সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করবো না
প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৪, ২২:৫১
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৩৩তম বর্ষপূর্তি দিবসে সর্বস্তরের মানুষের প্রাণঢালা ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর শুভেচ্ছায় স্নাত হলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণ করার জন্য আমি দেশে ফিরে এসেছিলাম। সারাজীবন দেশের মানুষের উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তনে সততার সঙ্গে কাজ করে যেতে চাই। বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। সততার সঙ্গে কাজ করছি বলেই সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না। সাহস, সততা আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। গতকাল শনিবার সকালে গণভবনে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এছাড়া দিনব্যাপী নানা কর্মসূচিসহ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় শেখ হাসিনার ৩৩তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। সকালে সারা দেশের দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ১০টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগসহ দলের নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে দলের নেতাকর্মীরা শোভাযাত্রা সহকারে গণভবনে গিয়ে দলীয় সভানেত্রীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে বিকালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রথম বারের মত দেশে ফেরেন জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে ছয় বছর দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে তার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি। জীবনের কঠিনতম এই সময়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি যত সহজে কথাগুলো বলছি, তখনকার পরিস্থিতিতে বিষয়গুলো মেনে নেয়া এত সহজ ছিল না। দূরে বসে জানা আর ফিরে এসে শূন্যতা দেখা খুবই কঠিন। তিনি বলেন, দেশের ওই ক্রান্তিকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরাই তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছিল। ইতিহাসের করুণ ও বিপর্যস্ত সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দু’চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। কখনো বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কথা চালিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। কথা থামিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন ক্ষণে ক্ষণে। এ সময় উপস্থিত অনেককে কাঁদতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে হু হু করে কেঁদে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বলেন, একদিন আব্বাকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি আব্বাকে বলছি, আপনি কোথায়? আওয়ামী লীগ যদি ভেঙে যায়, আমরা দেশে ফিরতে পারবো না। আব্বা বললেন, চিন্তা করিস না। পার্টি ইউনাইটেড থাকবে। পিন পতন নিস্তবদ্ধতায় প্রধানমন্ত্রীর এক একটা কথা যেন কষ্টগাঁথা ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় শুধু একটাই চিন্তা ছিল। দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাতে কারফিউ জারি করে দেশ চালাতেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান সে সময়ে ৩২ নম্বরে গিয়ে আমাকে বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য মিলাদ পড়তে দেননি। তখন রাস্তায় ও লেকের পাড়ে বসে আমাকে পরিবারের সদস্যদের জন্য মিলাদ ও দোয়া পড়তে হয়েছে। তখন ওই বাড়ির দরজার সামনে বসে থাকতাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, যেদিন দেশে ফিরি সেদিন লাখো মানুষের ঢল ছিলো, তাদের ভালোবাসা ছিলো। কিন্তু ছিলো না সেই ভালোবাসার মানুষগুলো, যাদের ভালোবাসাই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত। তিনি বলেন, সবাইকে রেখে দেশ ছেড়েছিলাম কিন্তু ফিরে এসে দেখি কেউ নেই। সেদিনটার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমি চিন্তাও করিনি কোথায় থাকবো, কোথায় উঠবো। দু’টো সুটকেস হাতে নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। যখন বাংলাদেশ থেকে যাই, তখন মা-বাবা ভাই সব ছিলো। রাসেল বিদায় দিতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলো। লাখো মানুষের ভালবাসা পেলাম। কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষগুলোকে পেলাম না। পেলাম বনানী কবরস্থানে সারি সারি কবর। এই পরিস্থিতি আমার জন্য বড়ই কঠিন ছিলো।
শেখ হাসিনা বলেন, সততাই সর্বোত্কৃষ্ট শক্তি। আল্লাহ যখন মানুষকে কোন কাজ দিয়ে দুনিয়ায় পাঠান তখন সেটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনিই তাকে সাহায্য করে থাকেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৮৬ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রতি রাত ১১টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ থাকতো। যে দেশে রাতে কারফিউ দিয়ে দেশ চালায় সে দেশে গণতন্ত্র থাকে কি করে? যারা বলেন জিয়া দেশে গণতন্ত্র এনেছে তাদের কাছে আমার এটাই প্রশ্ন। তিনি বলেন, সামরিক শাসন আর গণতন্ত্রহীনতার মধ্য দিয়ে পার করা এই সময়টাতে বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের একের পর এক হত্যা করা হয়। জিয়াউর রহমান একসঙ্গে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্র প্রধানের ভূমিকায় থেকে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটান। ১৮ থেকে ১৯ বার সেনাবাহিনীতে ক্যু হয়েছিল।
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা আরো বলেন, মাত্র ১৫ দিন আগে দেশ ছেড়ে গিয়েছিলাম। ভাগ্যের এই বিপর্যয় ঘটবে ভাবতে পারিনি। সবাইকে ছেড়ে গেলাম। একদিন দেখি নিঃস্ব। কোথায় যাবো, কি করবো জানি না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো আমাদের সব দায়িত্ব নেন। জার্মানি থেকে ভারতের আসার কথা ?উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখনো ভাবিনি সব হারিয়েছি। কেউ বলছে, মা বেঁচে আছে। শুনি, রাসেল বেঁচে আছে। ভারতে এসে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সব জানতে পারলাম। জার্মানিতে তত্কালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সাহায্য করলেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনের নিষ্ক্রিয়তায় বিস্ময় প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, আব্বার ফরেন মিনিস্টার ওই সময় দেশের বাইরে ছিলেন। ১৬ তারিখ (১৬ আগস্ট ১৯৭৫) তার সঙ্গে দেখা হলো। একটা স্টেটমেইন্ট দিতে বললাম। কিন্তু তিনি দিলেন না। তিনি বলেন, বাবার মন্ত্রীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাইনি। একটা প্রেস কনফারেন্স করেনি, খোঁজও নেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সবসময় একটা বিষয়েই জোর দিয়েছি, আমার জন্য দেশের ও দলের যেনো কোনও ক্ষতি না হয়। আমার কারণে যেনো দলের নেতা-কর্মীদের হেয় হতে না হয়। তিনি বলেন, আমি বাবা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে শিখেছি দেশ ও দেশের মানুষকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়। মা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বাবা যখন জেলে থাকতেন তখন মাকেই দেখেছি দল সামলাতে। তার কাছ থেকেও আমি রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতারা শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।