এমন পরাজয় কখনো দেখেনি কংগ্রেস

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই নেহেরু-গান্ধী পরিবার দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। স্বাধীন ভারতে সিংহভাগ সময়ই তারা ক্ষমতায় ছিলো। এ সময় নির্বাচনে কংগ্রেস কয়েকবারই পরাজয় দেখেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনের মতো ধরাশায়ী আগে কখনো হয়নি। আসনের হিসাব-নিকাশ বলছে ১২৮ বছরের ইতিহাসে এমন পরাজয় কংগ্রেস কখনোই দেখেনি। এবারের নির্বাচনে তারা এককভাবে পেয়েছে মাত্র ৪৩টি আসন। জোটে পেয়েছে ৫৮টি। অন্যদিকে, ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পেয়েছে ২৮৩ আসন। এনডিএ জোট পেয়েছে ৩৩৭টি আসন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী। আর গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার রাহুল গান্ধীকে ক্রাউন প্রিন্স হতে আরো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বলা হচ্ছে, দুর্নীতি রোধ, বেকারত্ব দূরীকরণ আর অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তি দিতে না পারায় কংগ্রেসের প্রতি ক্ষুব্ধ ভোটাররা এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর কংগ্রেসের মুখপাত্র শাকিল আহমেদ বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, জনতার রায় আমরা বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিয়েছি। নির্বাচনের ফল বলছে, দেশের মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে গান্ধী পরিবারের যেমন বড় পতন হয়েছে তেমনি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী সমাজ ব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ভারতের রাজনীতিতে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের গোড়াপত্তন করেছিলেন জওহরলাল নেহেরু। স্বাধীনতা আন্দোলনের হিরো নেহেরু হয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনিই ভারতের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরপর ক্ষমতায় আসেন তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী। যার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন ছেলে রাজীব গান্ধী। মা ও ছেলে দুই জনই রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার শিকার হন। এরপর দিশেহারা কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসেন রাজীব গান্ধীর বিধবা স্ত্রী ইতালীয় বংশোদ্ভূত সোনিয়া গান্ধী। ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেত্রী এখন ছেলে রাহুল গান্ধীর জন্য মঞ্চ তৈরি করছেন। যার হাত ধরে এবারের নির্বাচনে লড়েছে কংগ্রেস এবং গান্ধী পরিবার। যদিও এই পরিবারের সঙ্গে ভারতের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর কোনো সম্পর্ক নেই। তরুণ নেতা রাহুল গান্ধী হয়তো ভারতের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে পারতেন কিন্তু অনেক ভোটার মনে করেন, রাহুল সুবিধাপ্রাপ্ত, উদাসীন এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এছাড়া কংগ্রেসও তাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেনি। বলা যায়, ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের ভারডুবির জন্য তাকে বলির পাঠা বানাতে চায়নি তারা। বিহার ও উত্তর প্রদেশের সর্বশেষ বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। ঐ নির্বাচনে দলের পরিণতি দুঃখজনক হয়েছিলো। আশির দশকে সর্বশেষ এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিলো কংগ্রেসকে। বোফর্স ঘুষ কেলেঙ্কারির জেরে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকার হেরে গিয়েছিলো। ঐ বার কংগ্রেস পেয়েছিলো ১৯৭ আসন। এরপর খারাপ করেছিলো ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিলো ১৪০ আসন, বিজেপি পেয়েছিলো ১৮৭ আর জনতা দল পেয়েছিলো ১৯২ আসন। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় এসেছিলো। ঐ বারও কংগ্রেস ১৪৪টি আসন পেয়েছিলো। বিগত দুই মেয়াদেই কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় এসেছে। ২০০৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস জোট পেয়েছিলো ২১৮ আসন। আর ২০০৯ সালের নির্বাচনে তারা পেয়েছিলো ২৬২ আসন। কিন্তু এবার কংগ্রেসের সঙ্গে ডুবেছে জোটও। ক্ষমতাসীন সরকারের যে এমন ভরাডুবি হবে সেটা কেউ হয়তো আঁচও করতে পারেনি। তবে ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক ইন্দার মালহোত্রার মতে, এ পরাজয়ে কংগ্রেস ধ্বংস বা অদৃশ্য হয়ে যাবে না। পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দলের রয়েছে। এটা সাময়িক বিপর্যয় মাত্র। আর গান্ধী পরিবার ছাড়া কংগ্রেস নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। তাদের বাইরে কারো নেতৃত্ব মেনে নিতে কংগ্রেস নেতারাও রাজি নন।