রামেকে আটকে আছে চারশ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক বিভাগে প্রায় ৪০০ লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আটকে রয়েছে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে পারছে না পুলিশ। তাই এসব মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হচ্ছে না। আর অভিযোগপত্র না পাওয়ায় আদালত বিচার কাজও শুরু করতে পারছেন না।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হয় রাজশাহী অঞ্চলে। খুন হন অনেকে। ঘটে আত্মহত্যার মতো ঘটনা। এছাড়া অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার তো আছেই। ফলে মৃত্যুর কারণ জানতে শরণাপন্ন হতে হয় রামেকের ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর।
এ ব্যাপারে সদ্য অবসরে যাওয়া রামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. এনামুল হক বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭৫ মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা রয়েছে। যেগুলো এখনো প্রস্তুতই হয়নি। তিনি আরও বলেন, ওই সংখ্যার প্রায় অর্ধেকের মতো ছিল তার সময়ের। নতুন বছরে এ সংখ্যাটি আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন: চার সমুদ্রবন্দরে সংকেত নামিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে

তিনি আরও বলেন, যেসব ঘটনার গুরুত্ব ছিল, সেসব ঘটনার লাশের ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন খুব দ্রুত দেয়ার চেষ্টা করেছি। তবে ফরেনসিক বিভাগের জনবল সংকটে সবগুলো প্রতিবেদন দেয়া সম্ভব হয়নি। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ে। এখন প্রায় চারশোর কাছাকাছি হতে পারে।

ডা. এনামুল হকের তথ্যের সঙ্গে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) একাধিক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কথার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। জেলার বিভিন্ন থানার ওসি এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তারাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, ময়নাদতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য তারা বার বার রামেকের ফরেনসিক বিভাগে খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবেদন পাচ্ছেন না। ফলে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে সেগুলোর অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা যাচ্ছে না।

নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমান উল্লাহ বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও ভিসেরা রিপোর্টের জন্য অনেক মামলার শেষ পরিণতি থেমে আছে। যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ মামলা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়। সেগুলো আমরা ব্যক্তিগত যোগাযোগ করে দ্রুত বের করে আনার চেষ্টা করি। তবে এখনো, অনেক মামলা অমীমাংসিত আছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য।

এ বিষয়ে রাজশাহীর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া মামলার অভিযোগপত্র হয় না। আর অভিযোগপত্র ছাড়া বিচার হয় না। ফলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া বিচার শেষ তো দূরের কথা, শুরুই করা যাচ্ছে না। ফলে আসামিরা শুধু হাজিরা দিচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেই হয়তো আছেন যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, তারা হয়রানি হচ্ছেন। আবার বিপরীত দিকে আসামিদের দ্রুত সাজা না হওয়ার কারণে তারা জামিন নিয়ে বাইরে থাকছেন। মামলা তুলে নিতে বাদীকে চাপ দিচ্ছেন। এ জন্য লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনগুলো দ্রুত দেয়াটা খুবই জরুরী।

রবিউল ইসলাম বলেন, বোনের হত্যার ফরেনসিক ল্যাব প্রতিবেদনের খোঁজ নিতে রামেক ফরেনসিক বিভাগে যান। এসময় তাকে বিভিন্ন অজুহাতে ঘোরানো হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এক বছর আগের ঘটনায় ছয় মাস পর ভিসেরা প্রতিবেদন পেলেও পরবর্তী ছয় মাসেও পাননি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। বোনের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে রবিউল ইসলাম বলেন, নতুন সংসারে বোন আমার গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যায়। আমাদের প্রথম থেকেই সন্দেহ। বোন আমার মরেনি। তাকে খুন করে গলায় ওড়নার ফাঁস দেয়া হয়েছিল। বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া যাবে পোস্টমর্টেমে। কিন্তু এই রিপোর্টই পাচ্ছি না।

এ বিষয়ে রামেকের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. রায়হান আহমেদ বলেন, আমাদের দিক থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি ময়নাতদন্তের রিপোর্টগুলো দ্রুত দেয়ার। তবে দেব বললেই হয় না, একটি প্রক্রিয়ার মাধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রায় ৪০০ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আটকে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি অস্বীকার করছি না, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা নেই। তবে যতগুলো বলা হচ্ছে এতটা নয়। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী, যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদনগুলো ছাড়ার চেষ্টা করছি।

ইত্তেফাক/এমআরএম