রিমান্ডে সেই দুই র্যাব কর্মকর্তা
ইত্তেফাক রিপোর্ট ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৪, ২৩:০১
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তাকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনার সময় র্যাব-১১-এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর আরিফ হোসেনকে শুক্রবার শেষরাতে ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর গতকাল শনিবার তাদের দু’জনকে আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মামুনুর রশীদ মণ্ডল। আদালত তাদের দু’জনকেই ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে। তাদের দু’জনকেই ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
র্যাবের আরেক কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের ইনচার্জ লে. কমান্ডার এম এম রানাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গত ৫ মে নৌবাহিনীর চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়ার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। নৌবাহিনীর কাছেও তার ব্যাপারে কোন তথ্য নেই। এদিকে গতকাল এই মামলায় নূর হোসেনের দোকান কর্মচারী কামাল হোসেনকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। ৭ দিন রিমান্ড চাইলে আদালত ৩ দিন মঞ্জুর করে।
গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের আদালতে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রাতে গ্রেফতারের পর এই দুই কর্মকর্তাকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে সরাসরি নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে পুলিশ লাইনে নেয়া হয়। রিমান্ড শুনানি উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা। দুপুর ২টার দিকে দুটি পিকআপভ্যানে হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে পুলিশ বেষ্টনির মধ্যে সাবেক দুই র্যাব কর্মকর্তাকে আদালতে আনা হয়। এই কড়াকড়ির মধ্যেও সকাল থেকে উত্সুক মানুষের ভিড় ছিল পুলিশ লাইনের সামনে।
লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর আরিফের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ইন্সপেক্টর মামুনুর রশিদ মণ্ডল। আবেদনে তিনি বলেন, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোন সম্পৃক্ততা আছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। প্রায় ৪০ মিনিট রিমান্ড শুনানিশেষে আদালত তাদের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে।
গত ১১ মে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে অবিলম্বে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। এরপর তাদের গ্রেফতার নিয়ে চলে চিঠি চালাচালি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠির জবাব দেয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে পুলিশকে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর (সিআরপিসি) অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি পুলিশ সদর দফতর থেকে পাঠানো হয় নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কাছে। এরপর সন্ধ্যায় তাদের গ্রেফতারে তত্পরতা শুরু করে পুলিশ। রাতেই তারা গ্রেফতার হন।
নিজেকে নির্দোষ দাবী করলেন
লে. কর্নেল তারেক সাঈদ
নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই ঘটনায় আসামিদের পক্ষে তারা লড়বেন না। তাই এই দুই সাবেক র্যাব কর্মকর্তার পক্ষে কোন আইনজীবী ছিলেন না। ফলে তারা দু’জনই নিজেদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন। যদিও মেজর আরিফ হোসেন কোন বক্তব্য দেননি। তবে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ আদালদের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি নিজেকে পুরোপুরি নির্দোষ দাবী করে বলেন, ‘আমাকে ১০ দিন বা আরো বেশি দিন রিমান্ড দেয়া হোক, কোন আপত্তি নেই। আমরাও চাই এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটন হোক। কিন্তু নিহত নজরুলের শ্বশুরের কথার উপর ভিত্তি করে মিডিয়া ঢালাওভাবে আমাদের অভিযুক্ত ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে চলেছে যা কোনভাবেই সঠিক বা সত্য নয়।’
এই সময় আইনজীবীরা তারেক সাঈদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। জনাকীর্ণ আদালতে পুলিশি বেষ্টনির মধ্যে তারেক সাঈদ ও আরিফুল হোসেনের দিকে অনেককে থুথুও ছু্্ঁড়তে দেখা যায়। আইনজীবীদের ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যে তারেক সাঈদ বক্তব্যের শুরুতেই চন্দন সরকারের জন্য শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন আইনজীবী খুন হওয়ার পর সব আইনজীবী ক্ষুব্ধ হবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে ৬ কোটি টাকা নিয়ে সাতজনকে হত্যার অভিযোগ মিডিয়ার সৃষ্টি। মামলায় আমাদের আসামি করা হয়নি। টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় রিপোর্টে অভিযোগ করা হচ্ছে, নূর হোসেনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে র্যাব এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ফলে র্যাবের প্রতি আইনজীবীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।’ এসময় আদালতে থাকা আইনজীবীদের মধ্য থেকে বলা হয়, ‘আমরা বলিনি র্যাব জড়িত। আপনার মতো গুটিকয়েক কর্মকর্তা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। আপনারাই এই ঘটনা ঘটিয়েছেন।’ এর আগে সাবেক এই দুই র্যাব কর্মকর্তাকে হাতকড়া না পরিয়ে আদালতে আনায় আইনজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তখন বিচারকের নির্দেশে আদালতের ভেতর দু’জনকে হাতকড়া পরানো হয়। দু’জনকে আদালত থেকে বের করার সময় বিক্ষুব্ধ মানুষ তাদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেয়। এ সময় কয়েকজন তাদের মাথায় আঘাতের চেষ্টা করলেও পুলিশ তাদের হটিয়ে দেয়।
