দিকটিতে। ভাড়াটিয়াকে যদি প্রতি মাসে একদিন ভাড়া পরিশোধের জন্য ব্যাংকে যেতে হয় তাহলে তার সময় এবং কাজের ক্ষতি হবে। যেহেতু ছুটির দিনে ব্যাংক বন্ধ থাকে সেহেতু তাকে কাজটি করতে হবে যে কোনো কর্মদিবসে। তাহলে এই কর সংগ্রহের অদৃশ্য ব্যয় বা লুকায়িত ব্যয় রয়েছে। এটা প্রশমনের একটি উপায় হতে পারে এমন যে, প্রতিমাসের একটি শনিবার ব্যাংকসমূহ খোলা থাকবে (দুপুর ১টা পর্যন্ত) শুধু বাড়িভাড়া সংগ্রহের জন্য এবং ঐদিন যে সকল ব্যাংক কর্মকর্তা অফিস করবেন তাঁদের একটি ভাতা প্রদান করা যেতে পারে। এই লেনদেন থেকে যেহেতু ব্যাংক লাভবান হবে, তাই এর অর্থনৈতিক ক্ষতি নেই।
ঢাকা