লে. কামান্ডার রানাকে খুঁজছে পুলিশ ও নৌবাহিনী
প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৪, ২৩:০১
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে র্যাব-১১ এর তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এরমধ্যে দুই কর্মকর্তা র্যাব-১১ এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেন গ্রেফতার হলেও নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের দায়িত্ব নিয়োজিত লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানাকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত নৌ বাহিনী ও পুলিশ খুঁজে পায়নি। গত শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেনকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় সোপর্দ করা হয়। সেখানে নারায়ণগঞ্জ ৭ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মণ্ডলের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়। ৫ মে নজরুলসহ সাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠায় সশস্ত্র বাহিনী উক্ত তিন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠিয়ে দেয়। এরপর লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ঢাকা সেনানিবাসে ছিলেন। কিন্তু নৌ বাহিনী থেকে লে. কমান্ডার মাসুদ রানাকে অবসরে পাঠানোর পর তিনি কোন যোগাযোগ রাখেননি।
নৌ বাহিনী সূত্রে জানা যায়, পুলিশ সদর দফতর থেকে র্যাব-১১-এর সাবেক এ তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেই চিঠি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠায়। সেনাবাহিনী তাদের দুই কর্মকর্তার ব্যাপারে সিআরপিসি অনুযায়ী ব্যবস্থার নেয়ার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়। একইভাবে নৌ বাহিনীর পক্ষ থেকে লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানার ব্যাপারে একই মতামত দেয়।
সেনাবাহিনীর দুই সাবেক কর্মকর্তার বিষয়টি মিডিয়ায় প্রকাশ পেলেও লে. কমান্ডার (অব.) রানার ঘটনাটি বড় করে প্রকাশ পায়নি বলে নৌ বাহিনী সূত্রে জানা যায়। চিঠি পাওয়ার পর পর নৌ বাহিনী লে. কমান্ডার (অব.) রানাকে খুঁজতে থাকে। লে. কমান্ডার রানা নারায়ণগঞ্জ শহরে ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। সেখানে অনুসন্ধান চালায় পুলিশ ও নৌবাহিনী। তার জন্মস্থান খুলনা শহরের জোড়াগেট সিএন্ডবি কলোনি। লে. কমান্ডার রানা খুলনা নৌ বাহিনী স্কুল থেকে এসএসসি পাস করছেন। তার পিতা মরহুম নূরুল ইসলাম নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। লে. কমান্ডার রানা ১৯৯৯ সালে নৌ বাহিনীতে যোগদান করেন। তাদের খুলনার বাসায় পুলিশ ও নৌ বাহিনী অনুসন্ধান চালিয়েও তার খোঁজ পায়নি। গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণের সময় লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানা ওই ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। গত ৪ মে নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন ৬ কোটি টাকা নিয়ে র্যাবের উক্ত তিন কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। পরদিন ৫ মে পত্রপত্রিকায় এই খবর ছাপা হলে এই তিন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়। লে. কর্নেল তারেক সাঈদ ও মেজর আরিফ হোসেনকে অকালীন অবসরে পাঠায় সেনাবাহিনী। আর লে. কমান্ডার রানাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয় নৌ বাহিনী। এরপরই গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা বলে অফিস থেকে বের হন রানা। পরে আর ফিরে আসেননি তিনি। নৌ বাহিনীও তাকে খুঁজে পায়নি। আইনের ভাষায় তিনি এখন পলাতক রয়েছেন।
এরপর গত ১১ মে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই তিন কর্মকর্তাকে অবিলম্বে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। ১২ মে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের গ্রেফতারের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ১৫ মে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশকে চিঠি দিয়ে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর (সিআরপিসি) অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলে। এরপরই তাদের তিনজনকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেয় পুলিশ। সেনাবাহিনীর দু’জন কর্মকর্তা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের লগ এরিয়ায় থাকলেও মাসুদ রানাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ তাকে গ্রেফতারে অভিযানও চালিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, রানা সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে সপরিবারের বসবাস করতেন। র্যাব থেকে প্রত্যাহার হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি চলে যান। তার সর্বশেষ অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। চট্টগ্রাম নৌ ঘাঁটি থেকে লে. কমান্ডার মাসুদ রানা নারায়ণগঞ্জে র্যাব-১১ এর কার্যালয়ে যোগদান করেন। ঘটনার পর তাকে নৌবাহিনী সদর দফতর থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়ার সময় তার কোন এলপিআর সুবিধা ছিল না। এ কারণে লে. কমান্ডার মাসুদ রানার সঙ্গে নৌ সদর দফতরের আর কোন সম্পর্ক নেই। এ কারণে নৌ সদর দফতর তার কোন খোঁজ-খবর রাখেনি। মাসুদ রানার ব্যাপারে তথ্যের জন্য পুলিশ সদর দফতর পৃথক চিঠি পাঠালে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে নৌ সদর দফতর। তবে নারায়ণগঞ্জের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাসুদ রানার ব্যাপারে পৃথক কোন চিঠির প্রয়োজন নেই। তার সঙ্গে নৌ সদর দফতরের কোন সম্পর্ক এখন নেই বলে তাকে আটকের ব্যাপারে আইনগত কোন বাধাও নেই।