র্যাবকেই অভিযুক্ত করলেন
আইনজীবীরা
আদালতে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ নিজেকে নির্দোষ দাবী করলেও শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ১০ দিনের রিমান্ড শুনানির পক্ষে অনেক যুক্তি তুলে ধরেন আইনজীবীরা। তারা বিভিন্নভাবে র্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন। শুনানি শেষে বিচারক লে. কর্নেল তারেক ও মেজর আরিফকে ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করলে আইনজীবীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা বিচারিক কক্ষের ভেতরেই তুমুল হৈ চৈ শুরু করেন ও বিচারকের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকেন। তারা বলতে থাকেন, বিচারক- কোন মহল ও রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। যেখানে অভিযুক্তদের পক্ষে কোন সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য যুক্তি তুলে ধরা হয়নি সেখানে রিমান্ড ৫ দিন দেয়া অযৌক্তিক। এর পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ কিংবা সর্ষের মধ্যে ভূত লুকিয়ে আছে বলে মনে করেন তারা।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘হত্যা মামলায় গ্রেফতার না দেখিয়ে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানোতে আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এটা বিশেষ বাহিনীর কাজ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও এটা নিয়ে নানা ধরনের খেলা চলছে। শুনানিতে এডভোকেট আবদুল বারী ভূঁইয়া বলেন, যেভাবে দড়ি দিয়ে নিহতদের শরীর বাঁধা হয়েছিল ও বস্তায় ভরা হয়, তাতে অনেকেই মত দিয়েছেন- এটা বিশেষ কোনো বাহিনীর কাজ। তাছাড়া এভাবে নৌকায় করে লাশ বহন করা সাধারণ মানুষ কিংবা কিলারদের পক্ষে সম্ভব না। এর পেছনে র্যাবই জড়িত। সুতরাং র্যাব কর্মকর্তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ ঘটনায় সন্দেহজনক গ্রেফতারকৃত র্যাবের সাবেক ২ জন কর্মকর্তাসহ ৩ জনের রিমান্ড শুনানিতে আইনজীবীরা আরো বলেছেন, ‘যে দড়ি দিয়ে বাধা হয়েছিল সেগুলো ইজ্জতের রশি আর যে গিট্টু দেয়া হয় সেগুলো কমান্ডো গিট্টু।
পুলিশ সুপারের সাংবাদিক
সম্মেলন
রিমান্ড শুনানি শেষে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডটির তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। যতটা না দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে তার চেয়ে অদৃশ্যমান অনেক অগ্রগতি হচ্ছে। এটা নিয়ে তাড়াহুড়ো করার কোন সুযোগ নেই। পুলিশ তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যই তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। সাংবাদিকরা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো র্যাবের অপর কর্মকর্তা লে. কমান্ডার এম এম রানাকে গ্রেফতারের ব্যাপারে প্রশ্ন করলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আইনের মাধ্যমেই গ্রেফতার প্রক্রিয়া চলছে।
শেষরাতে গ্রেফতার অভিযান
এর আগে শুক্রবার রাত ২টার দিকে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারে অভিযান শুরু করে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ। গতকাল ভোররাত ৪টার দিকে র্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তা র্যাব-১১ এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর আরিফ হোসেনকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাস এলাকা ত্যাগ করে পুলিশ। ভোররাতে তাদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে রাখা হয়। সেখান থেকে তাদের দু’জনকে কড়া পুলিশি পাহারায় দুপুরে আদালতে নেয়া হয়। এর আগে বেলা ১১টার দিকে সাত খুনের ঘটনায় গঠিত পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রধান পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি গোলাম ফারুকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা পুলিশলাইনে যান।
গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে একসঙ্গে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহূত হন। পরে ৩০ এপ্রিল বিকালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দু’টি করে বস্তায় বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাব-১১ এর তিনজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এরপর থেকে নূর হোসেন পলাতক রয়েছেন।