মোদীর বিপুল বিজয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়া হিসাব নিকাশ

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল বিজয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও। ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদীর বিপুল বিজয়ে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে বিএনপিসহ এর নেতৃত্বাধীন জোট ও মিত্রদের মাঝে। মুখে কেউ না বললেও এসব দলের অভ্যন্তরে যে কথাবার্তা চলছে, সেটির বার্তা হচ্ছে- কংগ্রেসের পরাজয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের সঙ্গে ‘একতরফা বন্ধুত্ব’ হারাবে। তবে বিএনপিসহ দলটির মিত্রদের এই ভাবনাকে ‘অমূলক’ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ ও তাদের বন্ধুপ্রতীমরা। আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, ভারতের সরকার পরিবর্তনের কোনো প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে পড়বে না। ‘সরকার বদল হলেও বৈদেশিক নীতির বদল হয় না’- ভারতের পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে এই নীতি বিদ্যমান বলেও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গতকাল দলীয় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন ‘ভারতে মোদী জিতেছে বলে যারা উল্লসিত, যারা বলছেন মোদী আসায় আওয়ামী লীগ থাকবে না, তাদেরকে বলতে চাই- গণতন্ত্র সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম জ্ঞান-ধারণা আছে তারা এই ধরনের কথা বলতে পারেন না। ফরেন পলিসি সম্পর্কে যাদের জ্ঞান নেই, তারাই এ কথা বলতে পারে। মিয়ানমার ও ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী, সেখানকার সরকার পরিবর্তনের কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ে না।’ কংগ্রেসের বিদায়ে ও বিজেপির আগমনে বাংলাদেশের রাজনীতির কিছু যায় আসে না, সৈয়দ আশরাফ এমনটি বললেও বিএনপি নেতারা বলছেন, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক রয়েছে। যে সম্পর্ককে আওয়ামী লীগ দশম সংসদ নির্বাচনে ষোলআনা কাজে লাগিয়েছে। তবে এবার মোদী ঝড়ে কংগ্রেস বিধ্বস্ত হয়ে পড়ায় আওয়ামী লীগের সেই বাড়তি সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ছেদ পড়বে। কংগ্রেস-আওয়ামী লীগের এই হূদ্যতার মূলে যতটা না ছিল ‘বাংলাদেশ-ভারত’, এর চেয়ে বেশি ছিল ‘পারিবারিক’ ও ‘দলীয়’। বিএনপি নেতাদের মতে, বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির অংক মেলানোর ক্ষেত্রে ভারতের নির্বাচনের এই ফলাফলের সূত্র (ফরমুলা) ভূমিকা রাখবে। মোদী সরকার বিএনপি জোটের পক্ষে কোনো ভূমিকা রাখবে, এমনটি মনে না করলেও তাদের বিশ্বাস, কংগ্রেসের মতো বিজেপি একতরফা কাউকে সমর্থন দেবে না। তবে দলের কোনো কোনো নেতার এমন ভাবনার সঙ্গে একমত নন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম. মোরশেদ খান। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ভারতের নির্বাচনের ফল মাত্র ঘোষণা হল, মোদী শপথ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতের নতুন সরকারের ভূমিকা কেমন হবে, এখনই সেই বিশ্লেষণ করাটা ‘খুব তাড়াতাড়ি’। তিনি বলেন, আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি ‘ দলের সঙ্গে দলের, কিংবা দলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক বেশিদিন টেকসই হয় না। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হতে হয় ‘কান্ট্রি টু কান্ট্রি’। তবে মোদী বিচক্ষণ মানুষ। আমার বিশ্বাস, তিনি ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের’ সম্পর্ককেই গুরুত্ব দেবেন। আর এই সম্পর্ক কতটা উষ্ণ হবে সেটি নির্ভর করবে আমাদের ন্যায্য প্রাপ্তির বিচারে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ ভারতের নির্বাচনের ফলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করলেও জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বক্তব্য ভিন্ন। গতকাল দলীয় এক অনুষ্ঠানে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ সাদাকালো হবে কেন? ভারতের জনগণই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে কারা সরকার গঠন করবে। যুক্তরাষ্ট্রেও সেখানকার জনগণই নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়, কারা ক্ষমতায় যাবে। এখানে রাজনীতি হবে না, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাদের (ভারতের নতুন সরকারের) প্রয়োজনীয় বিষয়াদিই প্রাধান্য পাবে। প্রায় অভিন্ন বক্তব্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমদেরও। তিনিও গতকাল দলীয় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ভারতের সরকার পরিবর্তন হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ ভারতে সরকার পরিবর্তন হয়, তবে বিদেশ নীতিতে বদল আসে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চলমান সুসম্পর্ক বজায় থাকবে বলে তার বিশ্বাস। এদিকে ভারতের ভোটের ফল বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশে এর প্রভাব সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পার্টি (জাপা) মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভারতে যেই ক্ষমতায় আসুক আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। ’৯৬ সালে যখন পানিচুক্তি হয়, তখনও দেবগৌড়ার সরকার ছিল। পরে যখন পার্বত্য শান্তিচুক্তি হয় তখনও কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল না। কাজেই মোদীর বিজয়ে বাংলাদেশের কারও খুশি বা অখুশি হওয়ার কিছু নেই।’