ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের দলগুলোর মুখ সাদা কালো হবে কেন?

জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের মুখ কালো, আবার কোনো কোনো দল নাকি খুশি-গণমাধ্যমে এরকম খবর দেখছি। ভারতের জনগণই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে কারা সরকার গঠন করবে। যুক্তরাষ্ট্রেও সেখানকার জনগণই নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়, কারা ক্ষমতায় যাবে। তাহলে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ সাদাকালো হবে কেন? এখানে রাজনীতি হবে না, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাদের (ভারতের নতুন সরকারের) প্রয়োজনীয় বিষয়াদিই প্রাধান্য পাবে। গতকাল ধানমন্ডিতে জিনজিয়ান রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ ীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভায় উদ্বোধনী পর্বে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের কারণে কিংবা কর্মসংস্থানের কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা হয়নি বলে ভারতে কংগ্রেসের এরকম পরাজয় ঘটেছে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না। যতটা না ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতির পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে, তার চেয়েও সেখানে বেশি বিবেচ্য ছিল-এতদিন আমরা কে কী পেলাম, আর কী পেলাম না, এই হিসাব-নিকাশ। যেমনটি বাংলাদেশের নির্বাচনেও হয়। তিনি বলেন, আমাদের (বাংলাদেশের) রাজনীতির এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। সবাই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সহসা নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছি না। তবে আগামী দিনগুলো একদিকে যেমন আকর্ষণীয়, অন্যদিকে খুব চ্যালেঞ্জিং কিংবা ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এখানে রাজনীতির অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর নেই। আমরা এর সমাধানও করিনি। চলছে পক্ষ-বিপক্ষের শক্তির রাজনীতি। এর সমাধান হবে বলে আমি মনেও করি না। সেজন্য সামনের দিনগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জেপি প্রধান বলেন, আমরা (জেপি) গণতন্ত্র ও নির্বাচনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আমাদের ক্ষমতা যত ক্ষুদ্রই হোক, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আমরা ভূমিকা রেখে যাবো। অন্য কেউ চান বা না চান, আমরা গণতান্ত্রিক পন্থা ও নির্বাচনের সঙ্গেই থাকবো। কারণ গণতন্ত্রের বিকল্প নেই, এর বিকল্প রক্তপাত। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, জেপির রাজনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট। ‘এক ব্যক্তির ইচ্ছায় দল চলবে’-আমরা এ নীতিতে বিশ্বাস করি না। এই দলে কোনো সিদ্ধান্তই এককভাবে নেয়া হয় না। যখন নির্বাচন আসে, তখনও কার সঙ্গে জোট হবে তা নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলার জন্য দলের নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে দলের প্রেসিডিয়াম বৈঠকে সেগুলো নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় দল পরিচালনার বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসার জন্যই একসময় আমরা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সমষ্টিগতভাবে দল পরিচালনা যেকোনো দলেরই আদর্শ হওয়া উচিত। জাতীয় পার্টি কেন ভেঙ্গেছিল, এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, মন্ত্রী থাকা না থাকার প্রশ্নে দল ভাঙ্গেনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর পর দলের পার্লামেন্টারি পার্টির সিদ্ধান্ত ছিল-আমরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করব। দেড় বছর পর এরশাদ বললেন, আওয়ামী লীগ আমাদের মূল্যায়ন করছে না। তিনি সংসদ থেকে ওয়াকআউট করার কথা বললেন। আমি বলেছিলাম, দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পার্লামেন্টারি পার্টির আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা দরকার। তা না করে তিনি সেদিন বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জেপি চেয়ারম্যান বলেন, অন্যরা বড় হলে জেপিও বড় দল, অন্যরা ছোট হলে আমরাও ছোট; কিন্তু বারবার প্রমাণ করেছি, আমরা সঠিক পথেই আছি। আমরা সবার সঙ্গে হাত মেলাই না। আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো দলগুলোর সঙ্গে আমাদের আদর্শের পার্থক্য টুকটাক। তবে বামপন্থিদের সঙ্গে তফাত্ বিরাট। আমরা আদর্শ নিয়ে জীবন-যাপন করি। পরিশ্রম করি, পরিশ্রম করতে জানলে তা বৃথা যায় না। আর এজন্যই জেপি ১৮ বছর ধরে টিকে আছে। যখন এর জন্ম হয় তখন এরশাদ হয়তো ভেবেছিলেন, আমরা ১৮ দিনও টিকবো না। এটাও তো কম প্রাপ্তি নয়। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, নির্বাচন এলে আসন নিয়ে জেপি দরকষাকষি করে না। ১৯৯৬ সালেও করিনি। এবার তো করার প্রশ্নই ওঠে না। নির্বাচনের আগে ১৪ দল আমাদের ডেকে ছিল, সেখানে নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। বৈঠক শেষে বের হওয়ার পর সাংবাদিকরা জানতে চান, আমরা নির্বাচনে যাব কিনা। আমি বলেছি, কেন যাব না? নির্বাচন হলে জেপি অবশ্যই তাতে অংশ নেবে। কে আসলো, কে আসলো না-এর ওপর তো জেপির সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে না। যার যার অবস্থান থেকে দলকে শক্তিশালী করে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে তিনি দলের নেতাদের পরামর্শ দেন। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, জেপি নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করেছে। আসন ভাগাভাগি নিয়ে অন্যরা যেভাবে ট্রেড ইউনিয়নের মতো দরকষাকষি করেছে, জেপি তা করেনি। জেপির তুলনায় অন্য যারা বেশি আসন পেয়েছে তারা নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন না করে ‘নৌকা’য় করেছে। বাকিরা আসন ভাগাভাগি ও আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। এই ঘৃণ্য রাজনীতি জেপি কখনো করেনি, করবেও না। জেপির অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকীর পরিচালনায় সভার শুরুতে দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ও বিদেশের বিশ্বিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব এনে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উদ্বোধনী পর্বের পর চা বিরতি শেষে শুরু হয় কর্ম-অধিবেশন। বিকাল পর্যন্ত চলা এই অধিবেশনে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এবং কেন্দ ীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা সাংগঠনিক বিষয়াদিসহ নানা ইস্যুতে খোলামেলা আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে কেন্দ ীয় অন্য নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, কর্নেল (অব.) আব্দুল লতিফ, অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান খলিল, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও নাজমা আক্তার।